হার্নিয়া (Hernia) অত্যন্ত পরিচিত এবং যন্ত্রণাদায়ক একটি শারীরিক সমস্যা। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নারীদের তুলনায় পুরুষরা এই রোগে অনেক বেশি আক্রান্ত হন। বিশেষ করে পুরুষদের ‘ইনগুইনাল হার্নিয়া’ বা কুঁচকির হার্নিয়া সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
তলপেটের দেয়ালের কোনো দুর্বল অংশ বা ছিদ্র ভেদ করে যখন ভেতরের কোনো অঙ্গ (যেমন: অন্ত্রের অংশ বা চর্বি) বাইরের দিকে বেরিয়ে আসে, তখন সেই অবস্থাকেই হার্নিয়া বলা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি একটি ছোট ফোলা বা চাকার মতো মনে হলেও, অবহেলা করলে এটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে। চলুন, পুরুষদের হার্নিয়া হওয়ার আসল কারণগুলো এবং এর লক্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।
পুরুষের হার্নিয়া হওয়ার প্রধান ৫টি কারণ
আমাদের পেটের ভেতরের অঙ্গগুলো একটি পেশিবহুল দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত থাকে। যখন কোনো কারণে এই পেশিগুলো দুর্বল হয়ে যায় বা পেটের ভেতরে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, তখনই হার্নিয়া হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে এর প্রধান কারণগুলো হলো:
১. ভারী জিনিস তোলা বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম
সঠিক নিয়ম না মেনে হঠাৎ করে অতিরিক্ত ভারী জিনিস তুললে তলপেটের পেশিতে প্রচণ্ড চাপ পড়ে। যারা পেশাগত কারণে ভারী জিনিস বহন করেন বা জিমে গিয়ে অতিরিক্ত ওজন তোলেন (Weightlifting), তাদের পেটের পেশির দুর্বল অংশ ছিঁড়ে হার্নিয়া হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
২. দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য ও প্রস্রাবের সমস্যা
যাদের দীর্ঘদিন ধরে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা রয়েছে এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত কোঁত দিতে হয়, তাদের তলপেটে ক্রমাগত একটি মারাত্মক চাপ পড়ে। একইভাবে বয়স্ক পুরুষদের প্রোস্টেট বড় হয়ে গেলে প্রস্রাব করতে গিয়েও পেটে চাপ দিতে হয়, যা ধীরে ধীরে হার্নিয়ার পথ তৈরি করে।
৩. দীর্ঘমেয়াদী কাশি বা হাঁপানি
যাদের হাঁপানি, ব্রংকাইটিস বা ধূমপানের কারণে দীর্ঘমেয়াদী কাশির সমস্যা (Smoker’s Cough) আছে, তাদের ক্ষেত্রেও হার্নিয়ার ঝুঁকি বেশি। একটানা কাশির ফলে পেটের ভেতরের পেশিতে ক্রমাগত তীব্র ধাক্কা বা চাপ লাগে, যা পেশিকে দুর্বল করে দেয়।
৪. পেশির জন্মগত বা বয়সজনিত দুর্বলতা
অনেক পুরুষের মাতৃগর্ভে থাকাকালীন কুঁচকির পেশিগুলো ঠিকমতো জোড়া লাগে না, ফলে জন্মগতভাবেই ওই অংশটি দুর্বল থাকে। আবার বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রাকৃতিকভাবেই শরীরের সব পেশি দুর্বল হতে শুরু করে, যার ফলে বয়স্ক পুরুষদের হার্নিয়া বেশি দেখা যায়।
৫. অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
শরীরের ওজন অতিরিক্ত বেড়ে গেলে পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর ওপর সারাক্ষণ একটি বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এই চাপ পেটের দেয়ালকে দুর্বল করে দেয় এবং ভেতরের চর্বি বা অন্ত্র সহজেই বাইরে বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়।
এক নজরে হার্নিয়ার ধরন ও লক্ষণ
সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে পুরুষদের সাধারণ হার্নিয়ার ধরন এবং এর লক্ষণগুলো তুলে ধরা হলো:
| হার্নিয়ার ধরন | ফোলা বা চাকা কোথায় দেখা যায় | প্রকাশ পাওয়া লক্ষণ |
| ইনগুইনাল (Inguinal) | কুঁচকি বা অণ্ডকোষের কাছে। | ভারী কিছু তুললে বা কাশলে ব্যথা ও ফোলা বাড়ে। শুয়ে পড়লে ফোলা মিলিয়ে যায়। |
| আম্বিলিকাল (Umbilical) | নাভি বা এর ঠিক আশেপাশে। | নাভির চারপাশ ফুলে ওঠে এবং একটানা চিনচিনে ব্যথা থাকে। |
| ইনসিশনাল (Incisional) | আগের কোনো অপারেশনের কাটা দাগে। | পূর্ববর্তী সার্জারির দাগের জায়গায় ফুলে যাওয়া এবং টান লাগা। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. ওষুধ বা বেল্ট ব্যবহার করলে কি হার্নিয়া ভালো হয়?
উত্তর: না। হার্নিয়া মূলত একটি শারীরিক বা মেকানিক্যাল ত্রুটি (পেশি ছিঁড়ে যাওয়া)। তাই কোনো ওষুধ বা ‘হার্নিয়া বেল্ট’ দিয়ে এটি পুরোপুরি সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়, মাইনর সার্জারি বা ল্যাপারোস্কোপিই এর একমাত্র স্থায়ী সমাধান।
২. হার্নিয়া হলে কি ব্যায়াম করা যাবে?
উত্তর: সাধারণ হাঁটাচলা করা যেতে পারে, তবে পেটে চাপ পড়ে এমন ভারী ব্যায়াম, দৌড়ানো বা ওজন তোলা সম্পূর্ণ নিষেধ। এতে বেরিয়ে আসা অন্ত্র আটকে গিয়ে বড় বিপদ হতে পারে।
৩. হার্নিয়া অপারেশন না করলে কী হয়?
উত্তর: অবহেলা করলে বেরিয়ে আসা অন্ত্রের অংশ ছিদ্রের মাঝে আটকে গিয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে (Strangulated hernia)। এটি একটি জীবনঘাতী পরিস্থিতি এবং তখন জরুরি অপারেশনের প্রয়োজন হয়।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। আপনি যদি কুঁচকিতে বা পেটে কোনো ফোলা অংশ দেখতে পান এবং সেখানে হঠাৎ তীব্র ব্যথা, বমি ভাব, জ্বর বা ফোলা অংশটি লাল হয়ে শক্ত হয়ে যায়, তবে এক মুহূর্ত অবহেলা না করে দ্রুত একজন সার্জারি বিশেষজ্ঞের (Surgeon) শরণাপন্ন হোন।