আমাশয় রোগের ৫টি মারাত্মক লক্ষণ, কারণ ও বাঁচার উপায়

দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে আমাদের পরিপাকতন্ত্রে খুব পরিচিত এবং কষ্টদায়ক একটি রোগ হলো আমাশয় (Dysentery)। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, অন্ত্র বা ইন্টেসটাইনে (বিশেষ করে কোলনে) মারাত্মক প্রদাহ বা ইনফেকশন হলে তাকে আমাশয় বলা হয়।
সাধারণ ডায়রিয়ার সাথে এর মূল পার্থক্য হলো—আমাশয়ে মলের সাথে রক্ত বা শ্লেষ্মা (আম) নির্গত হয় এবং পেটে তীব্র ব্যথা থাকে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এটি শরীরে মারাত্মক পানিশূন্যতা তৈরি করতে পারে। চলুন, আমাশয় রোগের প্রধান ৫টি লক্ষণ এবং এর ধরনগুলো বিস্তারিত জেনে নিই।


আমাশয় রোগের ৫টি প্রধান লক্ষণ


আমাশয়ের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করার ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যে সাধারণত লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। এর প্রধান ৫টি লক্ষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. মলের সাথে শ্লেষ্মা (আম) বা তাজা রক্ত যাওয়া
আমাশয়ের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান লক্ষণ হলো মলের সাথে শ্লেষ্মা বা মিউকাস নির্গত হওয়া, যাকে সাধারণ ভাষায় ‘আম’ বলা হয়। অন্ত্রের দেয়ালে ঘা হওয়ার কারণে এই মিউকাস তৈরি হয়। ইনফেকশন বেশি হলে মিউকাসের সাথে তাজা রক্ত বা কালচে রক্তও (Blood in stool) যেতে পারে।
২. পেটে তীব্র মোচড়ানো ব্যথা ও অস্বস্তি
আমাশয় হলে রোগীর পেটের নিচের অংশে (তলপেটে) একটানা অস্বস্তি এবং তীব্র মোচড়ানো ব্যথা বা ক্র্যাম্প (Abdominal cramps) কাজ করে। এই ব্যথা অনেকটা ঢেউয়ের মতো আসে—কখনো তীব্র আকার ধারণ করে, আবার মলত্যাগের পর সাময়িকভাবে কিছুটা কমে যায়।
৩. মলত্যাগের পর অসম্পূর্ণতার অনুভূতি (Tenesmus)
আমাশয়ের রোগীদের একটি অত্যন্ত কষ্টদায়ক লক্ষণ হলো ‘টিনেসামাস’ (Tenesmus)। এর মানে হলো, মলত্যাগ করে আসার পরপরই রোগীর মনে হয় পেট পরিষ্কার হয়নি এবং আবারও বাথরুমে যাওয়ার তীব্র বেগ অনুভব হয়। কিন্তু বাথরুমে গেলে খুব সামান্য মল বা কেবল মিউকাস নির্গত হয়।
৪. তীব্র জ্বর ও মাংসপেশিতে ব্যথা
সব আমাশয়ে জ্বর থাকে না, তবে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত আমাশয়ে (ব্যাসিলারি আমাশয়) রোগীর হঠাৎ করে ১০১-১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত তীব্র জ্বর আসতে পারে। জ্বরের সাথে শরীরে কাঁপুনি, প্রচণ্ড মাথা ব্যথা এবং হাত-পায়ের মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়।
৫. পানিশূন্যতা, বমি ভাব ও চরম ক্লান্তি
ঘন ঘন মলত্যাগের কারণে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি ও জরুরি খনিজ পদার্থ (ইলেক্ট্রোলাইটস) বেরিয়ে যায়। এর ফলে রোগীর প্রচণ্ড বমি বমি ভাব হয়, খাবারে একদম অরুচি চলে আসে এবং শরীর অত্যন্ত দুর্বল বা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। চোখ ভেতরের দিকে গর্তে ঢুকে যাওয়া পানিশূন্যতার বড় লক্ষণ।


এক নজরে আমাশয়ের ধরন ও পার্থক্য


জীবাণুর ওপর ভিত্তি করে আমাশয়কে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। সহজে পার্থক্য বোঝার জন্য নিচের টেবিলটি খেয়াল করুন:

লক্ষণের ধরনঅ্যামিবিক আমাশয় (Amoebic)ব্যাসিলারি আমাশয় (Bacillary)
জীবাণুর নামএন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা (প্যারাসাইট)।শিগেলা বা ই-কোলাই (ব্যাকটেরিয়া)।
লক্ষণ শুরুর ধরনধীরে ধীরে এবং হালকাভাবে শুরু হয়।হঠাৎ করে এবং তীব্রভাবে শুরু হয়।
জ্বর ও শারীরিক ব্যথাসাধারণত জ্বর থাকে না বা খুব হালকা থাকে।তীব্র জ্বর থাকে এবং শরীরে কাঁপুনি হয়।
মলের প্রকৃতিমলে প্রচুর পরিমাণে ‘আম’ বা মিউকাস থাকে।মলের সাথে প্রচুর তাজা রক্ত বা কালচে রক্ত থাকে।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. আমাশয় হলে কি দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খাওয়া যাবে?
উত্তর: একদমই না। আমাশয় বা ডায়রিয়া চলাকালীন অন্ত্র অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকে এবং দুধ হজম করার এনজাইম (ল্যাকটেজ) কাজ করে না। তাই দুধ, পনির বা আইসক্রিম খেলে পেটে গ্যাস তৈরি হয় এবং আমাশয় আরও বেড়ে যায়। তবে টক দই অন্ত্রের জন্য ভালো।
২. আমাশয়ের রোগীকে কি খাবার স্যালাইন দেওয়া জরুরি?
উত্তর: হ্যাঁ, অত্যন্ত জরুরি। আমাশয়ে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। পানিশূন্যতা রোধ করতে এবং রোগীর দুর্বলতা কাটাতে বারবার ওআরএস (ORS) বা খাবার স্যালাইন এবং ডাবের পানি পান করানো বাধ্যতামূলক।
৩. আমাশয় কি ছোঁয়াচে রোগ?
উত্তর: হ্যাঁ, এটি একটি সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির মলত্যাগের পর হাত ভালোভাবে না ধুলে, সেই হাতের স্পর্শে থাকা খাবার বা পানির মাধ্যমে এটি অন্য সুস্থ মানুষের শরীরে খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে।


বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। আমাশয় হলে ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ডায়রিয়া বন্ধ করার ওষুধ (যেমন- লোপেরামাইড) খাওয়া মারাত্মক ক্ষতিকর, কারণ এটি পেটের ভেতরে জীবাণু আটকে রেখে ইনফেকশন বাড়িয়ে দেয়। যদি মলের সাথে প্রচুর রক্ত যায়, একটানা বমি হয় এবং ২-৩ দিনের মধ্যেও অবস্থার উন্নতি না হয়, তবে দ্রুত একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *