পাকস্থলী, মস্তিষ্ক বা শরীরের অন্য কোনো অঙ্গে সমস্যা হলে মস্তিষ্ক বমির সংকেত পাঠায়। এর পেছনে সাধারণত নিচের কারণগুলো সবচেয়ে বেশি দায়ী:
১. খাদ্যে বিষক্রিয়া (Food Poisoning) ও পেটের ইনফেকশন
বার বার বমি হওয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো ‘ফুড পয়জনিং’ বা অস্বাস্থ্যকর ও বাসি খাবার খাওয়া। খাবারে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস পাকস্থলীতে প্রবেশ করলে ‘গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস’ (Gastroenteritis) বা পেটের ইনফেকশন হয়। শরীর তখন বমির মাধ্যমে এই বিষাক্ত উপাদানগুলো দ্রুত বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এর সাথে সাধারণত ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানাও থাকে।
২. তীব্র গ্যাস্ট্রিক, এসিডিটি বা পেপটিক আলসার
যাদের দীর্ঘমেয়াদী গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা রয়েছে, তাদের পাকস্থলীতে অতিরিক্ত এসিড তৈরি হলে বা পাকস্থলীর দেয়ালে আলসার (ঘা) থাকলে মারাত্মক বমি ভাব হয়। বিশেষ করে খালি পেটে থাকলে বা অতিরিক্ত ঝাল-তেলযুক্ত খাবার খেলে এই সমস্যা চরম আকার ধারণ করে এবং বমির সাথে টক পানি বা অনেক সময় রক্তও আসতে পারে।
৩. অ্যাপেন্ডিসাইটিস বা পিত্তথলিতে পাথর
তলপেটের ডান দিকে নিচে তীব্র ব্যথার সাথে যদি বারবার বমি হয়, তবে এটি ‘অ্যাপেন্ডিসাইটিস’ (Appendicitis) এর একটি বড় লক্ষণ। এছাড়া পিত্তথলিতে (Gallbladder) পাথর হলেও পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে প্রচণ্ড ব্যথা হয় এবং খাবার একদমই হজম হতে চায় না, যার ফলে বার বার বমি হতে থাকে।
৪. মাইগ্রেন বা মস্তিষ্কের জটিলতা
তীব্র মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের (Migraine) কারণে অনেকের বমি বমি ভাব হয় এবং বমি হয়ে থাকে। এছাড়া এটি মস্তিষ্কের বড় কোনো সমস্যারও সংকেত হতে পারে। যেমন- ব্রেইন টিউমার, মাথায় মারাত্মক আঘাত লাগা (Concussion) বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে মাথার ভেতরের চাপ বেড়ে গিয়ে রোগীর একটানা বমি হতে পারে।
৫. লিভার বা কিডনির সমস্যা
লিভারে ইনফেকশন বা জন্ডিস (হেপাটাইটিস) হলে রোগীর খাবারে চরম অরুচি দেখা দেয় এবং কিছু খেলেই বমি হয়ে যায়। অন্যদিকে, কিডনিতে পাথর হলে বা প্রস্রাবে মারাত্মক ইনফেকশন (UTI) থাকলেও পিঠের নিচের দিকে ব্যথার পাশাপাশি বারবার বমি হতে পারে।
সাধারণ বমি বনাম বিপজ্জনক বমি: পার্থক্য কী?
সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে সাধারণ বমি এবং বিপজ্জনক বমির লক্ষণগুলো তুলে ধরা হলো:
| লক্ষণের ধরন | সাধারণ বমি | বিপজ্জনক বমি (Danger Signs) |
| বমির স্থায়িত্ব | ১-২ বার হয়ে নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। | ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে একটানা বমি হতে থাকে। |
| বমির রং ও উপাদান | ভুক্ত খাবার বা সাধারণ টক পানি বের হয়। | বমির সাথে উজ্জ্বল লাল রক্ত বা কফির গুঁড়োর মতো কালো কিছু বের হয়। |
| আনুষঙ্গিক ব্যথা | পেটে সামান্য অস্বস্তি বা গ্যাস থাকতে পারে। | পেটে বা বুকে অসহ্য তীব্র ব্যথা থাকে। |
| শারীরিক অবস্থা | বমির পর শরীর হালকা ও স্বাভাবিক লাগে। | শরীর অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে যায়, প্রস্রাব কমে যায় এবং মাথা ঘোরে। |
বমি কমাতে প্রাথমিক ঘরোয়া করণীয়
তরল গ্রহণ: বমি হলে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। তাই বমি বন্ধ হওয়ার পর একবারে বেশি পানি না খেয়ে, কিছুক্ষণ পর পর অল্প অল্প করে খাবার স্যালাইন (ORS) পান করতে হবে।
আদা চা বা লেবু পানি: আদা বমি ভাব কমানোর একটি চমৎকার প্রাকৃতিক ওষুধ। এক টুকরো আদা চিবিয়ে খেলে বা হালকা গরম আদা-চা পান করলে বমি ভাব দ্রুত কমে যায়।
বিশ্রাম: বমি হলে পাকস্থলীকে বিশ্রাম দেওয়া জরুরি। বমির পরপরই কোনো ভারী বা শক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
বিশেষ সতর্কতা: যদি বমির সাথে রক্ত যায়, একটানা ২৪ ঘণ্টার বেশি বমি হতে থাকে, রোগী খাবার বা পানি কিছুই পেটে রাখতে না পারে এবং রোগীর প্রস্রাবের পরিমাণ একদম কমে যায়, তবে এটি মারাত্মক পানিশূন্যতার লক্ষণ। এ অবস্থায় এক মুহূর্ত দেরি না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে শিরাপথে স্যালাইন (IV fluid) দিতে হবে।