মানুষের মতো বিড়ালদেরও সর্দি-কাশি বা জ্বর হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ফেলাইন আপার রেসপিরেটরি ইনফেকশন’ (Feline Upper Respiratory Infection) বা সাধারণ ভাষায় ‘ক্যাট ফ্লু’ বলা হয়। এটি মূলত বিড়ালের নাক, গলা এবং চোখের একটি তীব্র ভাইরাল ইনফেকশন।
ক্যাট ফ্লু অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। মূলত ‘ফেলাইন হার্পিস’ এবং ‘ফেলাইন ক্যালিসি’ নামক দুটি ভাইরাসের কারণে এই রোগ সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। বড় বিড়ালের ক্ষেত্রে এটি সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতো মনে হলেও, ছোট ছানা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা বিড়ালের জন্য সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে। চলুন, বিড়ালের ফ্লু হওয়ার প্রধান ৫টি লক্ষণ বিস্তারিত জেনে নিই।
বিড়ালের ফ্লু হওয়ার ৫টি প্রধান লক্ষণ
ভাইরাস আক্রমণের সাধারণত ২ থেকে ১০ দিনের মধ্যে বিড়ালের শরীরে ফ্লু-এর লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। নিচের লক্ষণগুলো দেখলে বুঝতে হবে আপনার আদরের বিড়ালটি ক্যাট ফ্লুতে আক্রান্ত:
১. বারবার হাঁচি ও নাক দিয়ে পানি পড়া
ক্যাট ফ্লু-এর সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রথম লক্ষণ হলো বিড়ালের ঘন ঘন হাঁচি দেওয়া। এর পাশাপাশি বিড়ালের নাক দিয়ে অনবরত স্বচ্ছ পানি বা ঘন হলুদ রঙের শ্লেষ্মা (সর্দি) বের হতে থাকে। সর্দির কারণে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিড়ালটি মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে।
২. চোখ লাল হওয়া ও চোখ দিয়ে পিচুটি বের হওয়া
ফ্লুতে আক্রান্ত হলে বিড়ালের চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চোখ লাল হয়ে ফুলে যায় এবং চোখ দিয়ে অনবরত পানি বা ঘন পিচুটি (Eye discharge) বের হতে থাকে। অনেক সময় পিচুটি শুকিয়ে চোখের পাতা এমনভাবে আটকে যায় যে বিড়ালটি চোখ খুলতেই পারে না।
৩. প্রচণ্ড জ্বর ও খাবারে চরম অরুচি
ফ্লু-এর কারণে বিড়ালের শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায় (স্বাভাবিক তাপমাত্রা হলো ১০০.৫ – ১০২.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। জ্বরের পাশাপাশি সর্দির কারণে বিড়ালের ঘ্রাণশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। বিড়াল যেহেতু ঘ্রাণ না পেলে খাবার খায় না, তাই এ সময় তারা পছন্দের খাবারও একদম মুখে তোলে না।
৪. মুখ ও জিহ্বায় যন্ত্রণাদায়ক ঘা হওয়া
যদি বিড়ালটি ‘ফেলাইন ক্যালিসি’ (Feline Calicivirus) ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়, তবে তার মুখের ভেতর, জিহ্বায় এবং মাড়িতে মারাত্মক ঘা বা আলসার তৈরি হয়। এই ঘায়ের কারণে বিড়ালের খাবার চিবাতে বা গিলতে প্রচণ্ড কষ্ট হয় এবং মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা ঝরতে থাকে।
৫. চরম ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট
খাবার না খাওয়া এবং জ্বরের কারণে বিড়ালটি অত্যন্ত দুর্বল বা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তারা খেলাধুলা বন্ধ করে দিয়ে অন্ধকার বা নির্জন কোনো জায়গায় চুপচাপ শুয়ে থাকে। ইনফেকশন বুকে ছড়িয়ে পড়লে বিড়ালের মারাত্মক শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের ভেতর ঘড়ঘড় শব্দ হয়।
ক্যাট ফ্লু ছড়ানোর প্রধান দুটি ভাইরাস
সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে ক্যাট ফ্লু ছড়ানোর জন্য দায়ী প্রধান দুটি ভাইরাসের পার্থক্য তুলে ধরা হলো:
| ভাইরাসের ধরন | প্রধান আক্রমণের স্থান | বিশেষ ক্ষতিকর লক্ষণ |
| ফেলাইন হার্পিস ভাইরাস (FHV) | মূলত চোখ এবং নাক। | চোখে মারাত্মক ইনফেকশন ও কর্নিয়ায় ঘা হয়। |
| ফেলাইন ক্যালিসি ভাইরাস (FCV) | মূলত মুখ এবং গলা। | জিহ্বা ও মুখে যন্ত্রণাদায়ক ঘা তৈরি হয় এবং অনেক সময় খোঁড়ায়। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. মানুষের কি বিড়ালের ফ্লু হতে পারে?
উত্তর: একদমই না। ক্যাট ফ্লু-এর ভাইরাসগুলো শুধুমাত্র বিড়াল বা এই প্রজাতির প্রাণীদেরই আক্রমণ করে। তাই আক্রান্ত বিড়াল থেকে মানুষের বা কুকুরের শরীরে এই রোগ ছড়ানোর কোনো বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা নেই।
২. বিড়ালের ফ্লু-এর ঘরোয়া চিকিৎসা কী?
উত্তর: বিড়ালকে সবসময় উষ্ণ এবং পরিষ্কার জায়গায় রাখুন। নাক ও চোখের চারপাশের সর্দি বা পিচুটি হালকা গরম পানিতে তুলো ভিজিয়ে আলতো করে মুছে দিন। ঘ্রাণশক্তি বাড়ানোর জন্য খাবারে সামান্য গরম পানি বা মুরগির সেদ্ধ স্যুপ (লবণ ছাড়া) মিশিয়ে দিতে পারেন, যাতে তারা খাবার খেতে আগ্রহী হয়।
৩. ক্যাট ফ্লু থেকে বিড়ালকে বাঁচানোর উপায় কী?
উত্তর: ক্যাট ফ্লু থেকে বিড়ালকে রক্ষার একমাত্র এবং সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো সঠিক বয়সে ‘ভ্যাকসিন’ বা টিকা দেওয়া। ছোট বয়সেই কোর ভ্যাকসিন (FVRCP) দিলে বিড়াল এই মারাত্মক ভাইরাসগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা অর্জন করে।
বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও প্রাণীস্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। বিড়ালের জ্বর বা ব্যথা কমানোর জন্য কখনোই মানুষের ওষুধ (যেমন- প্যারাসিটামল, নাপা বা আইবুপ্রোফেন) খাওয়াবেন না। প্যারাসিটামল বিড়ালের লিভারের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত এবং একটি মাত্র বড়িও বিড়ালের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে দ্রুত একজন রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি চিকিৎসকের (Veterinarian) পরামর্শ নিয়ে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক ও ড্রপ ব্যবহার করুন।