লো প্রেসারের মারাত্মক ৫টি লক্ষণ ও দ্রুত সুস্থ হওয়ার উপায়

উচ্চ রক্তচাপ বা হাই প্রেসার নিয়ে আমাদের সমাজে প্রচুর আলোচনা হলেও, ‘লো প্রেসার’ (Low Blood Pressure) বা নিম্ন রক্তচাপকে অনেকেই খুব একটা গুরুত্ব দিতে চান না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘হাইপোটেনশন’ (Hypotension) বলা হয়। স্বাভাবিকভাবে একজন সুস্থ মানুষের রক্তচাপ ১২০/৮০ (120/80 mmHg) থাকার কথা। কিন্তু এটি যখন ৯০/৬০ (90/60 mmHg)-এর নিচে নেমে যায়, তখন তাকে লো প্রেসার হিসেবে ধরা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে প্রেসার কিছুটা কম থাকা হয়তো অনেকের জন্য স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু হঠাৎ করে রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে তা মস্তিষ্ক, হার্ট এবং কিডনিতে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। তাই হাই প্রেসারের মতোই লো প্রেসার সমান বিপজ্জনক। চলুন, লো প্রেসারের প্রধান লক্ষণগুলো এবং তাৎক্ষণিক করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।


লো প্রেসার বা নিম্ন রক্তচাপের প্রধান ৫টি লক্ষণ


রক্তচাপ কমে গেলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছাতে পারে না। এর ফলে শরীর বেশ কিছু স্পষ্ট সংকেত দেয়:
১. হঠাৎ মাথা ঘোরা বা হালকা অনুভব হওয়া
লো প্রেসারের সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রাথমিক লক্ষণ হলো হঠাৎ করে মাথা ঘোরা (Dizziness)। বিশেষ করে বসা বা শোয়া অবস্থা থেকে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ালে চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসে বা মাথা হালকা মনে হয়। একে ‘পসচারাল হাইপোটেনশন’ (Postural hypotension) বলা হয়।
২. চোখে ঝাপসা দেখা ও ব্ল্যাকআউট
রক্তচাপ কমে গেলে মস্তিষ্কে এবং চোখের রেটিনায় রক্ত সরবরাহ হঠাৎ করে বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে রোগী চোখে ঝাপসা দেখেন, সবকিছু ঘুরছে বলে মনে হয় এবং কিছুক্ষণের জন্য চোখের সামনে সম্পূর্ণ অন্ধকার বা ‘ব্ল্যাকআউট’ (Blackout) হয়ে যেতে পারে।
৩. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা সিনকোপ
লো প্রেসারের একটি মারাত্মক পর্যায় হলো অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়া। মস্তিষ্কে অক্সিজেনের মারাত্মক অভাব দেখা দিলে শরীর তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সিনকোপ’ (Syncope) বলা হয়।
৪. চরম ক্লান্তি ও বমি বমি ভাব
পর্যাপ্ত রক্ত চলাচলের অভাবে শরীরের পেশিগুলো দ্রুত শক্তি হারিয়ে ফেলে। এর ফলে কোনো ভারী কাজ ছাড়াই সারাদিন চরম ক্লান্তি ও অবসাদ কাজ করে। পাশাপাশি পেট বা পরিপাকতন্ত্রে রক্ত সরবরাহ কমে যাওয়ায় বমি বমি ভাব (Nausea) বা হজমে অস্বস্তি অনুভূত হয়।
৫. হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ও দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস
রক্তচাপ খুব বেশি নিচে নেমে গেলে শরীর শকে (Shock) চলে যেতে পারে। এ সময় রোগীর হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা ও ফ্যাকাশে হয়ে যায়, শরীর অতিরিক্ত ঘামতে থাকে এবং নাড়ির স্পন্দন (Pulse) অত্যন্ত দ্রুত কিন্তু দুর্বল হয়ে পড়ে। শ্বাস-প্রশ্বাসও অস্বাভাবিকভাবে ছোট ও দ্রুত হয়।


এক নজরে রক্তচাপের মাত্রা ও অবস্থা


সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে রক্তচাপের মাত্রা ও শরীরের অবস্থা তুলে ধরা হলো:

রক্তচাপের মাত্রা (Systolic/Diastolic)শারীরিক অবস্থাকরণীয়
১২০/৮০ mmHgসম্পূর্ণ স্বাভাবিক (Normal)স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন চালিয়ে যাওয়া।
১১০/৭০ থেকে ১০০/৬০ mmHgবর্ডারলাইন বা সামান্য কমখাবারে পর্যাপ্ত পানি ও লবণ নিশ্চিত করা।
৯০/৬০ mmHg বা তার নিচেলো প্রেসার (Hypotension)দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ।


লো প্রেসার হলে তাৎক্ষণিক ঘরোয়া করণীয়


কারও হঠাৎ লো প্রেসার হয়ে গেলে ঘাবড়ে না গিয়ে দ্রুত নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে হবে:
লবণ-পানির শরবত বা স্যালাইন: লো প্রেসার হলে মিষ্টি বা চিনি খেয়ে কোনো লাভ নেই। তাৎক্ষণিকভাবে এক গ্লাস পানিতে আধা চা-চামচ লবণ মিশিয়ে পান করতে হবে, অথবা একটি ওরস্যালাইন (ORS) গুলিয়ে খাওয়াতে হবে। লবণ রক্তচাপ দ্রুত বাড়াতে সাহায্য করে।
পা উঁচু করে শুয়ে পড়া: মাথা ঘুরলে সাথে সাথে সমতল জায়গায় শুয়ে পড়তে হবে এবং পায়ের নিচে ২-৩টি বালিশ দিয়ে পা দুটোকে মাথার চেয়ে একটু উঁচুতে রাখতে হবে। এতে পায়ের রক্ত দ্রুত মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারে।
প্রচুর তরল গ্রহণ: শরীরে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশনের কারণে প্রেসার কমে গেলে প্রচুর পরিমাণে পানি, ডাবের পানি বা ফলের রস পান করতে হবে।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. মিষ্টি বা চকলেট খেলে কি লো প্রেসার ঠিক হয়?
উত্তর: না। অনেকেই লো প্রেসার এবং লো ব্লাড সুগারকে (Low blood sugar) মিলিয়ে ফেলেন। প্রেসার কমলে মিষ্টি খেয়ে কোনো কাজ হয় না, এ সময় লবণ বা স্যালাইন যুক্ত খাবার প্রয়োজন। তবে সুগার কমলে মিষ্টি খেতে হয়।
২. চা বা কফি কি প্রেসার বাড়াতে সাহায্য করে?
উত্তর: হ্যাঁ। হঠাৎ প্রেসার কমে গেলে এক কাপ কড়া ব্ল্যাক কফি বা চা পান করলে রক্তচাপ সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পায়।
৩. কখন দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে?
উত্তর: যদি রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, পালস অনেক দুর্বল হয়ে যায়, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে নীল বা ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, তবে এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি আপনার প্রায়ই মাথা ঘোরে বা লো প্রেসারের সমস্যা থাকে, তবে অবহেলা না করে একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন এবং রুটিন চেকআপ করান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *