সারা বছর নাক বন্ধ থাকা, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা বারবার সর্দি লাগার সমস্যায় ভোগেন অনেকেই। সাধারণ অ্যালার্জি বা ঠান্ডাজনিত সমস্যা ভেবে আমরা প্রায়ই এগুলো এড়িয়ে যাই। কিন্তু একটানা ১২ সপ্তাহের বেশি এই সমস্যাগুলো স্থায়ী হলে তা ‘নাকের পলিপাস’ (Nasal Polyps)-এর লক্ষণ হতে পারে।
নাকের পলিপাস হলো নাকের ভেতরের মিউকাস মেমব্রেন বা আবরণীতে তৈরি হওয়া আঙুরের থোকার মতো নরম, ব্যথাহীন এবং নন-ক্যান্সারাস (ক্যান্সার নয় এমন) মাংসপিণ্ড। এগুলো নাকের ভেতরে বা সাইনাসের রাস্তায় ঝুলে থাকে। প্রাথমিক অবস্থায় পলিপগুলো ছোট থাকলে কোনো সমস্যা হয় না, কিন্তু বড় হয়ে গেলে তা শ্বাস-প্রশ্বাসের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। চলুন, নাকের পলিপাসের প্রধান লক্ষণগুলো এবং এর সঠিক চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।
নাকের পলিপাসের প্রধান ৫টি লক্ষণ
পলিপাস ছোট থাকলে সাধারণত কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কিন্তু এটি বড় হয়ে নাকের পথ আটকে দিলে নিচের লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
১. দীর্ঘস্থায়ী নাক বন্ধ থাকা
পলিপাসের সবচেয়ে প্রধান লক্ষণ হলো সবসময় নাক বন্ধ থাকা। মনে হয় যেন নাকের ভেতর কিছু একটা আটকে আছে। পলিপাস বড় হয়ে গেলে রোগী নাক দিয়ে পর্যাপ্ত বাতাস নিতে পারেন না, যার ফলে সারাক্ষণ মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হয়।
২. গন্ধ ও স্বাদ পাওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া
নাকের ভেতরের যে অংশটি গন্ধ শোঁকার কাজ করে, পলিপাস সেখানে বাতাস পৌঁছাতে বাধা দেয়। এর ফলে রোগী ধীরে ধীরে যেকোনো খাবারের বা পারফিউমের ঘ্রাণ পাওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। ঘ্রাণ না পাওয়ার কারণে খাবারের স্বাদও ঠিকমতো বোঝা যায় না।
৩. ক্রমাগত সর্দি ও পোস্ট-নেজাল ড্রিপ
নাক দিয়ে সবসময় পানি পড়া বা সর্দি থাকা পলিপাসের আরেকটি বড় লক্ষণ। অনেক সময় নাকের সর্দি সামনের দিকে না এসে গলার পেছনের অংশ দিয়ে নিচের দিকে নামতে থাকে, যাকে ‘পোস্ট-নেজাল ড্রিপ’ (Post-nasal drip) বলা হয়। এর ফলে সারাক্ষণ গলা খুসখুস করে এবং কাশি হয়।
৪. মুখে ও কপালে চাপ বা ব্যথা অনুভব
পলিপাসের কারণে সাইনাসের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে তরল জমতে শুরু করে। এর ফলে রোগীর কপালে, চোখের চারপাশে এবং ওপরের পাটির দাঁতে সারাক্ষণ ভারী চাপ বা ভোঁতা ব্যথা অনুভূত হয়।
৫. অতিরিক্ত নাক ডাকা ও ঘুমের ব্যাঘাত
নাক বন্ধ থাকার কারণে ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। রোগী প্রচণ্ড শব্দ করে নাক ডাকেন এবং অনেক সময় ঘুমের ঘোরে শ্বাস আটকে গিয়ে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় (স্লিপ অ্যাপনিয়া)। এর ফলে সারাদিন চরম ক্লান্তি কাজ করে।
সাধারণ সর্দি নাকি নাকের পলিপাস?
অনেকেই পলিপাসকে সাধারণ সর্দি বা সাইনাসের সমস্যা ভেবে ভুল করেন। নিচের টেবিল থেকে এদের মূল পার্থক্যগুলো সহজেই বুঝতে পারবেন:
| লক্ষণের ধরন | সাধারণ সর্দি বা অ্যালার্জি | নাকের পলিপাস (Nasal Polyps) |
| সমস্যা থাকার মেয়াদ | সাধারণত ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। | একটানা ১২ সপ্তাহের বেশি (কয়েক মাস) স্থায়ী হয়। |
| ওষুধের প্রভাব | অ্যান্টিহিস্টামিন বা সাধারণ সর্দির ওষুধে কাজ হয়। | সাধারণ ওষুধে নাক বন্ধ হওয়া পুরোপুরি ঠিক হয় না। |
| ঘ্রাণশক্তি | সর্দি কমলে ঘ্রাণশক্তি আবার ফিরে আসে। | ঘ্রাণশক্তি দীর্ঘ সময়ের জন্য নষ্ট বা দুর্বল হয়ে যায়। |
পলিপাস কেন হয় এবং কাদের ঝুঁকি বেশি?
পলিপাস কেন তৈরি হয় তার ১০০% সুনির্দিষ্ট কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞান এখনও বের করতে পারেনি। তবে যারা দীর্ঘদিন ধরে ক্রনিক সাইনোসাইটিস, চরম মাত্রার অ্যালার্জি (Dust allergy), হাঁপানি বা অ্যাজমা এবং নির্দিষ্ট কিছু পেইনকিলারে (যেমন: অ্যাসপিরিন) সংবেদনশীল, তাদের নাকের পলিপাস হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
পলিপাসের চিকিৎসা ও সতর্কতা
সঠিক চিকিৎসা: প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসকরা স্টেরয়েড ন্যাজাল স্প্রে (Nasal spray) বা অ্যালার্জির ওষুধ দেন, যা পলিপাসের আকার ছোট করতে সাহায্য করে। তবে পলিপাস অনেক বড় হয়ে গেলে ‘এন্ডোস্কোপিক সাইনাস সার্জারি’ (FESS)-এর মাধ্যমে এটি কেটে ফেলা হয়।
মারাত্মক ভুল ও সতর্কতা: আমাদের দেশে অনেকেই রাস্তাঘাটে বা হাতুড়ে ডাক্তারের কাছ থেকে এসিড বা ক্ষতিকর কেমিক্যাল দিয়ে পলিপাস পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করেন। এটি একটি ভয়ংকর ভুল! এতে নাকের ভেতরের হাড় গলে যেতে পারে, চিরতরে ঘ্রাণশক্তি নষ্ট হতে পারে এবং ব্রেনে ইনফেকশন ছড়িয়ে বড় বিপদ হতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. অপারেশনের পর কি পলিপাস আবার হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, নাকের পলিপাস পুনরায় হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। সার্জারির পরও যদি অ্যালার্জি বা সাইনাসের মূল কারণটি নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তবে কয়েক বছর পর এটি আবার হতে পারে।
২. নাকের পলিপাস কি ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে?
উত্তর: না। নাকের পলিপাস সম্পূর্ণ বিনাইন বা নন-ক্যান্সারাস একটি টিউমার। এটি থেকে ক্যান্সার হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
৩. ঘরোয়া উপায়ে কি পলিপাস দূর করা সম্ভব?
উত্তর: ঘরোয়া উপায়ে পলিপাস পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তবে নিয়মিত লবণ-পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করলে (Saline wash) এবং গরম পানির ভাপ (Steam) নিলে নাক বন্ধ থাকার অস্বস্তি অনেকটাই কমে যায়।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। একটানা অনেকদিন নাক বন্ধ থাকলে বা ঘ্রাণশক্তি কমে গেলে নিজে থেকে কোনো ড্রপ ব্যবহার না করে দ্রুত একজন নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।