আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—স্ট্রোক হার্টের বা হৃৎপিণ্ডের কোনো রোগ। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, স্ট্রোক সম্পূর্ণভাবে মস্তিষ্কের বা ব্রেইনের একটি মারাত্মক রোগ। মস্তিষ্কের রক্তনালী ছিঁড়ে গেলে বা রক্তনালীতে ব্লক তৈরি হয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে ব্রেইনের কোষগুলো অক্সিজেনের অভাবে মারা যেতে শুরু করে, একেই ‘ব্রেইন স্ট্রোক’ (Brain Stroke) বলা হয়।
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি সেকেন্ড অত্যন্ত মূল্যবান। চিকিৎসকরা বলেন, “Time is Brain” অর্থাৎ যত সময় নষ্ট হবে, ব্রেইনের তত বেশি ক্ষতি হবে। তাই স্ট্রোকের লক্ষণগুলো আগে থেকে জানা থাকলে একজন মানুষের জীবন এবং চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ব বাঁচানো সম্ভব। চলুন, স্ট্রোকের প্রধান ৫টি লক্ষণ এবং জরুরি করণীয় বিস্তারিত জেনে নিই।
ব্রেইন স্ট্রোকের ৫টি প্রধান লক্ষণ
স্ট্রোকের লক্ষণগুলো সাধারণত হঠাৎ করেই প্রকাশ পায়। শরীরে নিচের যেকোনো একটি বা একাধিক লক্ষণ দেখা দিলে তা স্ট্রোকের সুস্পষ্ট সংকেত:
১. মুখ একদিকে বেঁকে যাওয়া (Face Drooping)
স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় এবং প্রথম লক্ষণ হলো রোগীর মুখের একপাশ হঠাৎ করে অবশ হয়ে যাওয়া বা ঝুলে পড়া। রোগীকে হাসতে বললে বা দাঁত দেখাতে বললে দেখা যায় তার মুখ একদিকে বেঁকে যাচ্ছে এবং চোখ বা ঠোঁট স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে না।
২. হাত বা পা অবশ হয়ে আসা (Arm/Leg Weakness)
শরীরের একপাশের হাত বা পা হঠাৎ করে প্রচণ্ড দুর্বল বা অবশ হয়ে যায়। রোগীকে যদি দুই হাত সামনের দিকে সোজা করে তুলতে বলা হয়, তবে দেখা যাবে সে এক হাত তুলতে পারছে না অথবা তোলার পর একটি হাত দুর্বল হয়ে আপনাআপনি নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছে।
৩. কথা জড়িয়ে যাওয়া বা বলতে না পারা (Speech Difficulty)
মস্তিষ্কের যে অংশ আমাদের কথা বলা নিয়ন্ত্রণ করে, স্ট্রোকে সেই অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে রোগীর কথা হঠাৎ জড়িয়ে যায়। রোগী পরিষ্কার করে কোনো কথা বলতে পারেন না, মাতালদের মতো উচ্চারণ করেন। অনেক সময় রোগী অন্যের কথা বুঝতে পারেন না বা একদম বোবা হয়ে যান।
৪. হঠাৎ চোখে ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টি হারানো
স্ট্রোকের কারণে রোগী হঠাৎ করেই এক চোখে বা দুই চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করেন। অনেক সময় চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসে বা একটি জিনিসকে দুটি (Double vision) দেখতে পান।
৫. প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও শরীরের ভারসাম্য হারানো
বিনা কারণে হঠাৎ করে মাথায় বজ্রপাতের মতো তীব্র ব্যথা শুরু হওয়া ‘হেমোরেজিক স্ট্রোক’ (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ) এর বড় লক্ষণ। এর সাথে রোগীর প্রচণ্ড মাথা ঘোরে, হাঁটতে গেলে শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান এবং অনেকের বমি বমি ভাব বা বমি হয়।
স্ট্রোক চেনার বিশ্বস্বীকৃত ‘FAST’ পদ্ধতি
স্ট্রোক শনাক্ত করার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে FAST (ফাস্ট) পদ্ধতি অত্যন্ত জনপ্রিয়। সহজে মনে রাখার জন্য নিচের টেবিলটি খেয়াল করুন:
| ইংরেজি অক্ষর | অর্থ ও লক্ষণ | করণীয় পরীক্ষা |
| F – Face (মুখ) | মুখ একদিকে বেঁকে বা ঝুলে যায়। | রোগীকে হাসতে বলুন এবং মুখের পরিবর্তন খেয়াল করুন। |
| A – Arm (হাত) | হাত অবশ বা দুর্বল হয়ে পড়ে। | রোগীকে দুই হাত একসাথে ওপরের দিকে তুলতে বলুন। |
| S – Speech (কথা) | কথা জড়িয়ে যায় বা আটকে যায়। | রোগীকে একটি সহজ বা সাধারণ বাক্য বলতে বলুন। |
| T – Time (সময়) | সময় নষ্ট না করে হাসপাতালে নেওয়া। | ওপরের যেকোনো একটি লক্ষণ মিললে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. স্ট্রোক কি শুধু বয়স্কদেরই হয়?
উত্তর: না। যদিও বয়স্কদের স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি, তবে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা এবং ধূমপানের কারণে বর্তমান সময়ে তরুণ ও যুবকদের মধ্যেও স্ট্রোকের হার মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে।
২. মিনি স্ট্রোক (Mini Stroke) বা TIA কী?
উত্তর: অনেক সময় মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেয়, কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর তা নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। একে মিনি স্ট্রোক বা TIA বলা হয়। এটি ভবিষ্যতে বড় স্ট্রোক হওয়ার সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।
৩. স্ট্রোকের রোগীকে কি ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়ানো যাবে?
উত্তর: একদমই না। স্ট্রোক রক্তনালী ব্লক হয়ে (Ischemic) নাকি ছিঁড়ে গিয়ে (Hemorrhagic) হয়েছে, তা সিটি স্ক্যান ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়। তাই নিজে থেকে কোনো পেইনকিলার বা প্রেসারের ওষুধ খাওয়ালে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। স্ট্রোক হলে প্রথম ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা (Golden Hour) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে রোগীকে এমন কোনো বড় হাসপাতালে নিয়ে যান, যেখানে সিটি স্ক্যান (CT Scan) এবং নিউরোলজিস্টের (Neurologist) সুবিধা রয়েছে। এ সময় রোগীকে কোনো খাবার বা পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না, এতে খাবার শ্বাসনালীতে গিয়ে রোগী মারা যেতে পারেন।