বেরিবেরি রোগ কী? এর কারণ, ৫টি মারাত্মক লক্ষণ ও চিকিৎসা

বেরিবেরি (Beriberi) অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম হলেও, অনেকেই জানেন না রোগটি আসলে কেন হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, বেরিবেরি হলো শরীরে ভিটামিন বি-১ বা ‘থায়ামিন’ (Thiamine) এর মারাত্মক অভাবজনিত একটি রোগ।
ভিটামিন বি-১ আমাদের খাবার থেকে পাওয়া শর্করাকে এনার্জি বা শক্তিতে রূপান্তর করতে এবং স্নায়ুতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। শরীরে এই থায়ামিনের চরম ঘাটতি দেখা দিলে পেশি, স্নায়ু এবং হার্ট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একেই ‘বেরিবেরি রোগ’ বলা হয়। চলুন, এই রোগের প্রকারভেদ, লক্ষণ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।


বেরিবেরি রোগের প্রধান দুটি ধরন


বেরিবেরি মূলত মানুষের শরীরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে আক্রমণ করে। এর ওপর ভিত্তি করে রোগটিকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়:
ড্রাই বেরিবেরি (Dry Beriberi): এটি সরাসরি মানুষের স্নায়ুতন্ত্র বা নার্ভের চরম ক্ষতি করে। এর ফলে পেশি দুর্বল হয়ে যায় এবং অনেক সময় হাত ও পায়ের পেশি পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা প্যারালাইজড হয়ে যেতে পারে।
ওয়েট বেরিবেরি (Wet Beriberi): এটি কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম অর্থাৎ হার্ট এবং রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়াকে আক্রমণ করে। এটি হার্টের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে মারাত্মক হার্ট ফেইলিউর হতে পারে।


বেরিবেরি রোগের ৫টি মারাত্মক লক্ষণ


শরীরে থায়ামিনের ঘাটতি দেখা দিলে ধরন অনুযায়ী নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে:
১. হাত-পা অবশ হওয়া ও পেশিতে ব্যথা
ড্রাই বেরিবেরির সবচেয়ে প্রাথমিক লক্ষণ হলো হাত এবং পায়ের পাতায় ঝিঁঝি ধরা বা অবশ হয়ে যাওয়া। এর পাশাপাশি পায়ের পেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয় এবং পেশি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে থাকে।
২. হাঁটতে কষ্ট হওয়া ও ভারসাম্য হারানো
স্নায়ু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে রোগীর স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে প্রচণ্ড কষ্ট হয়। শরীর তার ভারসাম্য রাখতে পারে না এবং কোনো ভারী জিনিস তোলার ক্ষমতা একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়।
৩. তীব্র শ্বাসকষ্ট ও বুক ধড়ফড় করা
ওয়েট বেরিবেরি হলে রোগীর হার্টবিট অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় বা বুক ধড়ফড় করে। একটু পরিশ্রম করলে বা রাতে ঘুমাতে গেলে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।
৪. পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া
হার্ট যখন শরীরে ঠিকমতো রক্ত পাম্প করতে পারে না, তখন শরীরের নিচের অংশে, বিশেষ করে পা এবং গোড়ালিতে পানি জমতে শুরু করে। এর ফলে পা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় (Edema)।
৫. মানসিক বিভ্রান্তি ও কথা জড়িয়ে যাওয়া
মস্তিষ্কে থায়ামিনের অভাবে স্নায়ুকোষ ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে রোগীর চরম মানসিক বিভ্রান্তি দেখা দেয়, স্মৃতিশক্তি লোপ পায় এবং কথা বলার সময় কথা জড়িয়ে বা আটকে যায়।


বেরিবেরি রোগ কেন হয়? (প্রধান কারণসমূহ)


সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে বেরিবেরি রোগের প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো:

প্রধান কারণকীভাবে বেরিবেরি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়?
পলিশ করা সাদা চাল খাওয়াঅতিরিক্ত রিফাইন বা মেশিনে ছাঁটা সাদা চালে থায়ামিন নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘদিন এমন চাল খেলে এই রোগ হয়।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল পানঅ্যালকোহল শরীরকে থায়ামিন শোষণ করতে দেয় না, যা বেরিবেরির সবচেয়ে বড় কারণ।
অতিরিক্ত ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডএই রোগগুলোতে শরীর থেকে প্রস্রাবের মাধ্যমে অতিরিক্ত থায়ামিন বের হয়ে যেতে পারে।
গর্ভাবস্থায় চরম বমিগর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত বমির কারণে শরীরে থায়ামিনের তীব্র ঘাটতি দেখা দিতে পারে।


চিকিৎসা ও প্রতিকার


বেরিবেরি রোগ মারাত্মক হলেও, এটি খুব সহজেই সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য:
থায়ামিন সাপ্লিমেন্ট: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনজেকশন বা ট্যাবলেটের মাধ্যমে ভিটামিন বি-১ বা থায়ামিন গ্রহণ করলে রোগী খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।
থায়ামিন যুক্ত খাবার: খাদ্যতালিকায় লাল চাল (Brown rice), লাল আটা, ডাল, মটরশুঁটি, সূর্যমুখীর বীজ, ডিম এবং মাংস প্রচুর পরিমাণে রাখতে হবে।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. বেরিবেরি কি ছোঁয়াচে রোগ?
উত্তর: একদমই না। এটি পুরোপুরি পুষ্টির অভাবজনিত একটি রোগ, যা কখনোই একজন থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়ায় না।
২. শিশুদের কি বেরিবেরি হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, শিশুদেরও বেরিবেরি হতে পারে। যেসব মায়েরা থায়ামিনের অভাবে ভোগেন, তাদের বুকের দুধ খেলে নবজাতক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। ওপরের লক্ষণগুলো দেখা দিলে নিজে থেকে কোনো ওষুধের দোকান থেকে ভিটামিন না কিনে অতিসত্বর একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। রক্ত বা প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমেই থায়ামিনের মাত্রা নির্ণয় করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *