ব্রেস্ট টিউমারের লক্ষণগুলো ব্যক্তিভেদে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণ টিউমার বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী টিউমার শরীরে তৈরি হলে সাধারণত নিচের ৫টি প্রধান লক্ষণ সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়:
১. স্তন বা বগলের নিচে চাকা অনুভব করা
ব্রেস্ট টিউমারের সবচেয়ে প্রথম এবং সাধারণ লক্ষণ হলো স্তনের ভেতরে বা বগলের নিচে মার্বেল বা ছোট আলুর মতো শক্ত চাকা (Lump) অনুভব করা। গোসলের সময় বা কাপড় পরিবর্তনের সময় হাত দিলে এটি সহজে টের পাওয়া যায়। এই চাকা ব্যথামুক্ত বা ব্যথযুক্ত উভয় ধরনেরই হতে পারে।
২. স্তনবৃন্ত বা নিপল ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া
টিউমার যদি নিপলের ঠিক পেছনে বা আশপাশে থাকে, তবে এটি নিপলের টিস্যুকে ভেতরের দিকে টেনে ধরে। এর ফলে নিপল বা স্তনবৃন্ত হঠাৎ করে ভেতরের দিকে ঢুকে যায় (Nipple retraction) বা এর স্বাভাবিক অবস্থান পরিবর্তন হয়ে যায়।
৩. নিপল দিয়ে অস্বাভাবিক তরল বা রক্ত নির্গত হওয়া
গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েদের বুকের দুধ আসা স্বাভাবিক। কিন্তু গর্ভাবস্থা ছাড়া সাধারণ অবস্থায় যদি নিপল চাপ দিলে বা আপনাআপনি কোনো তরল বের হয়, তবে তা মারাত্মক চিন্তার বিষয়। বিশেষ করে তরলটি যদি রক্তমিশ্রিত, বাদামি, কালচে বা আঠালো পুঁজের মতো হয়, তবে এটি টিউমার বা ক্যানসারের একটি শক্তিশালী সংকেত।
৪. স্তনের আকার বা আকৃতিতে হঠাৎ পরিবর্তন
মহিলাদের দুটি স্তনের আকার সাধারণত হুবহু এক রকম হয় না, কিছুটা পার্থক্য থাকে। কিন্তু যদি হঠাৎ করে খেয়াল করেন যে, যেকোনো এক দিকের স্তন অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গেছে, ঝুলে গেছে বা এর আকৃতিতে চোখে পড়ার মতো বড় কোনো পরিবর্তন এসেছে, তবে এটি ভেতরের কোনো টিউমারের কারণে হতে পারে।
৫. স্তনের ত্বকে পরিবর্তন বা কমলার খোসার মতো হওয়া
টিউমারের কারণে স্তনের ভেতরের রক্তনালী বা লিম্ফ নোডগুলো ব্লক হয়ে গেলে বাইরের ত্বকে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। স্তনের ত্বক লালচে হয়ে যেতে পারে, চুলকানি হতে পারে অথবা ত্বকের ওপর কমলার খোসার মতো ছোট ছোট গর্ত (Peau d’orange) তৈরি হয়ে খসখসে হয়ে যেতে পারে।
সাধারণ টিউমার বনাম ক্যানসারের টিউমার
সহজে পার্থক্য বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে সাধারণ টিউমার (Benign) এবং ক্যানসারের টিউমারের (Malignant) বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হলো:
| লক্ষণের ধরন | সাধারণ টিউমার (ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা) | ক্যানসারের টিউমার (ম্যালিগন্যান্ট) |
| চাকার ধরন | চাকাটি নরম বা রাবারের মতো হয়। | চাকাটি পাথরের মতো অত্যন্ত শক্ত হয়। |
| নড়াচড়া | হাত দিলে চাকাটি চামড়ার নিচে সহজে এদিক-ওদিক নড়ে। | এটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির থাকে, সহজে নড়াচড়া করে না। |
| ব্যথা | মাসিকের আগে বা পরে এতে হালকা ব্যথা থাকতে পারে। | প্রাথমিক পর্যায়ে এই চাকায় সাধারণত কোনো ব্যথা থাকে না। |
| ত্বকের অবস্থা | বাইরের ত্বকে বা নিপলে কোনো পরিবর্তন আসে না। | ত্বক লালচে হয় এবং নিপল ভেতরের দিকে ঢুকে যেতে পারে। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. ব্রেস্ট টিউমার কি শুধু মহিলাদেরই হয়?
উত্তর: না। যদিও মহিলাদের ব্রেস্ট টিউমার হওয়ার হার অনেক বেশি, তবে পুরুষদের ব্রেস্টেও টিউমার এবং ক্যানসার হতে পারে। পুরুষদের বুকে কোনো অস্বাভাবিক চাকা দেখা দিলে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
২. ব্রেস্ট টিউমারে কি সবসময় ব্যথা থাকে?
উত্তর: এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা যে টিউমার বা ক্যানসার হলে ব্যথা করবে। চিকিৎসকদের মতে, ব্রেস্ট ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ের চাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো ব্যথা থাকে না। তাই ব্যথামুক্ত শক্ত চাকাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
৩. নিজে নিজে ব্রেস্ট পরীক্ষা করার সঠিক সময় কখন?
উত্তর: মহিলাদের জন্য নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা (BSE – Breast Self Examination) করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো পিরিয়ড বা মাসিক শেষ হওয়ার ৩ থেকে ৫ দিন পর। এ সময় স্তনের টিস্যুগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে বলে কোনো চাকা থাকলে সহজে বোঝা যায়।
বিশেষ সংবেদনশীল সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। স্তনে বা বগলে যেকোনো ধরনের চাকা অনুভব করলে নিজে নিজে সেটি সাধারণ না ক্যানসার তা নির্ণয় করার চেষ্টা করা চরম বোকামি। লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে একজন ব্রেস্ট সার্জন বা অনকোলজিস্টের (Oncologist) পরামর্শে একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম বা ম্যামোগ্রাম (Mammogram) করিয়ে নিশ্চিত হওয়া আপনার জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।