প্রস্রাবে প্রোটিন যাওয়ার ৫টি লক্ষণ ও জরুরি সতর্কতা

আমাদের কিডনির প্রধান কাজ হলো শরীরের রক্ত ছেঁকে ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেওয়া এবং প্রোটিনের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলো রক্তে ধরে রাখা। কিন্তু কিডনির ছাঁকনি বা ‘গ্লোমেরুলাস’ (Glomerulus) যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন রক্তের প্রয়োজনীয় প্রোটিন (অ্যালবুমিন) ফিল্টার না হয়ে প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রস্রাবে প্রোটিন বেরিয়ে যাওয়ার এই অবস্থাকে ‘প্রোটিনুরিয়া’ (Proteinuria) বা অ্যালবুমিনুরিয়া বলা হয়। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি বিকল হতে শুরু করলে এটি সবচেয়ে প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয়। সঠিক সময়ে এই লক্ষণগুলো চিনতে না পারলে কিডনি সম্পূর্ণ ড্যামেজ হয়ে যেতে পারে। চলুন, প্রস্রাবে প্রোটিন যাওয়ার প্রধান ৫টি শারীরিক লক্ষণ বিস্তারিত জেনে নিই।


প্রস্রাবে প্রোটিন যাওয়ার ৫টি প্রধান লক্ষণ


প্রস্রাবের সাথে প্রোটিন বেরিয়ে গেলে শরীর মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং তরলের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এ সময় শরীরে নিচের সুস্পষ্ট লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:
১. ফেনাযুক্ত বা সাবানের মতো ফেনা ওঠা প্রস্রাব
প্রস্রাবে প্রোটিন যাওয়ার সবচেয়ে বড় এবং সুস্পষ্ট লক্ষণ হলো প্রস্রাবে প্রচুর পরিমাণে ফেনা হওয়া (Foamy urine)। সাধারণত বেগে প্রস্রাব করলে কিছুটা বুদবুদ তৈরি হয় যা দ্রুত মিলিয়ে যায়। কিন্তু প্রোটিনুরিয়া হলে প্রস্রাবের ফেনা সাবানের ফেনার মতো একদম স্থায়ী হয় এবং সহজে ফ্লাশ করলেও যেতে চায় না।
২. হাত, পা, মুখ ও চোখের চারপাশ ফুলে যাওয়া
রক্তে প্রোটিনের (অ্যালবুমিন) কাজ হলো স্পঞ্জের মতো পানি ধরে রাখা। প্রস্রাবের সাথে প্রোটিন বেরিয়ে গেলে রক্তনালী থেকে পানি বা তরল লিক হয়ে শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে জমতে শুরু করে। এর ফলে রোগীর হাত, পা, গোড়ালি এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের চারপাশ ও মুখ মারাত্মকভাবে ফুলে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘ইডেমা’ (Edema) বলা হয়।
৩. চরম ক্লান্তি ও পেশিতে দুর্বলতা
প্রোটিন হলো আমাদের পেশি এবং শরীরের শক্তির প্রধান উৎস। প্রস্রাবের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রচুর প্রোটিন বেরিয়ে গেলে শরীর মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভোগে। এর ফলে রোগী সারাক্ষণ চরম ক্লান্তি, অবসাদ এবং পেশিতে দুর্বলতা অনুভব করেন। সামান্য কাজ বা হাঁটাহাঁটি করলেই শরীর হাঁপিয়ে ওঠে।
৪. ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া
কিডনি ঠিকমতো কাজ করতে না পারার কারণে রোগীর ঘন ঘন প্রস্রাব করার প্রয়োজন হয়, বিশেষ করে রাতের বেলা (Nocturia)। প্রস্রাবের পরিমাণ কখনো খুব বেশি বা কখনো খুব কম হতে পারে। এর সাথে প্রস্রাব করার সময় হালকা জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তিও কাজ করতে পারে।
৫. খাবারে অরুচি ও তীব্র বমি বমি ভাব
কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গিয়ে প্রোটিন লিক হওয়ার পাশাপাশি শরীরে ক্রিয়েটিনিন এবং ইউরিয়ার মতো ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ জমতে শুরু করে। এর প্রভাবে রোগীর খাবারে চরম অরুচি চলে আসে, মুখে বিস্বাদ লাগে এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তীব্র বমি বমি ভাব বা বমি হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।


সাধারণ প্রস্রাব বনাম প্রোটিনযুক্ত প্রস্রাব


সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে সাধারণ প্রস্রাব এবং প্রোটিন যুক্ত প্রস্রাবের পার্থক্য তুলে ধরা হলো:

বৈশিষ্ট্যের ধরনসাধারণ সুস্থ প্রস্রাবপ্রোটিনযুক্ত প্রস্রাব (Proteinuria)
ফেনার ধরনহালকা বুদবুদ হয়, যা কয়েক সেকেন্ডেই মিলিয়ে যায়।সাবানের মতো প্রচুর ফেনা হয়, যা দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী থাকে।
প্রস্রাবের রংসাধারণত হালকা হলুদ বা পানির মতো স্বচ্ছ হয়।অনেক সময় ঘোলাটে বা ফ্যাকাশে হতে পারে।
শারীরিক ফোলাভাবহাত বা পা ফুলে যাওয়ার মতো কোনো সমস্যা থাকে না।শরীরে পানি জমে হাত, পা ও মুখ ফুলে যায় (Edema)।
ফ্লাশ করার পরএকবার ফ্লাশ করলেই প্যান পরিষ্কার হয়ে যায়।ফেনা বেশি হওয়ায় বারবার ফ্লাশ করার প্রয়োজন হয়।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. প্রস্রাবে প্রোটিন যাওয়ার প্রধান কারণগুলো কী কী?
উত্তর: প্রস্রাবে প্রোটিন যাওয়ার সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure)। এছাড়া কিডনিতে ইনফেকশন, নেফ্রাইটিস বা অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার কারণেও প্রস্রাবে প্রোটিন যেতে পারে।
২. প্রস্রাবে প্রোটিন যাচ্ছে কি না তা কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়?
উত্তর: এটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসকরা খুব সাধারণ একটি প্রস্রাব পরীক্ষা, যাকে ‘ইউরিন রুটিন এক্সামিনেশন’ (Urine R/E) বলা হয়, সেটি করতে দেন। এছাড়া কিডনির অবস্থা বুঝতে ‘UACR’ এবং রক্তে ক্রিয়েটিনিন (Serum Creatinine) পরীক্ষা করানো হয়।
৩. প্রস্রাবে প্রোটিন গেলে কি মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ করে দিতে হবে?
উত্তর: না, প্রোটিন খাওয়া একেবারে বন্ধ করা যাবে না। তবে প্রস্রাবে প্রোটিন গেলে রেড মিট (গরু বা খাসির মাংস) এড়িয়ে চলতে হয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন বা ছোট মাছ ও ডিমের সাদা অংশ খেতে হয়। পাশাপাশি খাবারে কাঁচা লবণের পরিমাণ একদম কমিয়ে ফেলতে হবে।


বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। প্রস্রাবে ফেনা হওয়া এবং চোখের নিচ ফুলে যাওয়ার লক্ষণগুলো হলো ‘ক্রনিক কিডনি ডিজিজ’ (CKD) বা কিডনি ফেইলিউরের নীরব সংকেত। এই লক্ষণগুলো দেখার পরও যদি অবহেলা করেন, তবে পরবর্তীতে ডায়ালাইসিস (Dialysis) বা কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তাই কালক্ষেপণ না করে দ্রুত একজন নেফ্রোলজিস্ট বা কিডনি বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *