শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও চিকিৎসা: ৫টি সতর্কতা

ডেঙ্গু (Dengue) এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ানো একটি মারাত্মক ভাইরাল জ্বর। বড়দের তুলনায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায়, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শিশুদের শারীরিক অবস্থার খুব দ্রুত অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে ডেঙ্গুর ‘শক সিনড্রোম’ শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে ডেঙ্গুকে অবহেলা করাটা যেকোনো বাবা-মায়ের জন্য চরম ভুলের কারণ হতে পারে। সঠিক সময়ে শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতন থাকলে এই মারাত্মক রোগের হাত থেকে শিশুকে নিরাপদে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। চলুন জেনে নিই, শিশুর শরীরে ডেঙ্গুর কোন সংকেতগুলো দেখলে দ্রুত সতর্ক হতে হবে।


শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের প্রধান ৫টি লক্ষণ


এডিস মশা কামড়ানোর সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে শিশুর শরীরে ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
হঠাৎ তীব্র জ্বর: ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো হঠাৎ করে শিশুর শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যাওয়া (১০৩-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত)। অনেক সময় জ্বরের সাথে কাঁপুনিও থাকতে পারে। (শিশুর জ্বর কতক্ষণ পর পর বাড়ছে বা কমছে, তা নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করার জন্য হাতের কাছে একটি ভালো মানের ডিজিটাল থার্মোমিটার (Digital Thermometer) রাখা এই সময়ে সবচেয়ে বেশি জরুরি)।
তীব্র মাথাব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা: শিশু প্রচণ্ড মাথাব্যথার কথা বলতে পারে এবং চোখের পেছনের অংশে তীব্র ব্যথা অনুভব করে, যার ফলে চোখের নাড়াচাড়ায় কষ্ট হয়।
সারা শরীর ও জয়েন্টে প্রচণ্ড ব্যথা: ডেঙ্গু জ্বরকে ‘ব্রেকবোন ফিভার’ (হাড়ভাঙা জ্বর) বলা হয়। কারণ এই জ্বরে শিশুর সারা শরীর, পেশি এবং জয়েন্টে বা গিরায় প্রচণ্ড ব্যথা থাকে। (বড় শিশুদের ক্ষেত্রে পেশির এই একটানা অস্বস্তিকর ব্যথা উপশম করতে চিকিৎসকের পরামর্শে হালকা স্পিডে একটি বডি ম্যাসাজার (Body Massager) বা হিটিং প্যাড (Heating Pad) ব্যবহার করলে তারা বেশ আরাম পায় ও ঘুমাতে পারে)।
ত্বকে লালচে র‍্যাশ বা দানা: জ্বর শুরু হওয়ার ৩-৪ দিন পর শিশুর বুকে, পিঠে বা হাত-পায়ে হামের মতো ছোট ছোট লালচে র‍্যাশ (Rash) দেখা দিতে পারে এবং শরীর চুলকাতে পারে।
বমি বমি ভাব ও খাবারে অরুচি: শিশুর পেটে ব্যথা থাকতে পারে, সে কিছুই খেতে চায় না এবং বারবার বমি করতে পারে। শরীর প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে।


ডেঙ্গু নাকি সাধারণ জ্বর? (পার্থক্য বুঝুন)


লক্ষণের ধরনসাধারণ ভাইরাল জ্বরডেঙ্গু জ্বরের সংকেত
জ্বরের ধরনজ্বর সাধারণত ১০০-১০১ ডিগ্রির মধ্যে থাকে এবং ২-৩ দিনে কমে যায়।হঠাৎ করে ১০৩-১০৪ ডিগ্রি তীব্র জ্বর আসে এবং প্যারাসিটামলেও কমতে চায় না।
সর্দি-কাশিসাধারণত জ্বরের সাথে সর্দি, কাশি এবং গলা ব্যথা থাকে।ডেঙ্গুতে সাধারণত সর্দি বা কাশি থাকে না।
ব্যথার ধরনশরীর ম্যাজম্যাজ করে বা হালকা দুর্বলতা থাকে।চোখের পেছনে, মাথায় এবং হাড়ে প্রচণ্ড তীব্র ব্যথা থাকে।


শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের ঘরোয়া চিকিৎসা ও সতর্কতা


ডেঙ্গু ভাইরাসের সরাসরি কোনো ওষুধ বা অ্যান্টিভাইরাল নেই। লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা এবং সাপোর্টিভ কেয়ারই হলো এর প্রধান সমাধান:
প্রচুর তরল খাবার দেওয়া: ডেঙ্গুতে রক্তের প্লাজমা কমে যায়, তাই শিশুকে প্রচুর পরিমাণে খাওয়ার স্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস, স্যুপ এবং তরল খাবার খাওয়াতে হবে। এটি ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় চিকিৎসা।
প্যারাসিটামল সেবন: জ্বর এবং ব্যথা কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শুধুমাত্র ‘প্যারাসিটামল’ (Paracetamol) সিরাপ বা ওষুধ খাওয়াতে হবে।
ব্যথার ওষুধ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ: ডেঙ্গু জ্বরে শিশুকে কোনোভাবেই অ্যাসপিরিন (Aspirin), আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) বা ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ব্যথার ওষুধ খাওয়ানো যাবে না। এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম: শিশুকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে মশারির ভেতর রাখতে হবে এবং বাইরে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখতে হবে।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. ডেঙ্গুর বিপদচিহ্ন (Warning signs) কোনগুলো?
উত্তর: শিশুর দাঁতের মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া, মলের সাথে রক্ত যাওয়া, প্রচণ্ড পেট ব্যথা হওয়া, অনবরত বমি হওয়া, শরীর অতিরিক্ত ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এবং ৬ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে প্রস্রাব না হওয়া—এগুলো ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা শক সিনড্রোমের মারাত্মক বিপদচিহ্ন।
২. বিপদচিহ্ন দেখা দিলে কী করতে হবে?
উত্তর: এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলেই আর এক মুহূর্তও বাসায় অপেক্ষা করা যাবে না। শিশুকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে শিরাপথে স্যালাইন এবং প্রয়োজনে রক্ত বা প্লাজমা দিতে হবে।
৩. ডেঙ্গু জ্বর হলে কি শিশুকে গোসল করানো যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, ডেঙ্গু হলে গোসল করাতে কোনো নিষেধ নেই। বরং হালকা কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করালে বা শিশুর শরীর স্পঞ্জ করে দিলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমতে সাহায্য করে।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য তৈরি করা হয়েছে। ডেঙ্গু জ্বরের ২ থেকে ৩ দিন পর যখন জ্বর কমতে শুরু করে, তখনই মূলত রক্তে প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা আশঙ্কাজনকভাবে কমতে পারে এবং জটিলতা শুরু হয়। তাই জ্বর কমার সময়টিতেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে। শিশুর জ্বর ১০১ ডিগ্রির বেশি হলে বা ডেঙ্গুর সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ‘সিবিসি’ (CBC) এবং ডেঙ্গু এনএস১ (NS1) রক্ত পরীক্ষাটি করিয়ে নিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *