জরায়ু ইনফেকশনের লক্ষণ: পেটের ব্যথা নাকি বড় বিপদের সংকেত?

নারীদের প্রজননতন্ত্রের একটি অত্যন্ত নীরব কিন্তু ভয়ংকর সমস্যা হলো জরায়ুর ইনফেকশন বা পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (PID)। সাধারণত ব্যাকটেরিয়া জরায়ুমুখ দিয়ে প্রবেশ করে জরায়ু, ফ্যালোপিয়ান টিউব বা ডিম্বাশয়ে ছড়িয়ে পড়লে এই ইনফেকশন তৈরি হয়।
প্রাথমিক অবস্থায় জরায়ু ইনফেকশনের লক্ষণগুলো এতই সাধারণ হয় যে, বেশিরভাগ নারী একে মাসিকের ব্যথা বা সাধারণ সাদাস্রাব ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এটি জরায়ুকে চিরতরে নষ্ট করে দিতে পারে এবং বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে। চলুন জেনে নিই, আপনার শরীরের কোন সংকেতগুলো দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।


জরায়ু ইনফেকশনের প্রধান ৫টি লক্ষণ


ইনফেকশনের মাত্রা এবং ব্যাকটেরিয়ার ধরনের ওপর ভিত্তি করে লক্ষণগুলো ভিন্ন হতে পারে। তবে সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গগুলো নিচে দেওয়া হলো:
তলপেটে বা পেলভিক এরিয়ায় একটানা ব্যথা: এটি জরায়ু ইনফেকশনের সবচেয়ে প্রধান লক্ষণ। তলপেটে সবসময় এক ধরনের ভোঁতা ব্যথা, মোচড়ানো বা ভারী অনুভূতি থাকে। মাসিকের সময় এই ব্যথা তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। (টিপস: জরায়ুর এই তীব্র ব্যথা বা পেশির অস্বস্তি সাময়িকভাবে কমাতে চিকিৎসকের ওষুধের পাশাপাশি তলপেটে একটি ভালো মানের হিটিং প্যাড (Heating Pad) বা হিট থেরাপি ব্যবহার করলে জরায়ুর পেশি শান্ত হয় এবং ম্যাজিকের মতো আরাম মেলে)।
অস্বাভাবিক ও দুর্গন্ধযুক্ত সাদাস্রাব: স্বাভাবিক সাদাস্রাবের কোনো দুর্গন্ধ থাকে না এবং এটি স্বচ্ছ হয়। কিন্তু ইনফেকশন থাকলে স্রাবের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায় এবং এর রঙ হলুদ, সবুজ বা কালচে হতে পারে। এর সাথে মাছের আঁশটের মতো তীব্র দুর্গন্ধ থাকে।
জ্বর ও কাঁপুনি: শরীরে যেকোনো বড় ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়লে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে, যার ফলে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। জরায়ু ইনফেকশনের ক্ষেত্রেও হঠাৎ তীব্র জ্বর আসা একটি বড় সংকেত। (জ্বরের এই ওঠা-নামা নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করতে হাতের কাছে একটি নির্ভুল ডিজিটাল থার্মোমিটার (Digital Thermometer) রাখা অত্যন্ত জরুরি)।
অনিয়মিত বা অস্বাভাবিক রক্তপাত: মাসিকের নির্ধারিত সময়ের বাইরে হঠাৎ করে রক্তপাত হওয়া, স্পটিং হওয়া বা মাসিক দীর্ঘস্থায়ী হওয়া ইনফেকশনের বড় লক্ষণ হতে পারে।
প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া ও বারবার বেগ হওয়া: জরায়ুর ইনফেকশন অনেক সময় মূত্রথলিতেও (Bladder) ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে পর্যাপ্ত পানি পান করার পরও বারবার প্রস্রাবের বেগ হয় এবং প্রস্রাব করার সময় প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া বা ব্যথা অনুভূত হয়।


সাধারণ মাসিকের ব্যথা নাকি ইনফেকশন? (পার্থক্য বুঝুন)


আপনার তলপেটের ব্যথাটি কি কেবলই মাসিকের সাধারণ সমস্যা নাকি জরায়ু ইনফেকশনের সংকেত, তা নিচের ছকটি থেকে সহজেই বুঝতে পারবেন:

লক্ষণের ধরনস্বাভাবিক মাসিকের সমস্যাজরায়ু ইনফেকশনের সন্দেহজনক সংকেত
ব্যথার সময়কালমাসিকের ১-২ দিন আগে শুরু হয় এবং ২-৩ দিনে কমে যায়।মাসিকের সময় ছাড়াও পুরো মাস জুড়ে তলপেটে একটানা ব্যথা থাকে।
সাদাস্রাবমাসিকের আগে বা পরে স্বাভাবিক ও গন্ধহীন সাদা স্রাব যায়।স্রাবের রঙ পরিবর্তন হয় (হলুদ/সবুজ) এবং তীব্র দুর্গন্ধ থাকে।
তাপমাত্রা বা জ্বরমাসিকের সময় সাধারণত জ্বর আসে না।ব্যথার সাথে প্রায়ই কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে এবং শরীর দুর্বল লাগে।
প্রস্রাবপ্রস্রাব একদম স্বাভাবিক থাকে।প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া থাকে এবং বারবার বেগ আসে।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. জরায়ু ইনফেকশন হলে কি পরবর্তীতে মা হওয়া যায় না?
উত্তর: প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে জরায়ু ইনফেকশন পুরোপুরি সারিয়ে তোলা সম্ভব এবং এর ফলে গর্ভধারণে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ইনফেকশন ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লক করে দিতে পারে, যা পরবর্তীতে মা হওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা বা বন্ধ্যাত্বের (Infertility) কারণ হতে পারে।
২. কীভাবে জরায়ুতে ইনফেকশন ছড়ায়?
উত্তর: অপরিষ্কার টয়লেট ব্যবহার, মাসিকের সময় একই প্যাড দীর্ঘক্ষণ পরে থাকা, অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক এবং সিজার বা এমআর (MR) করার সময় সঠিক জীবাণুমুক্ত পরিবেশ না থাকলে জরায়ুতে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে ইনফেকশন ছড়াতে পারে।
৩. ইনফেকশন প্রতিরোধের উপায় কী?
উত্তর: ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, মাসিকের সময় প্রতি ৪-৬ ঘণ্টা পরপর প্যাড পরিবর্তন করা এবং প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা ইনফেকশন প্রতিরোধের সেরা উপায়।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। দুর্গন্ধযুক্ত সাদাস্রাব, তলপেটে তীব্র ব্যথা বা মাসিকের বাইরে অস্বাভাবিক রক্তপাতের মতো কোনো লক্ষণ দেখা দিলে নিজে নিজে ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে, সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *