মাসিক হওয়ার প্রধান লক্ষণ ও পিরিয়ডের আগের শারীরিক পরিবর্তন

মাসিক বা পিরিয়ড নারীদের শরীরের একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক চক্র। প্রতি মাসে পিরিয়ড শুরুর কয়েক দিন আগে থেকে শরীরে ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রায় ব্যাপক ওঠানামা শুরু হয়। হরমোনের এই পরিবর্তনের কারণে মেয়েদের শরীরে এবং মনে বেশ কিছু আগাম সংকেত বা লক্ষণ প্রকাশ পায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পিরিয়ড শুরুর আগের এই লক্ষণগুলোকে একত্রে ‘প্রি-মেন্সট্রুয়াল সিনড্রোম’ (Premenstrual Syndrome) বা সংক্ষেপে PMS বলা হয়। এই লক্ষণগুলো একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ রয়েছে, যা দেখে খুব সহজেই বোঝা যায় যে মাসিক বা পিরিয়ডের সময় ঘনিয়ে এসেছে। চলুন, মাসিক হওয়ার প্রধান লক্ষণগুলো বিস্তারিত জেনে নিই।


মাসিক হওয়ার বা পিরিয়ডের প্রধান ৫টি লক্ষণ


মাসিক শুরুর সাধারণত ১ থেকে ২ সপ্তাহ আগে থেকে শরীরে নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে:
১. তলপেটে এবং কোমরে একটানা ব্যথা (Cramps)
পিরিয়ড আসার সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রধান লক্ষণ হলো তলপেটে ব্যথা বা ক্র্যাম্পিং। মাসিক শুরুর আগে জরায়ু তার ভেতরের আস্তরণ (Endometrium) খসিয়ে ফেলার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে এবং হালকা সংকুচিত হয়। এর ফলে তলপেটে চিনচিনে ব্যথা বা ভারী ভাব অনুভূত হয়, যা অনেক সময় কোমর এবং উরুর দিকেও ছড়িয়ে পড়ে।
২. স্তনে ব্যথা বা ভারী ভাব (Breast Tenderness)
হরমোনের পরিবর্তনের কারণে পিরিয়ড শুরুর কয়েক দিন আগে থেকেই স্তন কিছুটা ফুলে যায় এবং ভারী মনে হয়। এ সময় স্তন অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং সামান্য স্পর্শেই ব্যথা বা শিরশিরে অনুভূতি হতে পারে। পিরিয়ড শুরু হওয়ার পর এই ব্যথা নিজে থেকেই কমে যায়।
৩. মেজাজ খিটখিটে হওয়া বা মুড সুইং (Mood Swings)
মাসিক হওয়ার আগে মানসিক পরিবর্তনগুলো সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। এ সময় মস্তিষ্কে ‘সেরোটোনিন’ নামক কেমিক্যালের মাত্রা কমে যায়। এর ফলে বিনা কারণেই মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, হঠাৎ করে কান্না পাওয়া, অতিরিক্ত রাগ হওয়া বা চরম বিষণ্ণতা (Depression) কাজ করতে পারে।
৪. মুখে ব্রণ বা র‍্যাশ ওঠা (Acne Breakouts)
পিরিয়ড শুরুর আগে শরীরে তেলের গ্রন্থিগুলো (Sebaceous glands) অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে যায়। এর ফলে ত্বক অতিরিক্ত তৈলাক্ত হয়ে পড়ে এবং অনেকেরই থুতনি, গাল বা কপালে হঠাৎ করে ব্রণ বা ফুসকুড়ি উঠতে দেখা যায়। একে ‘হরমোনাল অ্যাকনে’ বলা হয়।
৫. হজমে সমস্যা এবং পেট ফাঁপা (Bloating)
হরমোনের ওঠানামার কারণে এ সময় শরীরে অতিরিক্ত পানি জমতে শুরু করে (Water retention)। এর ফলে পেট ফুলে থাকে বা ফাঁপা মনে হয়। এছাড়া অনেকের পিরিয়ড শুরুর ঠিক আগে আগে ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো হজমজনিত সমস্যা দেখা দেয় এবং অতিরিক্ত মিষ্টি বা টক খাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা (Food Cravings) তৈরি হয়।


এক নজরে পিএমএস (PMS) বা মাসিকের লক্ষণ


সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে মাসিকের শারীরিক ও মানসিক লক্ষণগুলো আলাদা করে দেওয়া হলো:

লক্ষণের ধরনপ্রকাশ পাওয়া সংকেত বা উপসর্গ
শারীরিক লক্ষণতলপেট ও কোমরে ব্যথা, স্তন ভারী হওয়া, ব্রণ, পেট ফাঁপা, এবং চরম ক্লান্তি।
মানসিক লক্ষণমুড সুইং, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, হঠাৎ কান্না পাওয়া, এবং ঘুমে ব্যাঘাত ঘটা।
খাদ্যাভ্যাসের লক্ষণহঠাৎ করে অতিরিক্ত মিষ্টি, চকলেট বা ফাস্ট ফুড খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা তৈরি হওয়া।


মাসিক বা পিরিয়ডের ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায়


মাসিকের আগের এই অস্বস্তিকর লক্ষণগুলো থেকে মুক্তি পেতে কিছু ঘরোয়া উপায় জাদুর মতো কাজ করে:
গরম সেঁক (Hot Compress): তলপেটে এবং কোমরে হট ওয়াটার ব্যাগ বা গরম পানির বোতল দিয়ে সেঁক দিলে জরায়ুর পেশি শিথিল হয় এবং ব্যথা দ্রুত কমে যায়।
পর্যাপ্ত পানি পান: পেট ফাঁপা এবং শরীর ফুলে যাওয়া রোধ করতে এ সময় প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল খাবার খেতে হবে।
লবণ ও ক্যাফেইন কমানো: পিরিয়ডের আগে অতিরিক্ত লবণাক্ত খাবার, চা বা কফি এড়িয়ে চললে স্তনের ব্যথা এবং মানসিক অস্থিরতা অনেকটাই কমে যায়।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. মাসিকের লক্ষণগুলো কতদিন আগে শুরু হয়?
উত্তর: সাধারণত মাসিক শুরুর ৫ থেকে ১১ দিন আগে এই লক্ষণগুলো (PMS) শুরু হয় এবং পিরিয়ড শুরু হওয়ার ১-২ দিনের মধ্যেই তা নিজে থেকে মিলিয়ে যায়।
২. সাদা স্রাব (White Discharge) হওয়া কি মাসিকের লক্ষণ?
উত্তর: হ্যাঁ। পিরিয়ড শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে যোনিপথের স্রাব কিছুটা ঘন, আঠালো এবং সাদাটে হয়ে যেতে পারে, যা মাসিক ঘনিয়ে আসার একটি স্বাভাবিক সংকেত।
৩. পিরিয়ডের সময় প্রচণ্ড ব্যথা হওয়া কি স্বাভাবিক?
উত্তর: হালকা থেকে মাঝারি ব্যথা হওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু ব্যথা যদি এতই তীব্র হয় যে দৈনন্দিন কাজকর্ম করা বা স্কুলে/অফিসে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে (Dysmenorrhea), তবে অবশ্যই একজন গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নিতে হবে।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি পিরিয়ড নিয়মিত না হয়, মাসের পর মাস বন্ধ থাকে বা অতিরিক্ত রক্তপাত হয়, তবে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *