স্বাভাবিক এবং সুস্থ মানুষের পায়খানা বা মলের রং সাধারণত বাদামি (Brown) হয়ে থাকে। কিন্তু বাথরুমে গিয়ে হঠাৎ মলের রং সবুজ (Green Stool) দেখলে ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। অনেকেই একে বড় কোনো ইনফেকশন বা লিভারের রোগ ভেবে চরম মানসিক চাপে পড়ে যান।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, মলের রং সাময়িকভাবে সবুজ হওয়াটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো মারাত্মক রোগের লক্ষণ নয়। এটি সাধারণত আমাদের খাদ্যাভ্যাস বা ওষুধের কারণে হয়ে থাকে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি হজম প্রক্রিয়ার ত্রুটিরও সংকেত দেয়। চলুন, মলের রং সবুজ হওয়ার প্রধান ৫টি কারণ এবং এর পেছনের বিজ্ঞানটি বিস্তারিত জেনে নিই।
সবুজ পায়খানা হওয়ার প্রধান ৫টি কারণ
আমাদের হজম প্রক্রিয়া এবং খাদ্যাভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে মূলত নিচের কারণগুলোতে মলের রং সবুজ হতে পারে:
১. প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি খাওয়া
সবুজ পায়খানা হওয়ার সবচেয়ে সাধারণ ও প্রধান কারণ হলো খাদ্যাভ্যাস। পালং শাক, ব্রকলি, মটরশুঁটি বা যেকোনো গাঢ় সবুজ শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে ‘ক্লোরোফিল’ (Chlorophyll) থাকে, যা উদ্ভিদকে সবুজ রং দেয়। অতিরিক্ত সবুজ শাকসবজি খেলে শরীর সব ক্লোরোফিল হজম করতে পারে না, ফলে মলের রং গাঢ় সবুজ হয়ে যায়।
২. পিত্তরস বা বাইল (Bile) দ্রুত বেরিয়ে যাওয়া
আমাদের লিভার ‘পিত্তরস’ বা বাইল নামক একটি তরল তৈরি করে, যার আসল রং উজ্জ্বল সবুজ বা হলদেটে। হজমের সময় এই পিত্তরস যখন অন্ত্রের ভেতর দিয়ে যায়, তখন ব্যাকটেরিয়ার কারণে তা ধীরে ধীরে বাদামি রঙে পরিণত হয়। কিন্তু যদি আপনার ডায়রিয়া বা ফুড পয়জনিং থাকে, তবে খাবার অত্যন্ত দ্রুত অন্ত্র পার হয়ে যায় (Rapid transit)। ফলে পিত্তরস বাদামি হওয়ার সময় পায় না এবং মল সবুজ রঙের বের হয়।
৩. কৃত্রিম ফুড কালার বা রঙের প্রভাব
বর্তমানে অনেক বেকারির খাবার, কেক, পেস্ট্রি, আইসক্রিম বা কোমল পানীয়তে কৃত্রিম সবুজ ফুড কালার ব্যবহার করা হয়। এছাড়া নীল এবং হলুদ রঙের খাবার একসাথে খেলেও পেটে তা মিশে সবুজ হয়ে যায়। আমাদের শরীর এই কৃত্রিম রংগুলো পুরোপুরি হজম করতে পারে না বলে মলের সাথে তা বের করে দেয়।
৪. আয়রন সাপ্লিমেন্ট বা ট্যাবলেটের প্রভাব
রক্তশূন্যতা দূর করার জন্য যারা চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ‘আয়রন ট্যাবলেট’ বা সাপ্লিমেন্ট সেবন করেন, তাদের মলের রং প্রায়ই গাঢ় সবুজ বা কালো হয়ে যেতে পারে। এটি ওষুধের একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং এতে ভয়ের কিছু নেই।
৫. অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ অনেক সময় আমাদের পেটের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকেও মেরে ফেলে। এই উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোই মূলত পিত্তরসের সবুজ রংকে বাদামি রঙে রূপান্তর করে। অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার ফলে এই প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে এবং মলের রং সাময়িকভাবে সবুজ হতে পারে।
এক নজরে মলের রং ও সম্ভাব্য রোগের সংকেত
সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে মলের বিভিন্ন রং এবং এর সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরা হলো:
| মলের রং | সম্ভাব্য কারণ বা শরীরের সংকেত |
| বাদামি (Brown) | সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও সুস্থ হজম প্রক্রিয়ার লক্ষণ। |
| সবুজ (Green) | সবুজ শাকসবজি খাওয়া অথবা ডায়রিয়ার কারণে পিত্তরস দ্রুত বেরিয়ে যাওয়া। |
| কালো (Black) | পাকস্থলীর ভেতরে রক্তক্ষরণ অথবা আয়রন ট্যাবলেটের প্রভাব। |
| উজ্জ্বল লাল (Red) | পাইলস, ফিস্টুলা বা মলাশয়ে (Rectum) রক্তপাতের মারাত্মক সংকেত। |
| সাদা বা ফ্যাকাশে | লিভার বা পিত্তনালীতে পাথর বা ব্লক (Bile duct obstruction) থাকার লক্ষণ। |
নবজাতক ও শিশুদের সবুজ পায়খানা: এটা কি স্বাভাবিক?
মা-বাবারা শিশুদের সবুজ পায়খানা দেখে অনেক সময় আতঙ্কিত হন। কিন্তু নবজাতক বা বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়:
মেকোনিয়াম (Meconium): জন্মের পর শিশুর প্রথম কয়েকদিনের মল অত্যন্ত গাঢ় সবুজ বা কালচে রঙের হয়, যা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক।
মায়ের দুধের প্রভাব: বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের মল অনেক সময় হালকা সবুজ বা হলদেটে হতে পারে। যদি শিশু সুস্থ থাকে এবং ওজন ঠিকমতো বাড়ে, তবে এটি নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পর সাধারণত ২-৩ দিনের মধ্যেই মলের রং স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে:
সবুজ মলের সাথে একটানা ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা থাকলে এবং শরীর মারাত্মক দুর্বল হয়ে গেলে।
মলের সাথে যদি মিউকাস (আম বা শ্লেষ্মা) এবং তীব্র দুর্গন্ধ থাকে।
পেটে প্রচণ্ড ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং জ্বরের মতো লক্ষণ দেখা দিলে।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি আপনার মলের রং একটানা কয়েকদিন সবুজ থাকে এবং এর সাথে পেটে ব্যথা বা অন্য কোনো শারীরিক অস্বস্তি থাকে, তবে নিজে থেকে কোনো ওষুধ না খেয়ে দ্রুত একজন গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট (Gastroenterologist) বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।