উচ্চ কোলেস্টেরলের ৫টি লক্ষণ, কারণ ও কমানোর উপায়

রক্তে ‘কোলেস্টেরল’ (Cholesterol) বেড়ে যাওয়ার সমস্যাটি বর্তমান সময়ে অত্যন্ত পরিচিত। কোলেস্টেরল মূলত আমাদের রক্তে থাকা মোমের মতো একধরনের চর্বিজাতীয় পদার্থ, যা হরমোন তৈরি এবং নতুন কোষ গঠনের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে তা রক্তনালীর দেয়ালে জমে ব্লক তৈরি করে, যা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চ কোলেস্টেরলকে একটি ‘নীরব ঘাতক’ (Silent Killer) বলা হয়। কারণ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই রোগের সরাসরি কোনো শারীরিক লক্ষণ থাকে না। তবে কোলেস্টেরল চরম মাত্রায় পৌঁছে গেলে শরীর কিছু পরোক্ষ সতর্কতা বা সংকেত দেয়। চলুন, উচ্চ কোলেস্টেরলের প্রধান ৫টি লক্ষণ এবং এটি কমানোর উপায় বিস্তারিত জেনে নিই।


উচ্চ কোলেস্টেরলের ৫টি প্রধান লক্ষণ


আগেই বলা হয়েছে, রক্ত পরীক্ষার মাধ্যম ছাড়া কোলেস্টেরল বোঝার কোনো শতভাগ নিশ্চিত উপায় নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদে কোলেস্টেরল বেশি থাকলে নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে পারে:
১. চোখের পাতায় হলদেটে দাগ বা গোটা (Xanthelasma)
উচ্চ কোলেস্টেরলের সবচেয়ে দৃশ্যমান শারীরিক লক্ষণ হলো চোখের ওপরের বা নিচের পাতায় ছোট ছোট হলদেটে রঙের চর্বির গোটা বা দাগ তৈরি হওয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘জ্যান্থেলাজমা’ (Xanthelasma) বলা হয়। এটি সাধারণত কোনো ব্যথা সৃষ্টি করে না, তবে এটি রক্তে অতিরিক্ত চর্বি জমে থাকার একটি সুস্পষ্ট সংকেত।
২. চোখের মণির চারপাশে সাদা রিং (Arcus Senilis)
বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক হলেও, ৪৫ বছরের কম বয়সী কারও চোখের মণির (Cornea) বাইরের চারপাশে যদি হালকা ছাই, সাদা বা নীলচে রঙের একটি রিং বা বলয় দেখা যায়, তবে তা মারাত্মক চিন্তার বিষয়। একে ‘আর্কাস সেনিলিস’ বলা হয়, যা পারিবারিক উচ্চ কোলেস্টেরলের (Familial Hypercholesterolemia) একটি বড় লক্ষণ।
৩. বুকে ব্যথা বা ভারী অনুভূতি (Angina)
রক্তনালীতে কোলেস্টেরল জমে ব্লক তৈরি হলে হার্টে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। এর ফলে ভারী কোনো কাজ করলে, সিঁড়ি দিয়ে উঠলে বা দ্রুত হাঁটলে বুকের বাম পাশে বা মাঝখানে তীব্র ব্যথা বা ভারী অনুভূতি হয়। বিশ্রাম নিলে এই ব্যথা কিছুটা কমে যায়।
৪. হাত-পায়ে অবশ ভাব বা ঝিঁঝিঁ ধরা
কোলেস্টেরলের কারণে রক্তনালী সরু হয়ে গেলে হাত এবং পায়ে রক্ত চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে রোগীর হাত-পায়ে ঘন ঘন ঝিঁঝিঁ ধরে, অবশ বা অসাড় অনুভূতি হয় এবং অনেক সময় একটানা হাঁটলে পায়ের পেশিতে তীব্র খিল ধরে বা ব্যথা হয় (Peripheral Artery Disease)।
৫. অল্প পরিশ্রমে অতিরিক্ত ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট
হার্টে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছাতে না পারার কারণে শরীর খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সামান্য পরিশ্রমে বা অল্প হাঁটাহাঁটি করলেই রোগীর দম ফুরিয়ে আসে এবং মারাত্মক শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।


এক নজরে কোলেস্টেরলের ধরন ও প্রভাব


রক্তে মূলত তিন ধরনের কোলেস্টেরল বা চর্বি থাকে। সহজে বোঝার জন্য নিচের টেবিলটি খেয়াল করুন:

কোলেস্টেরলের ধরনপরিচিতিশরীরে এর প্রভাব
এলডিএল (LDL)ক্ষতিকর কোলেস্টেরলরক্তনালীতে চর্বি জমায় এবং ব্লক তৈরি করে।
এইচডিএল (HDL)ভালো কোলেস্টেরলরক্তনালী পরিষ্কার রাখে এবং হার্ট সুস্থ রাখে।
ট্রাইগ্লিসারাইড (Triglycerides)রক্তের একধরনের ফ্যাটঅতিরিক্ত মাত্রায় হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. কোলেস্টেরল কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় কী?
উত্তর: কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট জোরে হাঁটতে হবে। খাদ্যতালিকা থেকে গরু বা খাসির মাংস (Red meat), ঘি, মাখন, ডালডা এবং ফাস্টফুড সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার যুক্ত খাবার (ওটস, শাকসবজি, সামুদ্রিক মাছ) খেতে হবে।
২. ডিমের কুসুম খেলে কি কোলেস্টেরল বাড়ে?
উত্তর: আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল থাকলেও এটি রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল (LDL) খুব একটা বাড়ায় না। একজন সুস্থ মানুষ প্রতিদিন একটি সেদ্ধ ডিম অনায়াসেই খেতে পারেন।
৩. কত বছর বয়স থেকে কোলেস্টেরল চেক করা উচিত?
উত্তর: ২০ বছর বয়সের পর থেকেই প্রতি ৫ বছর অন্তর রক্তের লিপিড প্রোফাইল (Lipid Profile) পরীক্ষা করা উচিত। তবে পরিবারে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ইতিহাস থাকলে আরও আগে থেকেই নিয়মিত চেকআপ করা জরুরি।


বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যেহেতু উচ্চ কোলেস্টেরলের কোনো সরাসরি লক্ষণ নেই, তাই লক্ষণ প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করা বোকামি। সুস্থ থাকলেও বছরে অন্তত একবার চিকিৎসকের পরামর্শে খালি পেটে ‘লিপিড প্রোফাইল’ (Fasting Lipid Profile) রক্ত পরীক্ষা করিয়ে আপনার কোলেস্টেরলের মাত্রা জেনে নিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *