গর্ভাবস্থার একেবারে শেষ পর্যায়ে, অর্থাৎ প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে গর্ভবতী নারীর শরীরে বেশ কিছু প্রাকৃতিক পরিবর্তন দেখা দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘জরায়ু মুখ খোলা’ বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সার্ভাইকাল ডাইলেটেশন (Cervical Dilation)।
স্বাভাবিক প্রসব বা নরমাল ডেলিভারির জন্য জরায়ু মুখ ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে ১০ সেন্টিমিটার (প্রায় ৪ ইঞ্চি) পর্যন্ত খুলতে হয়। তবে জরায়ুর মুখ একদিনে বা হঠাৎ করে খোলে না। প্রসবের কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই শরীর কিছু বিশেষ সংকেত দিতে শুরু করে, যা দেখে বোঝা যায় যে শরীর ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। চলুন, জরায়ু মুখ খোলার প্রধান ৫টি শারীরিক লক্ষণ বিস্তারিত জেনে নিই।
জরায়ু মুখ খোলার ৫টি প্রধান লক্ষণ
জরায়ু মুখ খোলার সময় প্রতিটি গর্ভবতী নারীর শারীরিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে। তবে নিচে সবচেয়ে সুস্পষ্ট এবং সাধারণ লক্ষণগুলো দেওয়া হলো:
১. মিউকাস প্লাগ বের হওয়া বা ‘ব্লাডি শো’
গর্ভাবস্থায় জরায়ুর মুখ একটি আঠালো মিউকাস বা শ্লেষ্মা দিয়ে শক্তভাবে বন্ধ থাকে, যাতে বাইরের কোনো জীবাণু জরায়ুর ভেতরে বাচ্চার কাছে পৌঁছাতে না পারে। জরায়ু মুখ যখন খুলতে শুরু করে, তখন এই ‘মিউকাস প্লাগ’ খসে পড়ে যায়। এর ফলে যোনিপথ দিয়ে আঠালো, জেলির মতো সাদা বা গোলাপি রঙের স্রাব নির্গত হয়, যার সাথে সামান্য রক্তের ছিটে থাকতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘ব্লাডি শো’ (Bloody show) বলা হয়, যা ডেলিভারি কাছে আসার অন্যতম বড় লক্ষণ।
২. নিয়মিত এবং তীব্র লেবার পেইন (Contractions)
জরায়ু মুখ প্রসারিত হওয়ার সবচেয়ে বড় সংকেত হলো নিয়মিত জরায়ু সংকোচন বা লেবার পেইন। এই ব্যথা সাধারণত পিঠের নিচের অংশ বা কোমর থেকে শুরু হয়ে তলপেটের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সময়ের সাথে সাথে এই ব্যথার তীব্রতা এবং স্থায়িত্ব বাড়তে থাকে। প্রতি ৫ থেকে ১০ মিনিট পরপর যদি তীব্র ব্যথা আসে এবং পেট শক্ত হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে জরায়ুর মুখ খুলতে শুরু করেছে।
৩. পেলভিস বা তলপেটে প্রচণ্ড চাপ অনুভব
ডেলিভারির সময় কাছাকাছি এলে বাচ্চার মাথা মায়ের পেলভিস বা শ্রোণির দিকে নিচে নেমে আসে, যাকে ‘লাইটেনিং’ (Lightening) বা ‘বাচ্চা নিচে নামা’ বলা হয়। এর ফলে মায়ের তলপেটে এবং যোনিপথে প্রচণ্ড চাপ ও ভারবোধ অনুভব হয়। মনে হয় যেন বাচ্চা যেকোনো সময় নিচ দিয়ে বেরিয়ে আসবে। এর কারণে মায়ের ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগও হতে পারে।
৪. জরায়ু মুখ পাতলা হওয়া (Cervical Effacement)
নরমাল ডেলিভারির আগে জরায়ু মুখ শুধু খোলেই না, এটি ধীরে ধীরে পাতলা এবং কাগজের মতো নরম হতে শুরু করে। একে ‘ইফেসমেন্ট’ (Effacement) বলা হয়। এটি সাধারণত বাইরে থেকে সরাসরি বোঝা যায় না। চেকআপের সময় ডাক্তাররা আঙুল দিয়ে বা যোনিপথ পরীক্ষার (P/V test) মাধ্যমে বুঝতে পারেন জরায়ু মুখ শতকরা কতভাগ পাতলা হয়েছে এবং কত সেন্টিমিটার খুলেছে।
৫. পানি ভাঙা বা অ্যামনিওটিক ফ্লুইড নির্গমন
বাচ্চা মায়ের পেটে অ্যামনিওটিক স্যাক নামক একটি পানির থলিতে অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থায় ভাসে। প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে এবং জরায়ু মুখ সম্পূর্ণ খোলার পথে থাকলে এই থলি ফেটে যায় এবং যোনিপথ দিয়ে অনবরত পরিষ্কার পানি বের হতে থাকে। একে ‘পানি ভাঙা’ (Water breaking) বলা হয়। এটি নরমাল ডেলিভারির একটি চূড়ান্ত লক্ষণ।
আসল ব্যথা (True Labor) বনাম নকল ব্যথা (False Labor)
গর্ভাবস্থার শেষ দিকে নকল ব্যথা বা ‘ব্র্যাক্সটন হিকস’ (Braxton Hicks) হওয়া খুব স্বাভাবিক। সহজে আসল লেবার পেইন চেনার জন্য নিচের টেবিলটি খেয়াল করুন:
| লক্ষণের ধরন | আসল প্রসব ব্যথা (True Labor) | নকল প্রসব ব্যথা (False Labor) |
| ব্যথার ধরন | কোমর থেকে শুরু হয়ে তলপেটে আসে। | শুধু তলপেটে বা পেটের ওপরের অংশে হয়। |
| ব্যথার সময়কাল | নির্দিষ্ট সময় পরপর (যেমন ৫ মিনিট) আসে। | ব্যথার কোনো নির্দিষ্ট সময় বা ছন্দ থাকে না। |
| তীব্রতা | সময়ের সাথে সাথে ব্যথার তীব্রতা বাড়তে থাকে। | ব্যথার তীব্রতা একই থাকে বা কমে যায়। |
| অবস্থান পরিবর্তন | হাঁটাচলা করলে বা শুয়ে থাকলে ব্যথা কমে না। | হাঁটাচলা করলে বা বিশ্রাম নিলে ব্যথা কমে যায়। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. জরায়ু মুখ কত সেন্টিমিটার খুললে ডেলিভারি বা প্রসব হয়?
উত্তর: একটি শিশুকে স্বাভাবিকভাবে জন্ম দেওয়ার জন্য মায়ের জরায়ু মুখ শূন্য থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত খুলতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রথমবার মা হওয়া নারীদের ক্ষেত্রে ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
২. জরায়ু মুখ খোলার ব্যথা কমানোর প্রাকৃতিক উপায় কী?
উত্তর: লেবার পেইনের সময় লম্বা এবং গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস (Breathing exercises) নিলে পেশি শিথিল হয়। এছাড়া হালকা হাঁটাচলা করা, বাম কাত হয়ে শুয়ে থাকা এবং কোমরে হালকা গরম সেঁক বা ম্যাসাজ দিলে ব্যথার তীব্রতা কিছুটা সহনশীল হয়।
৩. পানি ভাঙার পর কতক্ষণ অপেক্ষা করা যায়?
উত্তর: পানি ভাঙার পর সাধারণত ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডেলিভারি হয়ে যায়। পানি ভাঙার পর বেশি দেরি করলে বাচ্চার শ্বাসকষ্ট হতে পারে এবং জরায়ুর ভেতরে মারাত্মক ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও মাতৃস্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহের আগেই যোনিপথ দিয়ে প্রচুর রক্তপাত শুরু হয়, হঠাৎ করে পানি ভেঙে যায় (পানি যদি সবুজ বা বাদামি রঙের হয়) অথবা বাচ্চা পেটে নড়াচড়া একদম বন্ধ করে দেয়—তবে কোনো ব্যথার জন্য অপেক্ষা করবেন না। এমন অবস্থায় এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত গর্ভবতী মাকে হাসপাতালে নিয়ে গাইনোকোলজিস্টের শরণাপন্ন হতে হবে।