বর্তমান সময়ে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক এবং অস্বস্তিকর একটি শারীরিক সমস্যার নাম হলো অর্শ বা পাইলস (Piles/Hemorrhoids)। মলদ্বারের নিচের অংশের রক্তনালীগুলো কোনো কারণে ফুলে গেলে বা প্রদাহের সৃষ্টি হলে তাকে পাইলস বলা হয়। দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য, মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া বা অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির কারণে সাধারণত এই রোগটি হয়ে থাকে।
প্রাথমিক অবস্থায় সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন আনলে কোনো ধরনের অপারেশন ছাড়াই পাইলস থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া সম্ভব। চলুন, অর্শ বা পাইলস থেকে মুক্তির ৫টি বিজ্ঞানভিত্তিক ঘরোয়া উপায় বিস্তারিত জেনে নিই।
অর্শ বা পাইলস থেকে মুক্তির ৫টি প্রধান উপায়
পাইলসের ব্যথা, জ্বালাপোড়া এবং রক্তপাত বন্ধ করতে নিচের পদ্ধতিগুলো জাদুর মতো কাজ করে:
১. প্রচুর ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ
পাইলস নিরাময়ের সবচেয়ে প্রধান শর্ত হলো কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা। এর জন্য প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার রাখতে হবে। ইসবগুলের ভুসি, ওটস, লাল আটার রুটি, সবুজ শাকসবজি এবং পেঁপে বা বেলের মতো ফলমূল মলকে নরম করে, যার ফলে মলত্যাগের সময় মলদ্বারে কোনো চাপ পড়ে না।
২. উষ্ণ পানির সেঁক বা ‘সিজ বাথ’ (Sitz Bath)
পাইলসের তীব্র ব্যথা এবং ফোলা ভাব কমাতে ‘সিজ বাথ’ অত্যন্ত কার্যকরী একটি চিকিৎসাপদ্ধতি। একটি বড় গামলায় হালকা কুসুম গরম পানি নিয়ে তাতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট বসে থাকতে হবে। দিনে অন্তত ২-৩ বার এটি করলে মলদ্বারের পেশিগুলো আরাম পায় এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয়ে ব্যথা দ্রুত কমে যায়।
৩. পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও তরল পান করা
শরীর হাইড্রেটেড থাকলে মল এমনিতেই নরম থাকে। পাইলস রোগীদের প্রতিদিন অন্তত ২.৫ থেকে ৩ লিটার পানি পান করা বাধ্যতামূলক। পানির পাশাপাশি ডাবের পানি, ফলের জুস বা স্যুপ খাওয়া যেতে পারে, যা হজম প্রক্রিয়াকে সহজ করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
৪. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া
মলত্যাগের জন্য কখনোই জোর করে অতিরিক্ত চাপ (Straining) দেওয়া উচিত নয়। এতে মলদ্বারের সংবেদনশীল রক্তনালীগুলো ফেটে গিয়ে মারাত্মক রক্তপাত হতে পারে। যখন প্রাকৃতিকভাবে বেগ আসবে, তখনই বাথরুমে যাওয়া উচিত। এছাড়া বাথরুমে বসে দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করা বা পেপার পড়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।
৫. অ্যালোভেরা বা কোল্ড কম্প্রেসের ব্যবহার
পাইলসের বাইরের দিকের গোটা বা ফোলা অংশে খাঁটি অ্যালোভেরা জেল লাগালে এর কুলিং ইফেক্ট জ্বালাপোড়া ও চুলকানি নিমিষেই কমিয়ে দেয়। এছাড়া একটি পরিষ্কার সুতির কাপড়ে কয়েক টুকরো বরফ পেঁচিয়ে ফোলা জায়গায় ৫-১০ মিনিট সেঁক দিলে (Cold Compress) রক্তনালী সংকুচিত হয়ে ব্যথা কমে যায়।
এক নজরে অর্শ বা পাইলস রোগের ধরন
পাইলস মূলত কোথায় হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে একে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। সহজে বোঝার জন্য নিচের টেবিলটি খেয়াল করুন:
| পাইলসের ধরন | অবস্থান | প্রধান লক্ষণ |
| ইন্টারনাল পাইলস (Internal) | মলদ্বারের ভেতরের দিকে থাকে। | সাধারণত ব্যথা থাকে না, তবে মলত্যাগের সময় তাজা রক্ত যায়। |
| এক্সটারনাল পাইলস (External) | মলদ্বারের বাইরের দিকে থাকে। | প্রচণ্ড ব্যথা, জ্বালাপোড়া এবং চুলকানি থাকে, গোটা অনুভব হয়। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. পাইলস হলে কি ঝাল বা মসলাযুক্ত খাবার খাওয়া যাবে?
উত্তর: একদমই না। অতিরিক্ত ঝাল, মসলাযুক্ত খাবার এবং ফাস্টফুড পাইলসের জ্বালাপোড়া এবং প্রদাহ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সুস্থ হতে চাইলে এ ধরনের খাবার এবং লাল মাংস (গরু বা খাসির মাংস) সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে হবে।
২. পাইলস রোগীরা কি ভারী ব্যায়াম করতে পারবেন?
উত্তর: ভারোত্তোলন (Weightlifting) বা খুব ভারী ব্যায়াম করলে তলপেটে এবং মলদ্বারে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা পাইলসের জন্য ক্ষতিকর। তবে প্রতিদিন ৩০ মিনিট হালকা হাঁটা, সাঁতার কাটা বা যোগব্যায়াম করা অন্ত্রের জন্য খুবই উপকারী।
৩. পাইলস থেকে কি ক্যান্সার হতে পারে?
উত্তর: এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। পাইলস বা অর্শ রোগ থেকে কখনোই কোলন বা মলদ্বারের ক্যান্সার হয় না। তবে ক্যান্সারের লক্ষণ হিসেবেও মলদ্বার দিয়ে রক্ত যেতে পারে। তাই রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শে রোগ নির্ণয় করা জরুরি।
বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। ঘরোয়া উপায়ে যদি এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যথা না কমে এবং মলত্যাগের সময় ফিনকি দিয়ে রক্ত যায় বা মলদ্বারের বাইরের মাংসপিণ্ড ভেতরে না ঢোকে, তবে দ্রুত একজন কোলোরেক্টাল সার্জন (Colorectal Surgeon) বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।