পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্যে ‘শুক্রাণু কমে যাওয়া’ বা স্পার্ম কাউন্ট হ্রাস পাওয়া বর্তমানে অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে অনেক পুরুষই নীরবে এই সমস্যায় ভুগছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় শুক্রাণু কমে যাওয়ার এই সমস্যাকে ‘অলিগোস্পার্মিয়া’ (Oligospermia) বলা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বেশিরভাগ পুরুষই বুঝতে পারেন না যে তাদের শুক্রাণু কমে যাচ্ছে, যতক্ষণ না তারা সন্তান জন্মদানের চেষ্টা করেন। তবে শরীর সূক্ষ্ম কিছু লক্ষণের মাধ্যমে এই সমস্যার আগাম সংকেত দেয়। চলুন, শুক্রাণু কমে যাওয়ার প্রধান লক্ষণ এবং এর পেছনের কারণগুলো বিস্তারিত জেনে নিই।
শুক্রাণু কমে যাওয়ার প্রধান ৫টি লক্ষণ
শুক্রাণুর সংখ্যা কমে গেলে শরীর মূলত হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বা অন্তর্নিহিত অন্য কোনো সমস্যার কারণে নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ করে:
১. সন্তান ধারণে দীর্ঘমেয়াদী ব্যর্থতা
শুক্রাণু কমে যাওয়ার সবচেয়ে প্রধান এবং স্পষ্ট লক্ষণ হলো ইনফার্টিলিটি বা বন্ধ্যাত্ব। স্বামী-স্ত্রী কোনো ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ছাড়া একটানা এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে চেষ্টা করার পরও যদি স্ত্রী গর্ভবতী না হন, তবে তা পুরুষের শুক্রাণু কমে যাওয়া বা দুর্বল শুক্রাণুর একটি বড় সংকেত হতে পারে।
২. যৌন আকাঙ্ক্ষা বা লিবিডো কমে যাওয়া
টেস্টোস্টেরন হরমোন পুরুষদের যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং শুক্রাণু উৎপাদন—দুটিই নিয়ন্ত্রণ করে। রক্তে এই হরমোনের মাত্রা কমে গেলে শুক্রাণুর সংখ্যা যেমন কমে যায়, তেমনি পুরুষের স্বাভাবিক যৌন আকাঙ্ক্ষা বা মিলনের ইচ্ছাও মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।
৩. অণ্ডকোষের আশপাশে ব্যথা বা ফুলে যাওয়া
অনেক সময় অণ্ডকোষের ভেতরের শিরাগুলো অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ভ্যারিকোসিল’ (Varicocele) বলা হয়। এর ফলে অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং শুক্রাণু উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এই সমস্যার কারণে অণ্ডকোষে একটানা চিনচিনে ব্যথা বা ভারী ভাব অনুভূত হতে পারে।
৪. লিঙ্গ উত্থানে সমস্যা বা ইরেক্টাইল ডিসফাংশন
শুক্রাণু কমে যাওয়ার পেছনের হরমোনাল সমস্যাগুলো অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের লিঙ্গ উত্থানেও (Erectile dysfunction) বাধা সৃষ্টি করে। এটি শারীরিক বা মানসিক উভয় কারণেই হতে পারে এবং এটি প্রজনন স্বাস্থ্যের অবনতির একটি বড় লক্ষণ।
৫. শরীরের লোম কমে যাওয়া ও শারীরিক পরিবর্তন
ক্রোমোজোম বা হরমোনের মারাত্মক কোনো সমস্যার কারণে শুক্রাণু কমে গেলে, তার প্রভাব পুরুষের শারীরিক গঠনেও পড়ে। এর ফলে হঠাৎ করে মুখের দাড়ি-গোঁফ বা বুকের লোম কমে যাওয়া এবং পেশির দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
এক নজরে শুক্রাণুর স্বাভাবিক মাত্রা ও অবস্থা
সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে বীর্যে শুক্রাণুর স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক মাত্রা তুলে ধরা হলো:
| শুক্রাণুর অবস্থা | প্রতি মিলিলিটারে শুক্রাণুর পরিমাণ |
| স্বাভাবিক মাত্রা | ১.৫ কোটি থেকে ২০ কোটির বেশি। |
| কম মাত্রা (অলিগোস্পার্মিয়া) | ১.৫ কোটির নিচে নেমে যাওয়া। |
| শুক্রাণু শূন্যতা (অ্যাজুস্পার্মিয়া) | বীর্যে কোনো শুক্রাণুই না থাকা। |
শুক্রাণু কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো কী?
শুক্রাণু কমে যাওয়ার পেছনে শারীরিক জটিলতার পাশাপাশি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অনেক বড় প্রভাব রয়েছে:
অতিরিক্ত তাপমাত্রা: দীর্ঘক্ষণ কোলের ওপর ল্যাপটপ রেখে কাজ করা, অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল করা বা টাইট অন্তর্বাস পরার কারণে অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে শুক্রাণু ধ্বংস হয়ে যায়।
ধূমপান ও অ্যালকোহল: অতিরিক্ত ধূমপান এবং মদ্যপান শুক্রাণুর ঘনত্ব এবং এর চলাচলের ক্ষমতা (Motility) সরাসরি কমিয়ে দেয়।
মানসিক চাপ ও ওজন: অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা স্ট্রেস হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। এছাড়া অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা শুক্রাণুর গুণগত মান নষ্ট করার অন্যতম বড় কারণ।
ইনফেকশন বা সংক্রমণ: প্রজননতন্ত্রে কোনো ধরনের ইনফেকশন বা যৌনবাহিত রোগ (যেমন- গনোরিয়া, ক্ল্যামিডিয়া) থাকলে তা শুক্রাণু উৎপাদনের পথ বন্ধ করে দিতে পারে।
শুক্রাণু বাড়াতে করণীয় ও চিকিৎসা
শুক্রাণু কমে যাওয়ার সমস্যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক জীবনযাপন এবং চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময়যোগ্য।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং জিংক সমৃদ্ধ খাবার (যেমন- কাঠবাদাম, কুমড়ার বীজ, ডিম, ডালিম এবং সামুদ্রিক মাছ) প্রচুর পরিমাণে রাখতে হবে।
নিয়মিত ব্যায়াম করে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ধূমপান সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়া অপরিহার্য।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। একটানা এক বছর চেষ্টার পরও সন্তান না হলে হতাশ না হয়ে দ্রুত একজন ইউরোলজিস্ট (Urologist) বা ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। একটি সাধারণ ‘সিমেন অ্যানালাইসিস’ (Semen Analysis) টেস্টের মাধ্যমেই শুক্রাণুর সঠিক অবস্থা জানা সম্ভব।