ভাইরাস কি শুধুই ক্ষতিকর? এর উপকারিতা ও অপকারিতা

ভাইরাস’ (Virus) শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোভিড-১৯, ডেঙ্গু, এইডস কিংবা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ভয়ংকর সব রোগের নাম। সাধারণ দৃষ্টিতে ভাইরাসকে আমরা শুধুই মানুষের জীবননাশক এক চরম শত্রু হিসেবে জানি। কিন্তু বিজ্ঞানের পরম সত্যটি হলো—এই পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ভাইরাসেরও প্রয়োজন রয়েছে!
fitnition.com-এর আজকের আয়োজনে আমরা জানবো ভাইরাসের এই দ্বৈত রূপ সম্পর্কে। অণুজীববিজ্ঞান ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে চলুন জেনে নিই ভাইরাসের প্রধান অপকারিতা এবং চমকপ্রদ কিছু উপকারিতা সম্পর্কে।


ভাইরাসের ৫টি প্রধান অপকারিতা বা ক্ষতিকর দিক


ভাইরাস মূলত এক ধরনের অকোষীয় পরজীবী। এরা কোনো জীবিত পোষক কোষের (Host cell) ভেতরে প্রবেশ না করা পর্যন্ত বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। কোষের ভেতর ঢুকে এরা কোষের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এর প্রধান ক্ষতিকর দিকগুলো হলো:
১. প্রাণঘাতী রোগ ও মহামারী সৃষ্টি
মানুষের শরীরে যত ধরনের বড় মহামারী বা সংক্রামক রোগ হয়, তার সিংহভাগই ভাইরাসের কারণে। করোনা ভাইরাস, ইবোলা, এইচআইভি (HIV), হেপাটাইটিস বি ও সি, র‍্যাবিস (জলাতঙ্ক) এবং নিপাহ ভাইরাসের মতো অণুজীব মানুষের অকাল মৃত্যুর প্রধান কারণ।
২. কোষের মিউটেশন ও ক্যান্সার সৃষ্টি
কিছু কিছু ভাইরাস মানুষের কোষে প্রবেশ করে তার ডিএনএ (DNA) কাঠামোর স্থায়ী পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটিয়ে সরাসরি ক্যান্সার তৈরি করে। এদের ‘অনকোভাইরাস’ (Oncoviruses) বলা হয়। যেমন—হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) নারীদের জরায়ুমুখ ক্যান্সারের জন্য দায়ী এবং হেপাটাইটিস ভাইরাস লিভার ক্যান্সারের কারণ।
৩. কৃষি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি
শুধু মানুষ নয়, উদ্ভিদকেও আক্রমণ করে ভাইরাস। তামাকের ‘মোজাইক রোগ’, পেঁপের ‘রিং স্পট’, আলুর ‘লিফ রোল’ কিংবা ধানের ‘টুংরো’ রোগের কারণে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার টন ফসল নষ্ট হয় এবং কৃষকরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
৪. গবাদিপশু ও পাখির প্রাণনাশ
বার্ড ফ্লু (H5N1), সোয়াইন ফ্লু, কিংবা গরুর ‘ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ’ (ক্ষুরা রোগ)-এর মতো ভাইরাল মহামারীর কারণে খামারের পর খামার পশুপাখি উজাড় হয়ে যায়, যা প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি ও অর্থনীতিতে বড় ধ্বস নামায়।
৫. অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকরতা
ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হলে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে তা সারানো যায়, কিন্তু ভাইরাসের ওপর কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। ফলে সম্পূর্ণ নতুন কোনো ভাইরাস পৃথিবীতে আবির্ভূত হলে তার কার্যকরী অ্যান্টিভাইরাল বা টিকা আবিষ্কারের আগেই লাখো প্রাণ ঝরে যায়।


ভাইরাসের ৫টি জাদুকরী উপকারিতা


শুনতে অবাক লাগলেও, বিজ্ঞানের কল্যাণে এবং প্রকৃতির নিয়মে কিছু ভাইরাস মানুষের জীবন রক্ষাকারী বন্ধুতে পরিণত হয়েছে:
১. ‘সুপারবাগ’ বা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসকারী
প্রকৃতিতে এক ধরনের বিশেষ ভাইরাস আছে যাদের বলা হয় ‘ব্যাকটেরিওফায’ (Bacteriophage)। এরা শুধু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে মেরে ফেলে। বর্তমানে যখন অনেক অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ আর শরীরে কাজ করছে না (Antibiotic resistance), তখন বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় ভরসা এই ‘ফায থেরাপি’।
২. জীবন রক্ষাকারী ভ্যাকসিন বা টিকা তৈরি
‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’ প্রবাদের বাস্তব রূপ হলো ভ্যাকসিন। পোলিও, হাম, জলবসন্ত, হেপাটাইটিস কিংবা করোনার টিকা তৈরি করা হয় মূলত ওই নির্দিষ্ট ভাইরাসেরই দুর্বল, মৃত বা নিষ্ক্রিয় সংস্করণ দিয়ে। এটি শরীরে প্রবেশ করিয়ে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে (Immunity) আসল ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়।
৩. জিন থেরাপি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভাইরাসকে ‘পোস্টম্যান’ বা বাহক (Viral Vector) হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বংশগত বা জেনেটিক ত্রুটির কারণে হওয়া জটিল রোগ (যেমন- থ্যালাসেমিয়া বা কিছু অন্ধত্ব) সারাতে, ল্যাবরেটরিতে একটি সুস্থ জিন ভাইরাসের খোলসের ভেতরে ঢুকিয়ে রোগীর ত্রুটিপূর্ণ কোষে পৌঁছে দেওয়া হয়।
৪. সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা
সমুদ্রের পানিতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ভাইরাস রয়েছে। এরা প্রতিদিন সমুদ্রের প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও প্লাঙ্কটন ধ্বংস করে। এর ফলে সমুদ্রে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং সামুদ্রিক শৈবাল পর্যাপ্ত অক্সিজেন তৈরি করতে পারে।
৫. মানব বিবর্তনে জিনগত অবদান
স্তন্যপায়ী প্রাণীদের গর্ভধারণের জন্য ‘প্লাসেন্টা’ বা অমরা অত্যন্ত জরুরি। বিজ্ঞানীদের মতে, কোটি বছর আগে ‘রেট্রোভাইরাস’ নামক এক প্রাচীন ভাইরাসের জিনগত অবদানের (Syncytin-1 gene) কারণেই আজকের স্তন্যপায়ী প্রাণীরা মায়ের গর্ভে সন্তান ধারণ করতে পারছে!


এক নজরে ভাইরাসের ভালো ও খারাপ রূপ


ক্ষেত্রভাইরাসের অপকারী ভূমিকাভাইরাসের উপকারী ভূমিকা
চিকিৎসাদুরারোগ্য ও সংক্রামক ব্যাধি ছড়ায়।টিকা ও জিন থেরাপির ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে।
অণুজীব জগতসুস্থ মানব কোষ ধ্বংস করে।ক্ষতিকর ‘সুপারবাগ’ ব্যাকটেরিয়া খেয়ে ফেলে।
প্রকৃতিফসলের উৎপাদন কমিয়ে দেয়।সমুদ্রের কার্বন ও অক্সিজেন চক্র সচল রাখে।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. ভাইরাল জ্বর বা সর্দিতে কি অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত?
উত্তর: একদমই না। অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হয়েছে ব্যাকটেরিয়া মারার জন্য। ভাইরাসের ওপর এর কোনো প্রভাব নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভাইরাল ইনফেকশনে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো মারা যায় এবং ভবিষ্যতে ওষুধ অকার্যকর হয়ে পড়ে।
২. মানবদেহের ভেতরে কি ভালো ভাইরাস থাকে?
উত্তর: হ্যাঁ, আমাদের অন্ত্রে (Gut) প্রচুর পরিমাণে ‘ব্যাকটেরিওফায’ ভাইরাস থাকে, যা অন্ত্রের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখে। একে হিউম্যান ‘ভাইরোম’ (Virome) বলা হয়।
৩. ভাইরাস কি জীব নাকি জড় পদার্থ?
উত্তর: অণুজীববিজ্ঞানে ভাইরাসকে জীব ও জড়ের ‘মধ্যবর্তী পর্যায়’ বলা হয়। কোষের বাইরে স্বাধীন অবস্থায় এটি একদম জড় পদার্থের মতো আচরণ করে (এর কোনো প্রাণ থাকে না)। কিন্তু কোনো জীবিত কোষে ঢুকলেই এটি জীবের মতো আচরণ শুরু করে।


বিশেষ বিজ্ঞান সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ বিজ্ঞানবিষয়ক তথ্য ও সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি। যেকোনো সংক্রামক বা ভাইরাল জ্বরে নিজে নিজে ফার্মেসি থেকে ওষুধ না কিনে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, প্রচুর তরল পান করুন এবং প্রয়োজনে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *