দাদ রোগের ৫টি প্রধান লক্ষণ, কারণ ও মুক্তির কার্যকরী উপায়

আমাদের দেশে গরম ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার কারণে চর্মরোগের প্রকোপ খুব বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত এবং যন্ত্রণাদায়ক একটি চর্মরোগ হলো ‘দাদ’। ইংরেজিতে একে ‘রিংওয়ার্ম’ (Ringworm) বলা হলেও, এর সাথে আসলে কৃমি বা ওয়ার্মের কোনো সম্পর্ক নেই।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় দাদ হলো এক প্রকার ছত্রাক বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন, যাকে ‘টিনিয়া’ (Tinea) বলা হয়। এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ, যা খুব দ্রুত একজন থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। শরীরের যেসব জায়গায় ঘাম বেশি হয় (যেমন- কুঁচকি, বগল, কোমরের ভাঁজ বা পায়ের আঙুলের চিপায়), সেখানে এই ছত্রাক সবচেয়ে বেশি বংশবৃদ্ধি করে। চলুন, দাদ রোগের প্রধান ৫টি লক্ষণ এবং এটি প্রতিরোধের বিজ্ঞানভিত্তিক উপায় বিস্তারিত জেনে নিই।


দাদ রোগের ৫টি প্রধান শারীরিক লক্ষণ


দাদ শরীরের যেকোনো অংশেই হতে পারে। তবে ফাঙ্গাস আক্রমণের সাধারণত ৪ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে ত্বকে নিচের সুস্পষ্ট লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে:
১. গোলাকার বা রিংয়ের মতো লাল দাগ
দাদ রোগের সবচেয়ে বড় এবং চেনার প্রধান উপায় হলো এর আকৃতি। আক্রান্ত স্থানে প্রথমে ছোট লাল গোটা ওঠে এবং ধীরে ধীরে এটি রিং বা চুড়ির মতো গোলাকার আকার ধারণ করে। এই রিংয়ের মতো আকৃতির কারণেই একে রিংওয়ার্ম বলা হয়।
২. প্রচণ্ড চুলকানি ও অস্বস্তি
আক্রান্ত স্থানে সারাক্ষণ প্রচণ্ড চুলকানি অনুভূত হয়। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময় বা শরীর ঘেমে গেলে চুলকানির তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়। চুলকাতে চুলকাতে অনেক সময় ত্বক থেকে রক্ত বা কষ বের হয়ে যেতে পারে।
৩. দাগের কিনারা উঁচু ও মাঝখান ফ্যাকাশে
দাদের গোলাকার দাগটির চারপাশের কিনারাগুলো (Border) ত্বকের সমতল থেকে কিছুটা উঁচু, লালচে এবং দানাদার হয়। কিন্তু রিংয়ের ভেতরের দিকের বা মাঝখানের ত্বক সাধারণত ফ্যাকাশে বা স্বাভাবিক রঙের থাকে।
৪. চামড়া ওঠা বা আঁশযুক্ত হওয়া
আক্রান্ত স্থানের ত্বক মারাত্মক শুষ্ক হয়ে যায় এবং সেখান থেকে মাছের আঁশের মতো সাদা সাদা চামড়া বা খুশকির মতো খোসা উঠতে থাকে। এই খোসাগুলো যেখানে পড়ে, সেখানেও নতুন করে ফাঙ্গাস তৈরি হতে পারে।
৫. দ্রুত শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়া
এটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়। প্রাথমিক অবস্থায় একটি ছোট দাগ থাকলেও, চুলকানোর পর সেই হাত দিয়ে শরীরের অন্য কোথাও স্পর্শ করলে সেখানেও নতুন করে দাদ তৈরি হয়।


দাদ বা ফাঙ্গাস কীভাবে ছড়ায়?


দাদ মূলত ডার্মাটোফাইট (Dermatophyte) নামক এক ধরনের ছত্রাকের কারণে হয়। এটি প্রধানত ৩টি মাধ্যমে ছড়ায়:
সরাসরি সংস্পর্শ: আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে সরাসরি মেলামেশা করলে বা ত্বকের স্পর্শ লাগলে।
ব্যবহৃত জিনিসপত্র: আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত তোয়ালে, সাবান, চিরুনি, বিছানার চাদর বা কাপড় ব্যবহার করলে।
পোষা প্রাণী থেকে: আক্রান্ত কুকুর, বিড়াল বা গবাদিপশুকে স্পর্শ করলে খুব সহজেই এই ছত্রাক মানুষের শরীরে চলে আসে।


দাদ বনাম সাধারণ অ্যালার্জি বা একজিমা


সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে দাদ (ফাঙ্গাল ইনফেকশন) এবং সাধারণ অ্যালার্জির পার্থক্য তুলে ধরা হলো:

বৈশিষ্ট্যের ধরনদাদ বা রিংওয়ার্ম (Fungal Infection)সাধারণ অ্যালার্জি বা একজিমা (Allergy)
দাগের আকৃতিস্পষ্ট গোলাকার বা রিংয়ের মতো হয়।এর কোনো নির্দিষ্ট আকার থাকে না।
ছড়ানোর ক্ষমতাঅত্যন্ত ছোঁয়াচে, অন্যের শরীরে দ্রুত ছড়ায়।এটি ছোঁয়াচে নয়, অন্যের শরীরে ছড়ায় না।
উৎপত্তির কারণছত্রাক বা ফাঙ্গাসের আক্রমণের কারণে হয়।ধুলাবালি, খাবার বা রাসায়নিকের প্রভাবে হয়।
চিকিৎসার ধরনঅ্যান্টি-ফাঙ্গাল ক্রিম বা ওষুধ ব্যবহার করতে হয়।অ্যান্টি-হিস্টামিন বা অ্যালার্জির ওষুধে কমে যায়।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. দাদ রোগ সারতে কতদিন সময় লাগে?
উত্তর: সঠিক অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ক্রিম (যেমন- ক্লোট্রিমাজোল বা টারবিনাফাইন) নিয়মিত ব্যবহার করলে এবং ত্বক পরিষ্কার রাখলে সাধারণত ২ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে দাদ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়।
২. দাদ হলে কি সাবান ব্যবহার করা যাবে?
উত্তর: সাধারণ ক্ষারযুক্ত বা সুগন্ধি সাবান ব্যবহার করলে আক্রান্ত স্থানে জ্বালাপোড়া বা চুলকানি বাড়তে পারে। তাই দাদ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে নির্দিষ্ট অ্যান্টি-ফাঙ্গাল সাবান বা খুব মাইল্ড সাবান ব্যবহার করা উচিত।
৩. বারবার দাদ হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: একটু ভালো হওয়ার পরই যদি আপনি মলম লাগানো বা ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন, তবে ত্বকের নিচে লুকিয়ে থাকা ছত্রাকগুলো পুনরায় আক্রমণ করে। তাই দাগ মুছে যাওয়ার পরও চিকিৎসকের নির্দেশিত সময় পর্যন্ত মলম ব্যবহার চালিয়ে যেতে হয়।


বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। আমাদের দেশে অনেকেই দাদ হলে ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ‘স্টেরয়েড’ (Steroid) যুক্ত ক্রিম (যেমন- ডার্মোভেট বা বেটনোভেট) কিনে লাগান। এতে চুলকানি সাময়িকভাবে কমলেও, স্টেরয়েড ত্বকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয় এবং পরবর্তীতে ফাঙ্গাস আরও ভয়ংকর রূপে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে (যাকে Tinea Incognito বলা হয়)। তাই দাদ হলে অবশ্যই একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের (Dermatologist) পরামর্শ নিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *