আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থি। সারা শরীরে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা এই ছোট ছোট মটরশুঁটির মতো গ্রন্থিগুলো ছাঁকনি হিসেবে কাজ করে এবং শরীরকে ইনফেকশন বা জীবাণুর হাত থেকে রক্ষা করে।
যখন এই গ্রন্থিগুলোতে থাকা শ্বেত রক্তকণিকায় ক্যান্সার কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে, তখন তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘লিম্ফোমা’ (Lymphoma) বা লিম্ফ নোড ক্যান্সার বলা হয়। ঘাড়, বগল বা কুঁচকিতে কোনো গোটা বা চাকা অনুভব করলেই অনেকেই ক্যান্সারের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো সাধারণ ইনফেকশনের কারণে ফোলে। চলুন, লিম্ফ নোড ক্যান্সারের আসল লক্ষণগুলো বিস্তারিত জেনে নিই।
লিম্ফ নোড ক্যান্সারের প্রধান ৫টি লক্ষণ
লিম্ফোমা বা লিম্ফ নোড ক্যান্সারের ক্ষেত্রে শরীর বেশ কিছু নীরব কিন্তু স্পষ্ট সংকেত দেয়। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
১. ব্যথাহীন ফোলা গ্রন্থি বা চাকা
লিম্ফ নোড ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রাথমিক লক্ষণ হলো ঘাড়, বগল, কলার বোন (হাঁসুলি) বা কুঁচকির লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া। ক্যান্সারের কারণে ফুলে যাওয়া এই গোটা বা চাকাগুলোতে সাধারণত কোনো ব্যথা থাকে না। এগুলো রাবারের মতো শক্ত হয় এবং আঙুল দিয়ে চাপ দিলে খুব একটা নড়ে না।
২. একটানা জ্বর ও রাতের বেলা অতিরিক্ত ঘাম
শরীরে কোনো ইনফেকশন ছাড়াই যদি একটানা জ্বর থাকে এবং বিশেষ করে রাতের বেলা শরীর অতিরিক্ত ঘেমে যায় (Night sweats), তবে তা লিম্ফোমার একটি বড় সংকেত। অনেক সময় ঘামে রোগীর বিছানার চাদর ও জামাকাপড় ভিজে যায়।
৩. হঠাৎ করে অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া
কোনো ধরনের ডায়েট বা ব্যায়াম ছাড়াই যদি মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে শরীরের ওজনের ১০ শতাংশ বা তার বেশি কমে যায়, তবে এটি ক্যান্সারের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষণ। এর পাশাপাশি খাবারে চরম অরুচি দেখা দেয়।
৪. চরম ক্লান্তি ও অবসাদ
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং ঘুমানোর পরও রোগী সারাদিন চরম ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করেন। স্বাভাবিক কাজকর্ম করার মতো কোনো এনার্জি বা শক্তি শরীরে থাকে না।
৫. সারা শরীরে তীব্র চুলকানি
ত্বকে কোনো ধরনের র্যাশ, অ্যালার্জি বা ফুসকুড়ি ছাড়াই সারা শরীরে মারাত্মক চুলকানি (Itchy skin) হতে পারে। ক্যান্সারের কোষগুলো থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থের কারণে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এই অস্বাভাবিক চুলকানি দেখা যায়।
সাধারণ ইনফেকশন নাকি ক্যান্সার? বুঝবেন কীভাবে?
লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া মানেই ক্যান্সার নয়। নিচের টেবিল থেকে সাধারণ ইনফেকশন এবং ক্যান্সারের পার্থক্য সহজেই বুঝতে পারবেন:
| বৈশিষ্ট্যের ধরন | সাধারণ ইনফেকশন (যেমন: সর্দি/টনসিল) | লিম্ফ নোড ক্যান্সার (লিম্ফোমা) |
| ব্যথা ও অনুভূতি | ফুলে যাওয়া নোডে প্রচণ্ড ব্যথা থাকে এবং নরম হয়। | ফোলা নোডে কোনো ব্যথা থাকে না এবং বেশ শক্ত হয়। |
| আকার পরিবর্তন | ইনফেকশন সেরে গেলে এটি ছোট হয়ে মিলিয়ে যায়। | এটি ছোট হয় না, বরং ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। |
| স্থায়িত্বকাল | সাধারণত ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। | ২-৩ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে একই রকম থাকে বা বাড়ে। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. লিম্ফ নোড ফুলে গেলে কখন ডাক্তারের কাছে যাওয়া জরুরি?
উত্তর: যদি ফোলা অংশটি ২ থেকে ৩ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, ব্যথাহীন ও শক্ত হয়, এবং এর সাথে জ্বর বা হঠাৎ ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকে, তবে দ্রুত একজন অনকোলজিস্ট বা ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
২. লিম্ফ নোড ক্যান্সার কি পুরোপুরি ভালো হয়?
উত্তর: হ্যাঁ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে লিম্ফোমার চিকিৎসা (যেমন: কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি বা ইমিউনোথেরাপি) অনেক উন্নত। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করা গেলে বেশিরভাগ লিম্ফোমা রোগীই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
৩. ঘাড়ের নোড ফুললেই কি বায়োপসি করতে হবে?
উত্তর: সব ক্ষেত্রে নয়। চিকিৎসক প্রথমে শারীরিক পরীক্ষা এবং আল্ট্রাসাউন্ড বা রক্ত পরীক্ষা দেন। যদি ক্যান্সারের সন্দেহ হয়, তবেই নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি ছোট সূঁচের মাধ্যমে (FNAC) বা বায়োপসি করে পরীক্ষা করা হয়।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। শরীরে কোনো ফোলা চাকা দেখলে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে, কিংবা নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।