হার্ট ব্লক হওয়ার লক্ষণ: নীরব ঘাতকের ৫টি মারাত্মক সংকেত

আমাদের হৃৎপিণ্ড বা হার্ট সারা শরীরে রক্ত পাম্প করার জন্য নিজেই কিছু রক্তনালীর মাধ্যমে অক্সিজেন ও পুষ্টি গ্রহণ করে। এই রক্তনালীগুলোকে ‘করোনারি আর্টারি’ (Coronary Artery) বলা হয়। যখন অতিরিক্ত চর্বি বা কোলেস্টেরল জমে এই রক্তনালীগুলো সরু বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘হার্ট ব্লক’ বা করোনারি আর্টারি ডিজিজ বলা হয়।
হার্টে ব্লক তৈরি হওয়া এক দিনে ঘটে না। এটি বছরের পর বছর ধরে নীরবে বাড়তে থাকে এবং সম্পূর্ণ ব্লক হয়ে গেলেই ‘হার্ট অ্যাটাক’ বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মতো প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটে। তাই সঠিক সময়ে হার্ট ব্লক হওয়ার লক্ষণ শনাক্ত করতে না পারলে এটি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। চলুন জেনে নিই, হার্টের রক্তনালী ব্লক হতে শুরু করলে শরীর কী কী নীরব সংকেত দেয়।


হার্ট ব্লক হওয়ার প্রধান ৫টি লক্ষণ ও সংকেত


প্রাথমিক অবস্থায় ব্লক ছোট থাকলে তেমন কোনো লক্ষণ বোঝা যায় না। তবে ব্লক বড় হতে থাকলে নিচের সমস্যাগুলো প্রকট আকার ধারণ করে:
বুকে তীব্র ব্যথা বা চাপ (Angina): হার্ট ব্লকের সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো বুকের মাঝখানে বা বাঁ দিকে প্রচণ্ড চাপ বা ভারী অনুভূতি হওয়া। মনে হবে কেউ বুকের ওপর ভারী পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে। এই ব্যথা অনেক সময় বাম হাত, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। (হার্টের ব্লকের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ। তাই যেকোনো শারীরিক অস্বস্তিতে প্রেশার ওঠানামা করছে কি না, তা চেক করার জন্য হাতের কাছে একটি নির্ভুল ডিজিটাল ব্লাড প্রেশার মেশিন রাখা অপরিহার্য)।
সামান্য পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট: হার্ট যখন পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পায় না, তখন ফুসফুসের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এর ফলে সিঁড়ি ভাঙলে, একটু জোরে হাঁটলে বা সামান্য পরিশ্রমেই প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং রোগী হাঁপিয়ে ওঠেন।
প্রচুর ঘাম ও মাথা ঘোরা: কোনো গরম আবহাওয়া বা কায়িক শ্রম ছাড়াই হঠাৎ করে পুরো শরীর অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়া (Cold sweat) এবং মাথা চক্কর দিয়ে ওঠা হার্ট ব্লকের একটি মারাত্মক সংকেত। ব্রেনে রক্ত চলাচল কমে যাওয়ার কারণে এমনটি হয়।
চরম ক্লান্তি ও দুর্বলতা: সারাক্ষণ শরীর ম্যাজম্যাজ করা এবং কোনো কারণ ছাড়াই চরম দুর্বলতা অনুভব করা। অনেক সময় হাত ও পায়ে রক্ত চলাচল কমে যাওয়ায় অবশ বা ভারী অনুভূতি হয়। (রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়ার কারণে পায়ের এই ভারী ভাব ও পেশির আড়ষ্টতা কাটাতে পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি একটি ভালো মানের ফুট ম্যাসাজার (Foot Massager) ব্যবহার করা বেশ আরামদায়ক)।
বুক ধড়ফড় করা ও মানসিক স্ট্রেস: হৃৎপিণ্ড যখন রক্ত পাম্প করতে সংগ্রাম করে, তখন হার্টবিট অনিয়মিত হয়ে যায় বা বুক প্রচণ্ড ধড়ফড় করে। এর সাথে রোগীর মধ্যে অজানা এক আতঙ্ক বা প্যানিক কাজ করে। (অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা স্ট্রেস সরাসরি হার্ট ব্লকের ঝুঁকি বাড়ায়। সারাদিনের স্ট্রেস থেকে দ্রুত রিল্যাক্স হতে রাতে ঘুমানোর আগে একটি হেড ম্যাসাজার (Head Massager) ব্যবহার করলে স্নায়ুগুলো শান্ত হয় এবং চমৎকার ঘুম হয়)।


গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা নাকি হার্ট ব্লকের সংকেত? (পার্থক্য বুঝুন)


বুকে ব্যথা হলেই অনেকে গ্যাস্ট্রিক ভেবে ভুল করেন। আপনার ব্যথাটি গ্যাস্ট্রিকের নাকি হার্ট ব্লকের, তা নিচের ছকটি থেকে সহজেই বুঝতে পারবেন:

লক্ষণের ধরনসাধারণ গ্যাস্ট্রিকের ব্যথাহার্ট ব্লকের সন্দেহজনক সংকেত
ব্যথার ধরনবুকে বা পেটের ওপরের অংশে জ্বালাপোড়া করে এবং গ্যাস ওঠে।বুকের মাঝখানে প্রচণ্ড চাপ, মোচড়ানো বা ভারী ব্যথা অনুভূত হয়।
ব্যথার বিস্তারব্যথা সাধারণত বুকে বা পেটের এক জায়গায় স্থির থাকে।ব্যথা বুকের বাঁ দিক থেকে ঘাড়, চোয়াল ও বাম হাতে ছড়িয়ে পড়ে।
কখন বাড়ে/কমে?অ্যান্টাসিড খেলে বা ঢেকুর তুললে ব্যথা কমে যায়।বিশ্রামে থাকলে কমে, কিন্তু হাঁটাচলা বা পরিশ্রম করলে প্রচণ্ড বেড়ে যায়।
ঘাম ও শ্বাসকষ্টগ্যাস্ট্রিকের ব্যথায় সাধারণত ঘাম বা শ্বাসকষ্ট থাকে না।ব্যথার সাথে প্রচুর ঠান্ডা ঘাম হয় এবং শ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হয়।

(টিপস: যদি নিশ্চিত হন যে ব্যথাটি শুধুমাত্র গ্যাস্ট্রিক বা পেশির টানের কারণে হচ্ছে, তবে পিঠে বা তলপেটে একটি ভালো মানের হিটিং প্যাড (Heating Pad) ব্যবহার করলে পেশি দ্রুত রিল্যাক্স হয় এবং দারুণ স্বস্তি মেলে)।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. হার্ট ব্লক নির্ণয়ের প্রধান পরীক্ষা কী?
উত্তর: প্রাথমিক ধারণা পাওয়ার জন্য ইসিজি (ECG), ইকোকার্ডিওগ্রাম (Echo) বা ইটিটি (ETT) করা হয়। তবে হার্টে কত শতাংশ ব্লক আছে, তা নিশ্চিতভাবে জানার জন্য ‘করোনারি এনজিওগ্রাম’ (Angiogram) করা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
২. কাদের হার্ট ব্লকের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?
উত্তর: যাদের পরিবারে হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস আছে, যারা ধূমপান করেন এবং যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল ও অতিরিক্ত ওজন (Obesity) রয়েছে, তাদের এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। (ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা হার্ট সুস্থ রাখার প্রথম শর্ত, তাই মেদ মনিটর করার জন্য ঘরে একটি নির্ভুল ডিজিটাল ওয়েট স্কেল (Weight Scale) ব্যবহার করা উচিত)।
৩. ব্লক ধরা পড়লেই কি রিং বা বাইপাস করাতে হয়?
উত্তর: না। ব্লক যদি ৩০-৪০ শতাংশের মতো হয়, তবে সাধারণত শুধু ওষুধ এবং লাইফস্টাইল পরিবর্তনের মাধ্যমেই তা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। কিন্তু ব্লক ৭০ শতাংশের বেশি হলে এবং বুকে ব্যথা থাকলে চিকিৎসকরা রিং (Stenting) পরানো বা বাইপাস সার্জারির পরামর্শ দেন।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। বুকের মাঝখানে তীব্র চাপ ধরা ব্যথা যদি ১৫-২০ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় এবং সাথে ঘাম ও শ্বাসকষ্ট থাকে, তবে এক মুহূর্তও দেরি করবেন না বা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেয়ে বসে থাকবেন না। এটি হার্ট অ্যাটাকের চূড়ান্ত সংকেত হতে পারে। এমন অবস্থায় রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রেখে দ্রুত নিকটস্থ কার্ডিয়াক হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *