কিডনি ব্যথার ৫টি প্রধান লক্ষণ, কারণ ও করণীয়

আমাদের শরীরের ছাঁকনি হিসেবে পরিচিত কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত পানি বের করে প্রস্রাব তৈরি করে। শরীরের পেছনের দিকে, পাঁজরের ঠিক নিচে মেরুদণ্ডের দুই পাশে দুটি কিডনি অবস্থান করে।
অনেকেই পিঠের নিচের দিকের বা কোমরের সাধারণ ব্যথাকে কিডনির ব্যথা ভেবে মারাত্মক আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। আবার অনেক সময় আসল কিডনির ব্যথাকে সাধারণ মাংসপেশির ব্যথা ভেবে অবহেলা করে বড় বিপদ ডেকে আনেন। চলুন, কিডনি ব্যথার প্রধান ৫টি লক্ষণ, মেরুদণ্ডের ব্যথার সাথে এর পার্থক্য এবং করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।


কিডনি ব্যথার ৫টি প্রধান লক্ষণ


কিডনিতে পাথর, ইনফেকশন (Pyelonephritis), বা টিউমার হলে সাধারণত এই ব্যথা অনুভূত হয়। কিডনির ব্যথার সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ রয়েছে:
১. পাঁজরের নিচে একপাশে বা দুই পাশে তীব্র ব্যথা
কিডনি ব্যথার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অবস্থান। এই ব্যথা সাধারণ কোমরের ব্যথার মতো মেরুদণ্ডের ওপর হয় না। এটি পিঠের পেছনের অংশে, পাঁজরের ঠিক নিচে (Flank area) ডান বা বাম পাশে অনুভূত হয়। অনেক সময় এই ব্যথা সামনের দিকে তলপেট বা কুঁচকির (Groin) দিকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
২. ব্যথার ধরন পরিবর্তন হওয়া
কিডনিতে পাথরের কারণে ব্যথা হলে তা একটানা থাকে না। ব্যথা ঢেউয়ের মতো আসে—কখনো তীব্র আকার ধারণ করে, আবার কখনো কিছুটা কমে যায়। এই ব্যথা এতটা তীব্র হতে পারে যে রোগী ব্যথায় ছটফট করতে থাকেন এবং কোনো পজিশনেই আরাম পান না।
৩. প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া ও রক্ত যাওয়া
কিডনিতে ইনফেকশন বা পাথর হলে প্রস্রাবের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। প্রস্রাব করার সময় তীব্র ব্যথা বা জ্বালাপোড়া হয়। প্রস্রাবের রং ঘোলাটে হয়ে যায় এবং অনেক সময় প্রস্রাবের সাথে তাজা রক্ত (Hematuria) আসতে পারে। প্রস্রাব থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হওয়াও ইনফেকশনের বড় লক্ষণ।
৪. কাঁপুনি দিয়ে তীব্র জ্বর ও বমি ভাব
কিডনিতে যদি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন হয়, তবে হঠাৎ করেই রোগীর শরীরে কাঁপুনি দিয়ে তীব্র মাত্রার জ্বর আসে। জ্বরের পাশাপাশি প্রচণ্ড বমি বমি ভাব থাকে এবং অনেক সময় রোগী বারবার বমি করে ফেলেন। খাবারে চরম অরুচি দেখা দেয়।
৫. হাত-পা বা মুখ ফুলে যাওয়া (Edema)
কিডনি যখন তার স্বাভাবিক কাজ করতে পারে না, তখন শরীরে অতিরিক্ত পানি ও সোডিয়াম জমতে শুরু করে। এর ফলে রোগীর হাত, পা, পায়ের গোড়ালি অথবা সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের চারপাশ বা মুখ ফুলে যায়। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ইডেমা’ (Edema) বলা হয়।


কিডনির ব্যথা বনাম কোমরের ব্যথা: পার্থক্য কী?


সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে কিডনির ব্যথা এবং সাধারণ মেরুদণ্ড বা মাংসপেশির ব্যথার পার্থক্য তুলে ধরা হলো:

লক্ষণের ধরনকিডনি ব্যথামেরুদণ্ড বা মাংসপেশির ব্যথা
ব্যথার স্থানপাঁজরের ঠিক নিচে, পিঠের এক বা দুই পাশে।মেরুদণ্ডের একদম নিচের অংশে বা কোমরের মাঝে।
ব্যথার ধরনতীব্র, তীক্ষ্ণ এবং ঢেউয়ের মতো আসে।একটানা ভোঁতা ব্যথা বা চিনচিনে ব্যথা থাকে।
নড়াচড়ার প্রভাবনড়াচড়া করলে ব্যথার কোনো পরিবর্তন হয় না।সামনে ঝুঁকলে, ভারী কিছু তুললে বা নড়াচড়া করলে ব্যথা বাড়ে।
আনুষঙ্গিক লক্ষণজ্বর, বমি বা প্রস্রাবে সমস্যা বা রক্ত থাকে।সাধারণত জ্বর বা প্রস্রাবের কোনো সমস্যা থাকে না।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. বেশি পানি খেলে কি কিডনির ব্যথা কমে যায়?
উত্তর: যদি ব্যথাটি ছোট পাথরের কারণে হয়, তবে প্রচুর পরিমাণ তরল বা পানি পান করলে পাথরটি প্রস্রাবের সাথে সহজে বেরিয়ে যেতে পারে এবং ব্যথা কমে যায়। তবে ইনফেকশন থাকলে শুধু পানিতে কাজ হয় না, অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয়।
২. কিডনি ব্যথায় কি ফার্মেসি থেকে ব্যথার ওষুধ (পেইনকিলার) খাওয়া যাবে?
উত্তর: একদমই না। আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) বা ডাইক্লোফেনাক (Diclofenac) জাতীয় সাধারণ পেইনকিলার কিডনির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ খেলে কিডনি পুরোপুরি ড্যামেজ বা বিকল হয়ে যেতে পারে।
৩. কিডনিতে পাথর হলে কি সবসময় ব্যথা হয়?
উত্তর: না। ছোট পাথর যদি কিডনির ভেতরে স্থির অবস্থায় থাকে, তবে অনেক সময় কোনো ব্যথাই অনুভূত হয় না (সাইলেন্ট স্টোন)। কিন্তু পাথরটি যখন কিডনি থেকে বের হয়ে প্রস্রাবের নালীতে (Ureter) এসে আটকে যায়, তখনই তীব্র ব্যথা শুরু হয়।


বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি পিঠের নিচের ব্যথার সাথে আপনার প্রস্রাবে রক্ত যায়, একটানা বমি হয় এবং তীব্র জ্বর থাকে, তবে এক মুহূর্ত অবহেলা না করে দ্রুত একজন নেফ্রোলজিস্ট (Nephrologist) বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন। একটি সাধারণ আল্ট্রাসনোগ্রাম (USG) এবং প্রস্রাব পরীক্ষার (Urine R/E) মাধ্যমেই কিডনির অবস্থা নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *