গর্ভাবস্থায় প্রতিটি মায়ের জন্য সবচেয়ে জাদুকরী ও আবেগঘন মুহূর্ত হলো প্রথমবারের মতো গর্ভস্থ সন্তানের হার্টবিট বা হৃদস্পন্দন শোনা। প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ আসার পর থেকেই মায়েরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন এই দিনটির জন্য। অনেকেই জানতে চান, বাচ্চার হার্টবিট বা প্রাণ আসার কোনো শারীরিক লক্ষণ আছে কি না, যা দেখে মা নিজে থেকেই বুঝতে পারবেন।
আমাদের সমাজে এ নিয়ে অনেক প্রচলিত ধারণা থাকলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তব সত্যটি একটু ভিন্ন। চলুন, গর্ভস্থ শিশুর হার্টবিট তৈরি হওয়ার সঠিক সময়, এটি বোঝার উপায় এবং প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।
বাচ্চার হার্টবিট আসার কি কোনো শারীরিক লক্ষণ আছে?
বাস্তবতা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, বাচ্চার হার্টবিট আসার এমন কোনো সুনির্দিষ্ট শারীরিক লক্ষণ নেই, যা একজন মা বাইরে থেকে অনুভব করতে পারেন। অনেকেই মনে করেন, পেটের ভেতর হঠাৎ করে ‘ধুকপুক’ বা পালস অনুভব করা বাচ্চার হার্টবিটের লক্ষণ। এটি একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে রক্ত চলাচল অনেক বেড়ে যায়, তাই পেটে যে পালস বা ধুকপুকানি অনুভূত হয়, তা মূলত মায়ের নিজেরই পেটের প্রধান রক্তনালীর (Aorta) স্পন্দন, বাচ্চার নয়। বাচ্চার হার্টবিট এতোটাই সূক্ষ্ম থাকে যে আধুনিক আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন ছাড়া বাইরে থেকে তা কোনোভাবেই অনুভব করা সম্ভব নয়।
তবে হার্টবিট আসার সময়ে গর্ভাবস্থার অন্যান্য সাধারণ লক্ষণগুলো (যেমন: বমি ভাব, স্তনে ব্যথা, ক্লান্তি) তীব্র হতে পারে, কারণ এই সময়ে প্রেগন্যান্সি হরমোনের (hCG) মাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে। কিন্তু এগুলো সরাসরি হার্টবিটের কোনো লক্ষণ নয়।
গর্ভস্থ শিশুর হার্টবিট কখন তৈরি হয়?
মায়ের শেষ মাসিকের প্রথম দিন (LMP) থেকে হিসাব করলে, সাধারণত গর্ভাবস্থার ৫ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে ভ্রূণের হার্ট বা হৃদপিণ্ড গঠিত হতে শুরু করে এবং স্পন্দন চালু হয়।
প্রথমদিকে এই স্পন্দন বেশ ধীর থাকে, তবে ৭ থেকে ৯ সপ্তাহের মধ্যে তা বেড়ে মিনিটে ১১০ থেকে ১৬০ বিট (bpm) পর্যন্ত পৌঁছায়, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হার্টবিটের প্রায় দ্বিগুণ।
হার্টবিট কীভাবে এবং কখন শোনা যায়?
যেহেতু বাইরে থেকে কোনো লক্ষণ বোঝা যায় না, তাই হার্টবিট নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো ডাক্তারি পরীক্ষা:
১. ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসাউন্ড (TVS)
গর্ভাবস্থার একদম শুরুতে, অর্থাৎ ৫ থেকে ৬ সপ্তাহের দিকে পেটের ওপর থেকে করা আল্ট্রাসাউন্ডে অনেক সময় হার্টবিট ধরা পড়ে না। তখন চিকিৎসকরা যোনিপথে বা ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসাউন্ড (TVS) করে থাকেন, যা দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রাথমিক হার্টবিট দেখা ও শোনা যায়।
২. অ্যাবডোমিনাল আল্ট্রাসাউন্ড (পেটের আল্ট্রাসাউন্ড)
গর্ভাবস্থার ৭ থেকে ৮ সপ্তাহ পার হওয়ার পর সাধারণ পেটের আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমেই খুব স্পষ্টভাবে বাচ্চার হার্টবিট দেখা এবং শোনা সম্ভব।
৩. ফেটাল ডপলার (Fetal Doppler)
গর্ভাবস্থার ১০ থেকে ১২ সপ্তাহ পার হওয়ার পর চিকিৎসকরা একটি ছোট যন্ত্র মায়ের পেটের ওপর ধরে বাচ্চার হার্টবিট শোনান। এই যন্ত্রটিকে ফেটাল ডপলার বলা হয়।
এক নজরে হার্টবিটের সময়কাল ও পরীক্ষা
| গর্ভাবস্থার সময়কাল | হার্টবিটের অবস্থা ও পরীক্ষা |
| ৫ – ৬ সপ্তাহ | স্পন্দন শুরু হয়। ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসাউন্ড (TVS)-এ ধরা পড়ে। |
| ৭ – ৮ সপ্তাহ | হার্টবিট স্পষ্ট হয় (১১০-১৬০ bpm)। পেটের আল্ট্রাসাউন্ডে শোনা যায়। |
| ১০ – ১২ সপ্তাহ | হার্টবিট অনেক শক্তিশালী হয়। ফেটাল ডপলার যন্ত্র দিয়ে শোনা যায়। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. ৬ সপ্তাহে আল্ট্রাসাউন্ড করে হার্টবিট না পেলে কি বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেছে?
উত্তর: না, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। অনেকের ওভিউলেশন বা ডিম্বস্ফোটন দেরিতে হয়, ফলে হিসাব অনুযায়ী ৬ সপ্তাহ হলেও বাচ্চার বয়স হয়তো আরও কম থাকে। চিকিৎসকরা সাধারণত ১-২ সপ্তাহ পর পুনরায় আল্ট্রাসাউন্ড করার পরামর্শ দেন।
২. পেটে হাত দিয়ে কি বাচ্চার হার্টবিট বোঝা যায়?
উত্তর: একদমই না। গর্ভস্থ শিশুর অবস্থান জরায়ুর অনেক গভীরে এবং অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের (পানির) ভেতর থাকে। তাই পেটে হাত দিয়ে বা কান পেতে এটি শোনা অসম্ভব।
৩. গর্ভাবস্থায় বাচ্চার স্বাভাবিক হার্টবিট কত হওয়া উচিত?
উত্তর: গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময়ে বাচ্চার স্বাভাবিক হার্টবিট মিনিটে ১১০ থেকে ১৬০ বার (110-160 bpm) হয়ে থাকে।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। ইন্টারনেটে পড়ে বা কারও কথায় আতঙ্কিত না হয়ে, গর্ভাবস্থার ৬-৮ সপ্তাহের মধ্যে অবশ্যই আপনার গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী একটি ডেটিং আল্ট্রাসাউন্ড (Dating Scan) করিয়ে বাচ্চার সুস্থতা এবং হার্টবিট নিশ্চিত করুন।