জন্ডিস (Jaundice) আসলে নিজে কোনো রোগ নয়, বরং এটি শরীরে লুকিয়ে থাকা অন্য কোনো রোগের (বিশেষ করে লিভারের সমস্যার) একটি উপসর্গ বা সংকেত মাত্র। আমাদের রক্তে যখন ‘বিলিরুবিন’ (Bilirubin) নামক একটি হলুদ রঞ্জক পদার্থের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়, তখন শরীরের বিভিন্ন অংশ হলুদ হতে শুরু করে।
লিভার বা যকৃৎ যদি সঠিকভাবে কাজ করতে না পারে, তখনই রক্তে বিলিরুবিন জমতে থাকে। প্রাথমিক অবস্থায় জন্ডিসের লক্ষণ শনাক্ত করে সঠিক চিকিৎসা না নিলে এটি লিভার ড্যামেজ বা লিভার ফেইলিউরের মতো মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। চলুন জেনে নিই, জন্ডিস হলে শরীর কী কী সংকেত দেয়।
জন্ডিস রোগের প্রধান ৫টি লক্ষণ ও শারীরিক সংকেত
রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বাড়ার সাথে সাথে শরীরে নিচের লক্ষণগুলো স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়:
চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া: জন্ডিসের সবচেয়ে প্রধান এবং দৃশ্যমান লক্ষণ হলো চোখের সাদা অংশ এবং পুরো শরীর ধীরে ধীরে হলুদ হয়ে যাওয়া। বিলিরুবিনের মাত্রা যত বাড়ে, হলদেটে ভাব তত গাঢ় হয়।
প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া: রক্তে জমে থাকা অতিরিক্ত বিলিরুবিন কিডনির মাধ্যমে প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। এর ফলে প্রস্রাবের রং গাঢ় হলুদ, সরিষার তেলের মতো বা কালচে রঙের হয়ে যায়।
মলের রং ফ্যাকাশে বা সাদাটে হওয়া: লিভার থেকে বিলিরুবিন অন্ত্রে পৌঁছাতে না পারলে মলের স্বাভাবিক রং নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মলের রং অত্যন্ত ফ্যাকাশে, ছাই রঙের বা সাদাটে হয়ে যেতে পারে।
তীব্র জ্বর, কাঁপুনি ও বমি ভাব: লিভারে কোনো ইনফেকশন (যেমন: হেপাটাইটিস ভাইরাস) থাকলে জন্ডিসের সাথে হঠাৎ করে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসতে পারে। পাশাপাশি খাবারে মারাত্মক অরুচি এবং বমি বমি ভাব থাকে।
পেটে ব্যথা ও চরম শারীরিক ক্লান্তি: লিভার বড় হয়ে গেলে বা প্রদাহ হলে পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে তীব্র ব্যথা বা ভারীভাব অনুভূত হয়। লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে রোগী সারাক্ষণ চরম ক্লান্তি এবং শারীরিক দুর্বলতায় ভোগেন।
নবজাতক শিশুদের জন্ডিস (Neonatal Jaundice)
| জন্ডিসের ধরন | কারণ ও লক্ষণ | করণীয় |
| ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস | জন্মের পর শিশুর লিভার পুরোপুরি পরিণত না হওয়ায় এটি হয়। শিশু কিছুটা হলুদ দেখায়। | এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। সকালে হালকা রোদে রাখলে এবং বারবার বুকের দুধ খাওয়ালে সেরে যায়। |
| প্যাথলজিক্যাল জন্ডিস | রক্তের গ্রুপে সমস্যা বা ইনফেকশনের কারণে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শরীর মারাত্মক হলুদ হয়ে যায়। | দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে ফটোথেরাপি (Phototherapy) বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয়। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. জন্ডিস হলে কি শুধু পানি বা আখের রস খেতে হবে?
উত্তর: এটি একটি ভুল ধারণা। জন্ডিস হলে শুধু পানি বা আখের রস খেলে শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। রোগীকে প্রচুর তরল খাবারের পাশাপাশি সহজে হজম হয় এমন পুষ্টিকর ও শর্করাযুক্ত খাবার দিতে হবে। অতিরিক্ত তেল ও মসলাযুক্ত খাবার সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে হবে।
২. জন্ডিস কি ছোঁয়াচে রোগ?
উত্তর: জন্ডিস নিজে ছোঁয়াচে নয়, তবে যে ভাইরাসের (যেমন: হেপাটাইটিস এ বা ই) কারণে জন্ডিস হয়েছে, সেটি দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে অন্যের শরীরে ছড়াতে পারে।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দিলে কবিরাজি, ঝাড়ফুঁক বা অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার পেছনে সময় নষ্ট করবেন না। এতে লিভার চিরতরে নষ্ট হয়ে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। দ্রুত লিভার বিশেষজ্ঞ (Hepatologist) বা মেডিসিন ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে রক্ত পরীক্ষা (Bilirubin test) করান।