আমাদের দেশে তামাক, জর্দা, পান-সুপারি বা ধূমপানের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে গলার ক্যান্সার (Throat Cancer) বা ওরাল ক্যান্সারের হার দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গলার ক্যান্সার বলতে মূলত ফ্যারিংস (Pharynx), ল্যারিংস (Larynx) বা টনসিলের ক্যান্সারকে বোঝায়।
প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগ শনাক্ত করা গেলে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা সম্ভব। কিন্তু সাধারণ গলা ব্যথা ভেবে অনেকেই শুরুতে এটিকে অবহেলা করেন, যা পরবর্তীতে মারাত্মক আকার ধারণ করে। তাই সময় থাকতে গলায় ক্যান্সারের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। চলুন জেনে নিই, গলার ক্যান্সার হলে শরীর শুরুতে কী কী সংকেত দেয়।
গলায় ক্যান্সারের ৫টি প্রাথমিক লক্ষণ ও সংকেত
সাধারণ গলা ব্যথা বা টনসিলের ইনফেকশন সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যেই ভালো হয়ে যায়। কিন্তু নিচের লক্ষণগুলো যদি একটানা দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তবে তা ক্যান্সারের সংকেত হতে পারে:
দীর্ঘস্থায়ী গলা ব্যথা ও খুসখুসে কাশি: কোনো কারণ ছাড়াই একটানা গলা ব্যথা থাকা এবং ওষুধ খাওয়ার পরও তা না কমা। এর সাথে দীর্ঘমেয়াদি খুসখুসে কাশি থাকতে পারে, যা কোনোভাবেই সারে না। অনেক সময় কাশির সাথে রক্তও বের হতে পারে।
গলার স্বর পরিবর্তন বা বসে যাওয়া: এটি গলার ক্যান্সারের (বিশেষ করে ল্যারিংস বা স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারের) অন্যতম প্রধান লক্ষণ। গলার স্বর হঠাৎ করে ফ্যাঁসফ্যাঁসে হয়ে যায় বা স্বর বসে যায় এবং দুই সপ্তাহের বেশি সময় পার হলেও তা আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।
খাবার গিলতে অসুবিধা বা ব্যথা: যেকোনো শক্ত খাবার, এমনকি পানি বা তরল খাবার গিলতেও প্রচণ্ড কষ্ট হয় (Dysphagia)। মনে হয় যেন গলার ভেতর কোনো কিছু আটকে বা দলা পাকিয়ে আছে এবং খাবার নামতে চাইছে না।
গলায় কোনো পিণ্ড বা ফোলা অংশ: গলার বাইরের দিকে বা ভেতরের দিকে আঙুল দিলে যদি কোনো শক্ত পিণ্ড, গোটা বা ফোলা অংশ অনুভব হয় এবং সেটি যদি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।
কানে একটানা ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট: গলার স্নায়ুগুলো কানের সাথে যুক্ত থাকে। তাই গলায় টিউমার হলে অনেক সময় কানে একটানা তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। এছাড়া টিউমার বড় হয়ে শ্বাসনালীতে চাপ দিলে শ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হয় বা শ্বাস নেওয়ার সময় শব্দ হয়।
সাধারণ গলা ব্যথা বনাম গলার ক্যান্সার (পার্থক্য বুঝুন)
| লক্ষণের ধরন | সাধারণ গলা ব্যথা বা ইনফেকশন | গলার ক্যান্সার |
| স্থায়িত্বকাল | সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই সাধারণ ওষুধে সেরে যায়। | সপ্তাহের পর সপ্তাহ পার হলেও কমে না, বরং দিন দিন বাড়তে থাকে। |
| খাবার গিলতে কষ্ট | ঢোক গিললে সাময়িক ব্যথা হয়, তবে নরম খাবার খাওয়া যায়। | ঢোক গিলতে প্রচণ্ড কষ্ট হয় এবং গলায় সবসময় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি কাজ করে। |
| গলার স্বর | সর্দি-কাশির কারণে স্বর ভারী হলেও সর্দি কমলে ঠিক হয়ে যায়। | একটানা গলার স্বর বসে যায় এবং অ্যান্টিবায়োটিক খেলেও পরিবর্তন আসে না। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. গলার ক্যান্সার হওয়ার প্রধান কারণগুলো কী কী?
উত্তর: গলার ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় কারণ হলো অতিরিক্ত ধূমপান এবং তামাকজাত দ্রব্য (জর্দা, খৈনি, গুল, পান-সুপারি) সেবন। এছাড়া অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান এবং হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV)-এর সংক্রমণও গলার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
২. প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে গলার ক্যান্সার কি নিরাময়যোগ্য?
উত্তর: হ্যাঁ। প্রাথমিক পর্যায়ে (স্টেজ ১ বা ২) ক্যান্সার ধরা পড়লে সার্জারি, রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপির মাধ্যমে গলার ক্যান্সার সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। ওপরের লক্ষণগুলোর কোনো একটি যদি আপনার বা আপনার পরিচিত কারও মধ্যে ২ থেকে ৩ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তবে সাধারণ ফার্মেসি থেকে ওষুধ খেয়ে সময় নষ্ট করবেন না। দ্রুত একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ (ENT Specialist) বা অনকোলজিস্টের পরামর্শ নিয়ে এন্ডোস্কোপি বা বায়োপসি করান।