এপেন্ডিসাইটিসের ৫টি প্রধান লক্ষণ ও জরুরি করণীয়

মানুষের পেটের ডান দিকের নিচের অংশে বৃহদান্ত্রের সাথে যুক্ত ছোট, আঙুলের মতো আকৃতির একটি থলি থাকে, যাকে ‘এপেন্ডিক্স’ (Appendix) বলা হয়। মানবদেহে এর কোনো বিশেষ কাজ নেই। তবে কোনো কারণে যদি এই থলিতে ইনফেকশন বা প্রদাহ হয় এবং এটি ফুলে যায়, তখন সেই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘এপেন্ডিসাইটিস’ (Appendicitis) বলা হয়।
এপেন্ডিসাইটিস কোনো সাধারণ পেটের ব্যথা নয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এপেন্ডিক্স ফেটে গিয়ে পুরো পেটে বিষাক্ত ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা রোগীর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। চলুন, গ্যাস্ট্রিকের ব্যথার সাথে এর পার্থক্য এবং এপেন্ডিসাইটিসের প্রধান ৫টি লক্ষণ বিস্তারিত জেনে নিই।


এপেন্ডিসাইটিসের প্রধান ৫টি লক্ষণ


এপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা হঠাৎ করেই শুরু হয় এবং খুব দ্রুত এর তীব্রতা বাড়তে থাকে। শরীর মূলত নিচের লক্ষণগুলোর মাধ্যমে এই মারাত্মক বিপদের সংকেত দেয়:
১. নাভির চারপাশ থেকে ডান দিকের নিচে ব্যথা
এপেন্ডিসাইটিসের সবচেয়ে ক্লাসিক বা প্রধান লক্ষণ হলো পেটের ব্যথা। ব্যথাটি প্রথমে নাভির চারপাশ থেকে হালকাভাবে শুরু হয়। এরপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে (সাধারণত ১২-২৪ ঘণ্টা) ব্যথাটি ধীরে ধীরে পেটের ডান দিকের নিচের অংশে (যেখানে এপেন্ডিক্স থাকে) গিয়ে তীব্র আকার ধারণ করে এবং সেখানে স্থির হয়ে যায়।
২. হাঁটাচলা বা কাশি দিলে ব্যথা মারাত্মক বেড়ে যাওয়া
এই ব্যথা সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের মতো নয়। রোগী যখন হাঁটাচলা করেন, দীর্ঘশ্বাস নেন, হাঁচি বা কাশি দেন, তখন পেটের ডান দিকের নিচে তীক্ষ্ণ বা ছুরিকাঘাতের মতো তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। ব্যথার কারণে রোগী অনেক সময় সোজা হয়ে দাঁড়াতে বা হাঁটতেও পারেন না।
৩. বমি বমি ভাব ও খাবারে চরম অরুচি
তীব্র পেটের ব্যথার পরপরই রোগীর মারাত্মক বমি বমি ভাব (Nausea) শুরু হয় এবং অনেক সময় বমিও হতে পারে। এর পাশাপাশি রোগীর খাবারে চরম অরুচি দেখা দেয়। প্রিয় কোনো খাবার সামনে দিলেও তার খেতে ইচ্ছা করে না।
৪. হালকা জ্বর ও শীত শীত ভাব
ইনফেকশনের কারণে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হয়। ফলে রোগীর শরীরে হালকা জ্বর (সাধারণত ৯৯° – ১০০.৫° ফারেনহাইট) আসে এবং এর সাথে শীত শীত ভাব বা কাঁপুনি থাকতে পারে। এপেন্ডিক্স ফেটে গেলে জ্বরের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
৫. পেট ফুলে যাওয়া ও কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে পেট ফুলে শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়। এর সাথে কোষ্ঠকাঠিন্য অথবা বারবার ডায়রিয়ার মতো পাতলা পায়খানা হতে পারে। এমনকি রোগীর গ্যাস বের করতেও মারাত্মক কষ্ট বা ব্যথা অনুভূত হয়।


গ্যাসের ব্যথা বনাম এপেন্ডিসাইটিস: পার্থক্য বুঝবেন কীভাবে?


অনেকেই এপেন্ডিসাইটিসের ব্যথাকে গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা ভেবে এন্টাসিড খেয়ে সময় নষ্ট করেন। সহজে পার্থক্য বোঝার জন্য নিচের টেবিলটি খেয়াল করুন:

লক্ষণের ধরনগ্যাস্ট্রিক বা বদহজমের ব্যথাএপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা (Medical Emergency)
ব্যথার অবস্থানসাধারণত পেটের ওপরের অংশে বা বুকের মাঝখানে হয়।নাভি থেকে শুরু হয়ে পেটের ডান দিকের নিচে গিয়ে তীব্র হয়।
ব্যথার ধরনজ্বালাপোড়া বা মোচড়ানো ব্যথা, যা জায়গা পরিবর্তন করতে পারে।নির্দিষ্ট এক জায়গায় সুচ ফোটানো বা তীক্ষ্ণ ব্যথা হয়।
কী করলে ব্যথা কমে?ঢেকুর তুললে বা গ্যাসের ওষুধ খেলে ব্যথা কমে যায়।কোনো ওষুধ বা বিশ্রামেই ব্যথা কমে না, বরং নড়াচড়া করলে বাড়ে।
পেটে চাপ দিলেপেটে চাপ দিলে খুব বেশি ব্যথা বাড়ে না।পেটের ডান দিকের নিচে চাপ দিয়ে ছেড়ে দিলে তীব্র ব্যথা লাফিয়ে ওঠে (Rebound tenderness)।


এপেন্ডিসাইটিস হলে তাৎক্ষণিক করণীয়


এপেন্ডিসাইটিসের লক্ষণ দেখা দিলে বিন্দুমাত্র অবহেলা করা যাবে না। তাৎক্ষণিকভাবে নিচের বিষয়গুলো মেনে চলা অপরিহার্য:
খাবার ও পানি বন্ধ রাখা: পেটের ডান দিকের নিচে তীব্র ব্যথা হলে রোগীকে কোনো ধরনের খাবার, পানি বা জুস খেতে দেওয়া যাবে না। কারণ, আল্ট্রাসাউন্ড বা জরুরি অপারেশনের প্রয়োজন হলে পেট খালি থাকা আবশ্যক।
ব্যথার ওষুধ না খাওয়া: ডাক্তার দেখানোর আগে ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে কোনো ব্যথানাশক ওষুধ (Painkillers) খাবেন না। এতে ব্যথার আসল কারণ ও তীব্রতা চাপা পড়ে যায় এবং রোগ নির্ণয়ে মারাত্মক সমস্যা হয়।
দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর: এক মুহূর্তও দেরি না করে রোগীকে সরাসরি সার্জারি সুবিধা আছে এমন কোনো হাসপাতালে বা ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যেতে হবে।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও প্রাথমিক চিকিৎসা সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। এপেন্ডিসাইটিস একটি জীবনঘাতী সমস্যা হতে পারে। তাই পেটের ডান দিকের নিচে তীব্র ব্যথা হলে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেয়ে অপেক্ষা না করে দ্রুত একজন সার্জারি বিশেষজ্ঞ বা সাধারণ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। একটি সাধারণ আল্ট্রাসনোগ্রাম (USG of Whole Abdomen) বা রক্তের সিবিসি (CBC) টেস্ট করলেই এই রোগ নিশ্চিতভাবে ধরা পড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *