বুকের বাম পাশে ব্যথা কিসের লক্ষণ ও কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন

বুকের বাম পাশে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব করলে আমাদের সবার মনে প্রথমেই যে আতঙ্কটি কাজ করে তা হলো—’হার্ট অ্যাটাক’। যেহেতু আমাদের হৃৎপিণ্ড বা হার্ট বুকের ঠিক মাঝখান থেকে বাম দিক ঘেঁষে অবস্থান করে, তাই এই ভয় পাওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, বুকের বাম পাশে ব্যথা মানেই সবসময় হার্টের সমস্যা নয়। গ্যাস্ট্রিক, পেশিতে টান পড়া, ফুসফুসের ইনফেকশন কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণেও বুকের বাম দিকে তীব্র ব্যথা হতে পারে। তবে ব্যথার ধরন এবং অন্যান্য লক্ষণগুলো আগে থেকে চিনে রাখা জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে। চলুন, বুকের বাম পাশে ব্যথা হওয়ার প্রধান ৫টি কারণ এবং এর লক্ষণগুলো বিস্তারিত জেনে নিই।


বুকের বাম পাশে ব্যথার ৫টি প্রধান কারণ ও লক্ষণ


ব্যথার ধরন এবং এটি কোথায় ছড়িয়ে পড়ছে, তা দেখে ব্যথার মূল কারণ অনেকটা অনুমান করা যায়। বুকের বাম পাশে ব্যথার পেছনে মূলত নিচের কারণগুলো দায়ী হতে পারে:
১. হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগের সংকেত
বুকের বাম পাশে ব্যথার সবচেয়ে প্রাণঘাতী কারণ হলো হার্ট অ্যাটাক (Myocardial Infarction)। হার্টে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে এই ব্যথা শুরু হয়।
লক্ষণ: বুকের ঠিক মাঝখানে বা বাম দিকে প্রচণ্ড চাপ বা ভারী পাথর চাপা দেওয়ার মতো ব্যথা অনুভূত হয়। এই ব্যথা ধীরে ধীরে বাম হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি রোগীর প্রচণ্ড ঘাম, দম ফুরিয়ে আসা এবং বমি বমি ভাব দেখা দেয়।
২. গ্যাস্ট্রিক বা বুক জ্বালাপোড়া (GERD)
বুক ব্যথার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো গ্যাস্ট্রিক বা এসিড রিফ্লাক্স। পাকস্থলীর অতিরিক্ত এসিড যখন খাদ্যনালী দিয়ে উপরের দিকে উঠে আসে, তখন বুকে মারাত্মক জ্বালাপোড়া ও ব্যথা হয়।
লক্ষণ: বুকের মাঝখানে বা বাম পাশে জ্বালাপোড়াযুক্ত চিনচিনে ব্যথা হয়। সাধারণত ভারী খাবার খাওয়ার পর, খালি পেটে থাকলে বা শুয়ে পড়লে এই ব্যথা বেশি অনুভূত হয়। অ্যান্টাসিড বা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেলে এই ব্যথা দ্রুত কমে যায়।
৩. মাংসপেশিতে টান বা হাড়ের ব্যথা
অনেক সময় ভারী জিনিস তুলতে গিয়ে বা ভুল ভঙ্গিতে ঘুমানোর কারণে বুকের বাম দিকের মাংসপেশিতে টান (Muscle strain) লাগতে পারে। এছাড়া পাঁজরের হাড়ের তরুণাস্থিতে প্রদাহ হলে (Costochondritis) বুকে তীব্র ব্যথা হয়।
লক্ষণ: এই ব্যথাটি নির্দিষ্ট একটি জায়গায় হয়। গভীর শ্বাস নিলে, কাঁচলে বা নির্দিষ্ট ওই জায়গায় হাত দিয়ে চাপ দিলে ব্যথার তীব্রতা বেড়ে যায়।
৪. ফুসফুসের সমস্যা বা ইনফেকশন
বুকের বাম দিকের ফুসফুসে ইনফেকশন (যেমন- নিউমোনিয়া) বা ফুসফুসের বাইরের পর্দায় প্রদাহ (Pleurisy) হলে বুকে ব্যথা হতে পারে।
লক্ষণ: শ্বাস নেওয়ার সময় বা কাশি দেওয়ার সময় বুকের বাম পাশে সুঁই ফোটার মতো তীব্র তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভূত হয়। এর পাশাপাশি রোগীর প্রচণ্ড জ্বর, শ্বাসকষ্ট এবং কফযুক্ত কাশি থাকতে পারে।
৫. প্যানিক অ্যাটাক বা মানসিক চাপ
অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ভয় বা উদ্বেগের কারণে ‘প্যানিক অ্যাটাক’ (Panic Attack) হতে পারে, যার লক্ষণগুলো হার্ট অ্যাটাকের সাথে এতটাই মিলে যায় যে অনেকেই বিভ্রান্ত হন।
লক্ষণ: হঠাৎ করে বুকের বাম পাশে ব্যথা শুরু হয়, বুক ধড়ফড় করে এবং দম আটকে আসে। তবে প্যানিক অ্যাটাকের ব্যথা সাধারণত ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে নিজে থেকেই কমে আসে।


হার্টের ব্যথা বনাম গ্যাস্ট্রিক/পেশির ব্যথা


সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে হার্টের ব্যথা এবং অন্যান্য সাধারণ ব্যথার পার্থক্য তুলে ধরা হলো:

লক্ষণের ধরনহার্ট অ্যাটাকের ব্যথা (Cardiac Pain)গ্যাস্ট্রিক বা পেশির ব্যথা (Non-Cardiac)
ব্যথার ধরনভারী চাপ, মোচড়ানো বা দমবন্ধ করা ব্যথা।জ্বালাপোড়া করা বা সুঁই ফোটার মতো তীক্ষ্ণ ব্যথা।
ব্যথা ছড়িয়ে পড়াবাম হাত, চোয়াল, ঘাড় বা পিঠের দিকে ছড়ায়।ব্যথা সাধারণত এক জায়গাতেই সীমাবদ্ধ থাকে।
চাপ বা শ্বাস-প্রশ্বাসবুকে চাপ দিলে বা শ্বাস নিলে ব্যথার পরিবর্তন হয় না।বুকে চাপ দিলে বা জোরে শ্বাস নিলে ব্যথা বাড়ে।
ওষুধের প্রভাবসাধারণ ব্যথার ওষুধ বা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধে কাজ হয় না।অ্যান্টাসিড বা পেইনকিলারে ব্যথা কমে যায়।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. তরুণ বা কম বয়সীদের কি বুকে ব্যথা হলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থাকে?
উত্তর: হ্যাঁ। আজকাল অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ফাস্টফুড, ধূমপান এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের মধ্যেও হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। তাই বয়স কম হলেও বুক ব্যথাকে অবহেলা করা উচিত নয়।
২. গ্যাস্ট্রিকের কারণে বুকে ব্যথা হলে তাৎক্ষণিক কী করণীয়?
উত্তর: গ্যাস্ট্রিকের কারণে বুক জ্বালাপোড়া বা ব্যথা হলে এক গ্লাস হালকা গরম পানি বা ঠান্ডা দুধ পান করলে সাময়িক আরাম পাওয়া যায়। চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টাসিড জাতীয় সিরাপ বা ওষুধ সেবন করলে এই ব্যথা দ্রুত কমে যায়।
৩. নারীদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণগুলো কি ভিন্ন হয়?
উত্তর: হ্যাঁ। নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় বুকে তীব্র ব্যথার বদলে প্রচণ্ড ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, পিঠে বা পেটে ব্যথা এবং বমি বমি ভাবের মতো অস্বাভাবিক লক্ষণ প্রকাশ পায়, যা অনেকেই সাধারণ গ্যাস্ট্রিক ভেবে ভুল করেন।


বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি বুকের বাম পাশে হঠাৎ করে প্রচণ্ড চাপ বা ব্যথা শুরু হয়, ব্যথা বাম হাত ও চোয়ালের দিকে ছড়িয়ে পড়ে, দরদর করে ঘাম হতে থাকে এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হয়—তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত রোগীকে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে ‘ইসিজি’ (ECG) করাতে হবে। এটি হার্ট অ্যাটাকের সুস্পষ্ট লক্ষণ, যেখানে প্রথম এক ঘণ্টা (Golden Hour) জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *