ডেলিভারির বা প্রসবের কিছুদিন আগের প্রধান লক্ষণ

গর্ভাবস্থার ৩য় ট্রাইমাস্টার বা একদম শেষ পর্যায়ে এসে প্রতিটি মায়ের মনেই একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগে—”ডেলিভারির সময় কি ঘনিয়ে এসেছে?” প্রসবের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ আগে থেকে বলা সম্ভব না হলেও, ডেলিভারির কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে শরীর কিছু বিশেষ সংকেত দিতে শুরু করে।
ডেলিভারির সময় ঘনিয়ে এলে জরায়ু এবং পেলভিক এলাকার পেশিগুলো প্রসবের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। এই আগাম লক্ষণগুলো জানা থাকলে একজন মা অহেতুক আতঙ্কিত না হয়ে শান্তভাবে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারেন। চলুন, প্রসবের কিছুদিন আগের প্রধান লক্ষণগুলো বিস্তারিত জেনে নিই।


প্রসব ঘনিয়ে আসার প্রধান ৫টি লক্ষণ


ডেলিভারির কয়েক দিন বা সপ্তাহ আগে থেকে শরীরে সাধারণত নিচের পরিবর্তনগুলো খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়:
১. পেট নিচের দিকে নেমে যাওয়া (Baby Dropping)
প্রথমবার মা হতে যাওয়া নারীদের ক্ষেত্রে ডেলিভারির ২-৪ সপ্তাহ আগে শিশুটি মায়ের পেলভিস বা তলপেটের একদম নিচের দিকে নেমে আসে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘লাইটেনিং’ (Lightening) বলা হয়। এ সময় মায়ের শ্বাস নিতে অনেক সুবিধা হয় এবং বুকের ওপরের চাপ কমে যায়, কিন্তু পেলভিস বা মূত্রথলিতে প্রচণ্ড চাপ অনুভূত হয়।
২. মিউকাস প্লাগ বের হওয়া (Bloody Show)
গর্ভাবস্থায় জরায়ুমুখ (Cervix) একটি আঠালো শ্লেষ্মা বা ‘মিউকাস প্লাগ’ দিয়ে বন্ধ থাকে, যা শিশুকে ইনফেকশন থেকে বাঁচায়। প্রসবের কয়েক দিন আগে জরায়ুমুখ একটু একটু করে খুলতে শুরু করলে এই মিউকাস প্লাগটি যোনিপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে। এটি দেখতে ঘন, আঠালো এবং অনেক সময় এর সাথে গোলাপি বা হালকা বাদামি রঙের রক্তের দাগ (Bloody Show) থাকতে পারে।
৩. একটানা কোমর ও তলপেটে ব্যথা
ডেলিভারির সময় ঘনিয়ে এলে জরায়ু ও পেলভিসের জয়েন্টগুলো শিথিল হতে শুরু করে। এর ফলে কোমরের নিচের অংশে এবং তলপেটে একটানা চিনচিনে বা পিরিয়ডের মতো ব্যথা অনুভূত হয়। এই ব্যথা অনেক সময় উরুর দিকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৪. ঘন ঘন প্রস্রাব ও পেট খারাপ বা ডায়রিয়া
পেলভিসে শিশুর মাথার চাপের কারণে এ সময় প্রস্রাবের বেগ মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। এছাড়া শরীর প্রসবের জন্য প্রস্তুত হওয়ার কারণে ‘প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন’ নামক হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে, যা অন্ত্রের পেশিকেও শিথিল করে দেয়। এর ফলে ডেলিভারির ১-২ দিন আগে অনেক মায়েরই পেট খারাপ বা ডায়রিয়া হতে পারে।
৫. ফলস পেইন বা ব্র্যাক্সটন হিকস (Braxton Hicks)
ডেলিভারির কিছুদিন আগে থেকেই পেট হঠাৎ করে শক্ত হয়ে যায় এবং হালকা ব্যথা অনুভূত হয়। একে ‘ফলস লেবার পেইন’ বা ব্র্যাক্সটন হিকস সংকোচন বলা হয়। এটি মূলত আসল প্রসব বেদনার জন্য জরায়ুর একটি মহড়া বা প্র্যাকটিস।


আসল পেইন বনাম ফলস পেইন বুঝবেন কীভাবে?


ডেলিভারির ব্যথা নিয়ে অনেক মা বিভ্রান্তিতে ভোগেন। নিচের টেবিল থেকে আসল এবং নকল ব্যথার পার্থক্য সহজেই বুঝতে পারবেন:

বৈশিষ্ট্যের ধরনফলস পেইন (নকল ব্যথা)আসল লেবার পেইন (প্রসব বেদনা)
ব্যথার ধরন ও তীব্রতাব্যথা বাড়ে না, সাধারণত একই রকম থাকে।সময়ের সাথে সাথে ব্যথার তীব্রতা প্রচণ্ড বাড়তে থাকে।
ব্যথার স্থায়িত্ব ও বিরতিঅনিয়মিতভাবে আসে, নির্দিষ্ট কোনো বিরতি নেই।নিয়মিত বিরতিতে আসে (যেমন প্রতি ১০ মিনিট পরপর)।
বিশ্রাম বা হাঁটাচলাএকটু শুয়ে থাকলে বা পজিশন বদলালে ব্যথা কমে যায়।শুয়ে থাকলে বা হাঁটাহাঁটি করলেও ব্যথা একটুও কমে না।
ব্যথা কোথায় হয়?সাধারণত শুধু পেটের সামনের অংশে অনুভূত হয়।ব্যথা কোমর থেকে শুরু হয়ে তলপেটের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।


কখন দ্রুত হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে যাবেন?


লক্ষণগুলো দেখা দিলে শান্ত থাকুন। তবে নিচের পরিস্থিতিগুলো দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে:
পানি ভাঙলে (Water Breaking): যোনিপথ দিয়ে যদি হঠাৎ করে প্রচুর পরিমাণে স্বচ্ছ পানির মতো তরল বেরিয়ে আসে, তবে বুঝতে হবে অ্যামনিওটিক স্যাক ফেটে গেছে।
তাজা রক্তক্ষরণ: মিউকাস প্লাগের হালকা দাগের বদলে যদি পিরিয়ডের মতো তাজা লাল রক্ত যেতে থাকে।
বাচ্চার নড়াচড়া কমলে: শিশু যদি আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম নড়াচড়া করে বা একদমই নড়াচড়া না করে।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. মিউকাস প্লাগ বের হওয়ার কতদিন পর ডেলিভারি হয়?
উত্তর: এর নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। মিউকাস প্লাগ বের হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেও ডেলিভারি হতে পারে, আবার ১-২ সপ্তাহ সময়ও লাগতে পারে।
২. নেস্টিং ইন্সটিংক্ট (Nesting Instinct) কী?
উত্তর: অনেক মায়ের ডেলিভারির ঠিক আগে আগে হঠাৎ করে প্রচুর এনার্জি বা শক্তি চলে আসে এবং তারা শিশুর জন্য ঘর গোছানো বা পরিষ্কার করায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। একেই নেস্টিং ইন্সটিংক্ট বলা হয়।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও মানসিক প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহের আগে যদি নিয়মিত পেট ব্যথা বা সংকোচন শুরু হয়, তবে এটি প্রিম্যাচিউর বা অকাল প্রসবের লক্ষণ হতে পারে। এমন অবস্থায় দ্রুত আপনার গাইনোকোলজিস্টের সাথে যোগাযোগ করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *