ব্রেস্ট ইনফেকশন বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘ম্যাস্টাইটিস’ (Mastitis) বলা হয়, সেটি নারীদের জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক এবং ভীতিকর একটি সমস্যা। সাধারণত নতুন মায়েরা যারা বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে, স্তন্যদান না করলেও যেকোনো বয়সী নারীর ব্রেস্ট ইনফেকশন হতে পারে।
স্তনের ভেতরে থাকা মিল্ক ডাস্ট বা দুধের নালী কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে, অথবা নিপলের ফাটা অংশ দিয়ে ব্যাকটেরিয়া স্তনের টিস্যুতে প্রবেশ করলে এই মারাত্মক ইনফেকশন তৈরি হয়। প্রাথমিক অবস্থায় এর লক্ষণগুলো চিনতে না পারলে এটি স্তনে পুঁজ বা অ্যাবসেস (Breast Abscess) তৈরি করতে পারে। চলুন, ব্রেস্ট ইনফেকশনের প্রধান লক্ষণ এবং এটি থেকে মুক্তির উপায়গুলো বিস্তারিত জেনে নিই।
ব্রেস্ট ইনফেকশনের প্রধান ৫টি লক্ষণ
ম্যাস্টাইটিস বা ব্রেস্ট ইনফেকশনের লক্ষণগুলো সাধারণত খুব দ্রুত, অনেক সময় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এর প্রধান সংকেতগুলো হলো:
১. স্তনের নির্দিষ্ট অংশ লালচে হয়ে ফুলে যাওয়া
ইনফেকশনের সবচেয়ে প্রাথমিক লক্ষণ হলো স্তনের যেকোনো একটি নির্দিষ্ট অংশ (সাধারণত এক পাশের স্তনে) অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে এবং ওই অংশের ত্বক টকটকে লাল হয়ে যায়। অনেক সময় লালচে অংশটি দেখতে অনেকটা ত্রিভুজ বা ভেজ (Wedge) আকৃতির মতো মনে হতে পারে।
২. তীব্র ব্যথা ও স্পর্শ করলে গরম অনুভূত হওয়া
ইনফেকশন হওয়া স্তনটি অসম্ভব সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। সামান্য স্পর্শে বা কাপড় লাগলেও সেখানে তীব্র চিনচিনে বা ছুরিকাঘাতের মতো ব্যথা হয়। লাল হয়ে ফুলে থাকা অংশে হাত দিলে শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় অস্বাভাবিক গরম (Warmth) অনুভূত হয়।
৩. কাঁপুনি দিয়ে উচ্চমাত্রার জ্বর (Flu-like symptoms)
ব্রেস্ট ইনফেকশনের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো হঠাৎ করে কাঁপুনি দিয়ে প্রচণ্ড জ্বর আসা (সাধারণত ১০১° ফারেনহাইট বা তার বেশি)। এর সাথে সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, মাথা ব্যথা এবং চরম ক্লান্তি কাজ করে। অনেক নারী একে সাধারণ ফ্লু বা সর্দি-জ্বর ভেবে ভুল করেন।
৪. স্তনের ভেতরে শক্ত চাকা বা গিট অনুভূত হওয়া
স্তনের দুধের নালী বন্ধ হয়ে গেলে (Blocked duct) ইনফেকশন হওয়া জায়গায় আঙুল দিয়ে চাপ দিলে ভেতরে মার্বেল বা ছোট পাথরের মতো শক্ত চাকা বা গিট অনুভূত হয়। দুধ জমে থাকার কারণেই এই চাকাগুলো তৈরি হয় এবং এগুলো প্রচণ্ড ব্যথাদায়ক হয়।
৫. নিপল দিয়ে অস্বাভাবিক রস বা পুঁজ বের হওয়া
ইনফেকশন যদি মারাত্মক পর্যায়ে চলে যায়, তবে নিপল বা স্তনাগ্র দিয়ে সাদাটে বা হলদেটে রঙের পুঁজ, কিংবা অনেক সময় হালকা রক্ত মিশ্রিত রস বের হতে পারে। এছাড়া নিপলের চারপাশে ফাটল বা ঘা থাকতে পারে, যেখান দিয়ে মূলত ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে।
সাধারণ দুধ জমা নাকি ইনফেকশন? বুঝবেন কীভাবে?
নতুন মায়েদের স্তনে দুধ জমে ভারী হওয়া (Engorgement) খুব স্বাভাবিক, তবে তা ইনফেকশন থেকে আলাদা। নিচের টেবিল থেকে এদের মূল পার্থক্যগুলো সহজেই বুঝতে পারবেন:
| বৈশিষ্ট্যের ধরন | ব্রেস্ট এঙ্গরজমেন্ট (দুধ জমে যাওয়া) | ব্রেস্ট ইনফেকশন (ম্যাস্টাইটিস) |
| জ্বর ও শারীরিক অবস্থা | সাধারণত কোনো জ্বর বা কাঁপুনি থাকে না। | উচ্চমাত্রার জ্বর থাকে এবং শরীর প্রচণ্ড দুর্বল লাগে। |
| ব্যথা ও লালচে ভাব | উভয় স্তন ভারী মনে হয় এবং হালকা ব্যথা থাকে। | নির্দিষ্ট একটি স্তনের নির্দিষ্ট অংশে লাল হয়ে তীব্র ব্যথা হয়। |
| লক্ষণ প্রকাশের গতি | দুধ পান করালে স্তন ধীরে ধীরে হালকা হয়ে যায়। | লক্ষণগুলো খুব দ্রুত বাড়ে এবং দুধ পান করালেও ব্যথা কমে না। |
ইনফেকশন কমানোর প্রাথমিক ও ঘরোয়া উপায়
চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পাশাপাশি এই কাজগুলো দ্রুত আরাম দেবে:
গরম সেঁক (Warm Compress): বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর আগে ইনফেকশন হওয়া জায়গায় কুসুম গরম পানিতে ভেজানো তোয়ালে বা হট ওয়াটার ব্যাগ দিয়ে ১০-১৫ মিনিট সেঁক দিন। এতে বন্ধ নালী খুলে গিয়ে দুধ প্রবাহ স্বাভাবিক হয়।
নিয়মিত দুধ বের করা: ব্যথার ভয়ে অনেকেই দুধ পান করানো বন্ধ করে দেন, যা মারাত্মক ভুল! ইনফেকশন সারাতে হলে অবশ্যই বারবার বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে হবে অথবা ব্রেস্ট পাম্প (Breast Pump) দিয়ে দুধ বের করে স্তন খালি করতে হবে।
বিশ্রাম ও তরল খাবার: শরীরকে ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়তে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে এবং প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল খাবার খেতে হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. ব্রেস্ট ইনফেকশন থাকলে কি বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই! চিকিৎসকরা এই সময়ে বাচ্চাকে বেশি বেশি দুধ পান করাতে বলেন। মায়ের ইনফেকশনের কারণে বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয় না, বরং দুধ বের হয়ে গেলে মায়ের ব্যথা দ্রুত কমে যায়।
২. যারা মা হননি, তাদেরও কি ব্রেস্ট ইনফেকশন হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, পারে। একে পেরিডাক্টাল ম্যাস্টাইটিস (Periductal mastitis) বলা হয়। ধূমপান, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা বা নিপলে আঘাত লাগার কারণে এটি যে কারও হতে পারে।
৩. ব্রেস্ট ইনফেকশন কি নিজে নিজেই সেরে যায়?
উত্তর: যদি এটি শুধু দুধ জমার কারণে হয়, তবে সেঁক দিলে বা পাম্প করলে সেরে যেতে পারে। কিন্তু জ্বর ও লালচে ভাব থাকলে এটি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন, যা সারাতে অবশ্যই চিকিৎসকের প্রেসক্রাইব করা অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি স্তনে লালচে ভাব, তীব্র ব্যথা এবং জ্বর একটানা ২৪ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয়, তবে এক মুহূর্ত অবহেলা না করে দ্রুত একজন গাইনোকোলজিস্ট (Gynecologist) বা বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। অবহেলা করলে এটি স্তনে পুঁজ বা অ্যাবসেস তৈরি করতে পারে, যার জন্য সার্জারির প্রয়োজন হয়।