আমাদের লিভার বা যকৃতের ঠিক নিচেই ছোট নাশপাতি আকৃতির একটি থলি থাকে, যাকে ‘পিত্তথলি’ বা গলব্লাডার (Gallbladder) বলা হয়। লিভারে তৈরি হওয়া পিত্তরস (Bile) এই থলিতে জমা থাকে, যা মূলত আমাদের চর্বিযুক্ত খাবার হজম করতে সাহায্য করে। পিত্তরসে থাকা কোলেস্টেরল বা বিলিরুবিন অতিরিক্ত ঘন হয়ে গেলে তা জমে ছোট ছোট পাথরের আকার ধারণ করে, যাকে ‘পিত্তথলির পাথর’ (Gallstones) বলা হয়।
পিত্তথলিতে পাথর হলে বেশিরভাগ মানুষ একে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক বা বদহজমের সমস্যা ভেবে বছরের পর বছর গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেয়ে কালক্ষেপণ করেন। কিন্তু সঠিক সময়ে লক্ষণ চিনতে না পারলে এটি পিত্তনালীতে আটকে গিয়ে জন্ডিস বা মারাত্মক ইনফেকশনের কারণ হতে পারে। চলুন, পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার প্রধান ৫টি লক্ষণ বিস্তারিত জেনে নিই।
পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ৫টি প্রধান লক্ষণ
পিত্তথলিতে পাথর চুপচাপ বসে থাকলে (Silent stones) সাধারণত কোনো ব্যথা হয় না। কিন্তু পাথরটি যখন নড়াচড়া করে বা পিত্তনালীর মুখে আটকে যায়, তখন শরীরে নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:
১. পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে তীব্র ব্যথা
পিত্তথলিতে পাথরের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান লক্ষণ হলো পেটের ডান দিকের ওপরে (পাঁজরের ঠিক নিচে) হঠাৎ করে তীব্র ব্যথা শুরু হওয়া। এই ব্যথা সাধারণত ভারী বা চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর শুরু হয়। ব্যথাটি অত্যন্ত তীব্র এবং একটানা হয়, যা কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
২. ব্যথা ডান কাঁধ বা পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়া
পেটের ডান দিকের তীব্র ব্যথাটি অনেক সময় এক জায়গায় স্থির থাকে না। এটি ডান দিকের পাঁজরের নিচ থেকে শুরু করে পেছনের দিকে ডান কাঁধে (Right shoulder) অথবা দুই কাঁধের মাঝখানে পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘রেফার্ড পেইন’ (Referred pain) বলা হয়।
৩. তীব্র বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়া
পিত্তথলির ব্যথার সাথে সাধারণত গ্যাস্ট্রিকের ব্যথার একটি বড় পার্থক্য হলো বমি। পিত্তথলিতে ব্যথা শুরু হলে রোগীর প্রচণ্ড বমি বমি ভাব কাজ করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগী বারবার বমি করে ফেলেন। তবে বমি করার পরও পেটের ব্যথা খুব একটা কমে না।
৪. চর্বিযুক্ত বা তেল-মসলাযুক্ত খাবার হজমে সমস্যা
পিত্তথলিতে পাথর থাকলে পিত্তরস ঠিকমতো অন্ত্রে পৌঁছাতে পারে না। ফলে রোগী যখনই অতিরিক্ত তেল, চর্বিযুক্ত খাবার (যেমন- গরু বা খাসির মাংস, বিরিয়ানি বা ফাস্টফুড) খান, তখনই তার মারাত্মক বদহজম, পেট ফাঁপা এবং বুকে জ্বালাপোড়া শুরু হয়।
৫. চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)
পিত্তথলির পাথর যদি কোনো কারণে ছিটকে বেরিয়ে পিত্তনালীতে (Bile duct) গিয়ে আটকে যায়, তবে লিভারের পিত্তরস আর অন্ত্রে যেতে পারে না। তখন সেই পিত্তরস রক্তে মিশে যায়, যার ফলে রোগীর চোখ এবং ত্বক হলুদ হয়ে যায় (জন্ডিস)। এর পাশাপাশি রোগীর প্রস্রাবের রং অতিরিক্ত গাঢ় বা চায়ের মতো এবং মলের রং ফ্যাকাশে বা সাদাটে হয়ে যেতে পারে।
পিত্তথলির ব্যথা বনাম সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা
সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক এবং পিত্তথলিতে পাথরের ব্যথার পার্থক্য তুলে ধরা হলো:
| লক্ষণের ধরন | গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের ব্যথা | পিত্তথলিতে পাথরের ব্যথা (Biliary Colic) |
| ব্যথার স্থান | সাধারণত পেটের মাঝখানে বা ওপরের অংশে। | পেটের ডান দিকের পাঁজরের ঠিক নিচে। |
| ব্যথার ধরন | জ্বালাপোড়াযুক্ত চিনচিনে ব্যথা থাকে। | তীব্র, একটানা এবং মোচড়ানো ব্যথা থাকে। |
| ওষুধের প্রভাব | অ্যান্টাসিড বা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেলে আরাম মেলে। | সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের ওষুধে ব্যথা একদমই কমে না। |
| ব্যথা ছড়িয়ে পড়া | ব্যথা সাধারণত এক জায়গাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। | ডান কাঁধে বা পিঠের পেছনের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. বেশি করে পানি খেলে কি পিত্তথলির পাথর গলে যায় বা বেরিয়ে যায়?
উত্তর: না, এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। পিত্তথলির পাথর কিডনির পাথরের মতো নয়। কিডনির পাথর প্রস্রাবের সাথে বের হতে পারে, কিন্তু পিত্তথলির পাথর প্রস্রাবের রাস্তায় থাকে না। তাই পানি খেয়ে এই পাথর বের করা বা গলানো সম্ভব নয়।
২. পিত্তথলির পাথর হলে কি অপারেশন করা বাধ্যতামূলক?
উত্তর: যদি পাথরের কারণে আপনার বারবার তীব্র ব্যথা হয়, বমি হয় বা জন্ডিস দেখা দেয়, তবে অপারেশন করে পিত্তথলি ফেলে দেওয়াই (Cholecystectomy) এর একমাত্র স্থায়ী সমাধান। তবে পাথরের কোনো লক্ষণ বা ব্যথা না থাকলে চিকিৎসকরা অনেক সময় শুধু পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দেন।
৩. অপারেশন করে পিত্তথলি ফেলে দিলে কি মানুষ স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়। পিত্তথলি ফেলে দিলে লিভার থেকে পিত্তরস সরাসরি অন্ত্রে গিয়ে পৌঁছায়। তবে অপারেশনের পর প্রথম কয়েক মাস অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার হজম করতে কিছুটা সমস্যা হতে পারে, যা পরে শরীর নিজে থেকেই মানিয়ে নেয়।
বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। ডান পাঁজরের নিচে ব্যথার সাথে যদি আপনার কাঁপুনি দিয়ে তীব্র জ্বর আসে এবং চোখ হলুদ হয়ে যায়, তবে এর মানে হলো আপনার পিত্তথলিতে মারাত্মক ইনফেকশন (Cholecystitis/Cholangitis) হয়েছে। এই অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা না নিলে রোগীর জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে।