পাইলসের ৫টি মারাত্মক লক্ষণ, কারণ ও বাঁচার কার্যকরী উপায়

পাইলস (Piles) বা অর্শ রোগ বর্তমানে আমাদের দেশের একটি অত্যন্ত পরিচিত এবং যন্ত্রণাদায়ক স্বাস্থ্য সমস্যা। কোষ্ঠকাঠিন্য, দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা, অতিরিক্ত ওজন বা ফাইবারযুক্ত খাবার কম খাওয়ার কারণে মলদ্বারের ভেতরের বা বাইরের রক্তনালীগুলো ফুলে গিয়ে এই রোগের সৃষ্টি হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘হেমোরয়েডস’ (Hemorrhoids) বলা হয়। পাইলস প্রাথমিক পর্যায়ে খুব একটা সমস্যার সৃষ্টি না করলেও, সঠিক সময়ে এর লক্ষণগুলো চিনে চিকিৎসা না করালে পরবর্তীতে অপারেশন ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। চলুন, পাইলস বা অর্শ রোগের প্রধান ৫টি লক্ষণ এবং এটি প্রতিরোধের উপায় বিস্তারিত জেনে নিই।


পাইলস বা অর্শ রোগের ৫টি প্রধান লক্ষণ


পাইলস মূলত মলদ্বারের ভেতরে বা বাইরে হতে পারে। এর ওপর ভিত্তি করে লক্ষণগুলোতে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। তবে নিচে পাইলসের সবচেয়ে সাধারণ ৫টি লক্ষণ তুলে ধরা হলো:
১. মলত্যাগের সময় ব্যথাহীন রক্তপাত
পাইলসের সবচেয়ে প্রথম এবং সাধারণ লক্ষণ হলো মলত্যাগের সময় রক্ত যাওয়া। এক্ষেত্রে মলের গায়ে লেগে তাজা লাল রক্ত বের হয় অথবা প্যানে কয়েক ফোঁটা রক্ত পড়তে দেখা যায়। তবে ভেতরের পাইলসের (Internal Piles) ক্ষেত্রে রক্তপাত হলেও সাধারণত কোনো ব্যথা অনুভূত হয় না, যার কারণে অনেকেই শুরুতে এটি বুঝতে পারেন না।
২. মলদ্বারে মাংসপিণ্ড বা গোটা অনুভব হওয়া
মলত্যাগের সময় চাপ দিলে মলদ্বার দিয়ে আঙুরের মতো নরম একটি মাংসপিণ্ড বা গোটা বেরিয়ে আসে। প্রাথমিক পর্যায়ে মলত্যাগের পর এটি নিজে থেকেই ভেতরে ঢুকে যায়। তবে পাইলস মারাত্মক আকার ধারণ করলে এই গোটা আর ভেতরে ঢোকে না, যা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হয়।
৩. মলদ্বারে তীব্র চুলকানি ও অস্বস্তি
পাইলসের কারণে মলদ্বারের চারপাশের ত্বক অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে যায় এবং সেখানে মিউকাস বা আঠালো রস জমতে থাকে। এর ফলে সারাক্ষণ মলদ্বারে তীব্র চুলকানি (Itching) এবং একধরনের ভেজা বা অস্বস্তিকর অনুভূতি কাজ করে।
৪. বসার সময় বা মলত্যাগে প্রচণ্ড ব্যথা
বাইরের পাইলস (External Piles) বা গোটা যখন মলদ্বারের বাইরে ঝুলে থাকে, তখন সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে যেতে পারে (Thrombosed Hemorrhoid)। এমনটি হলে মলত্যাগের সময়, হাঁটাচলা করতে বা শক্ত জায়গায় বসতে গেলে মলদ্বারে সুঁই ফোটার মতো প্রচণ্ড তীক্ষ্ণ ব্যথা হয়।
৫. মল ঠিকমতো পরিষ্কার না হওয়ার অনুভূতি
পাইলসের কারণে অন্ত্রের নিচের অংশ ফুলে থাকার কারণে রোগীর বারবার মনে হয় যে তার পেট পরিষ্কার হয়নি। মলত্যাগের কিছুক্ষণ পরেই আবার টয়লেটে যাওয়ার তীব্র বেগ আসে, কিন্তু টয়লেটে গেলে মল পরিষ্কার হয় না।


পাইলসের ধরন: ভেতরের বনাম বাইরের পাইলস


সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে দুই ধরনের পাইলসের পার্থক্য তুলে ধরা হলো:

বৈশিষ্ট্যের ধরনইন্টারনাল পাইলস (ভেতরের)এক্সটারনাল পাইলস (বাইরের)
অবস্থানমলদ্বারের অনেক ভেতরে থাকে।মলদ্বারের বাইরের দিকের ত্বকের নিচে হয়।
প্রধান লক্ষণব্যথাহীন তাজা রক্তপাত হওয়া।গোটা ফুলে ওঠা এবং প্রচণ্ড ব্যথা হওয়া।
মাংসপিণ্ডমলত্যাগের সময় বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে।সব সময়ই বাইরে আঙুরের মতো ফুলে থাকে।
ঝুঁকির মাত্রাপ্রাথমিক পর্যায়ে ওষুধে সেরে যায়।রক্ত জমাট বাঁধলে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. মলদ্বারে রক্ত গেলেই কি তা পাইলস?
উত্তর: না। মলদ্বার দিয়ে রক্ত যাওয়ার আরও অনেক কারণ থাকতে পারে, যেমন—এনাল ফিশার (মলদ্বার ছিঁড়ে যাওয়া), ফিস্টুলা বা কোলন ক্যানসার। তাই রক্ত গেলেই নিজে নিজে পাইলসের ওষুধ না খেয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা উচিত।
২. অপারেশন ছাড়া পাইলস ভালো করার উপায় কী?
উত্তর: প্রাথমিক পর্যায়ের পাইলস ঘরে বসেই নিরাময় সম্ভব। এর জন্য প্রচুর পানি পান করতে হবে এবং ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার (যেমন- ইসবগুলের ভুসি, পেঁপে, শাকসবজি) খেতে হবে যাতে কোষ্ঠকাঠিন্য না হয়। এছাড়া হালকা গরম পানিতে ‘সিজ বাথ’ (Sitz bath) নিলে ব্যথা ও ফোলা কমে যায়।
৩. গর্ভাবস্থায় কি পাইলস হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, গর্ভাবস্থায় জরায়ুর আকার বড় হওয়ার কারণে মলদ্বারের শিরাগুলোর ওপর প্রচুর চাপ পড়ে, যার ফলে অনেক গর্ভবতী নারীরই সাময়িকভাবে পাইলস দেখা দেয়। ডেলিভারির পর এটি সাধারণত নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়।


বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি মলদ্বারে অসহ্য ব্যথা হয়, অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যায় বা মাথা ঘোরে, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত একজন কোলোরেক্টাল সার্জনের (Colorectal Surgeon) শরণাপন্ন হোন। পাড়া-মহল্লার হাতুড়ে ডাক্তার বা কবিরাজ দিয়ে পাইলসে এসিড বা ইনজেকশন দিলে মলদ্বার চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *