মেয়েদের থাইরয়েড রোগের প্রধান লক্ষণ ও করণীয়

থাইরয়েড গলার সামনের দিকে অবস্থিত প্রজাপতি আকৃতির একটি ছোট গ্রন্থি, যা আমাদের শরীরের মেটাবলিজম বা হজম প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে এনার্জি লেভেল, হার্টবিট এবং হরমোনের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৫ থেকে ৮ গুণ বেশি।
থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে হরমোন উৎপাদন স্বাভাবিকের চেয়ে কমে গেলে বা বেড়ে গেলে শরীরে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। অনেক নারীই প্রথমদিকে এর লক্ষণগুলো বুঝতে পারেন না বলে দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক কষ্টে ভোগেন। চলুন, মেয়েদের থাইরয়েড রোগের প্রধান লক্ষণগুলো এবং এর ধরন বিস্তারিত জেনে নিই।


থাইরয়েড রোগের প্রধান দুটি ধরন


রক্তে থাইরয়েড হরমোনের (T3, T4) মাত্রার ওপর ভিত্তি করে থাইরয়েড রোগকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। ধরন অনুযায়ী এর লক্ষণগুলোও সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে থাকে:
হাইপোথাইরয়েডিজম (Hypothyroidism): থাইরয়েড গ্রন্থি যখন শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি করতে পারে না, তখন তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বা ‘আন্ডারঅ্যাক্টিভ থাইরয়েড’ বলা হয়। আমাদের দেশে বেশিরভাগ নারীই মূলত এই সমস্যায় বেশি ভোগেন।
হাইপারথাইরয়েডিজম (Hyperthyroidism): থাইরয়েড গ্রন্থি যখন অতিরিক্ত মাত্রায় হরমোন তৈরি করতে শুরু করে, তখন তাকে হাইপারথাইরয়েডিজম বা ‘ওভারঅ্যাক্টিভ থাইরয়েড’ বলা হয়।
হাইপোথাইরয়েডিজম (হরমোন কমে যাওয়া) এর লক্ষণ
শরীরে থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি দেখা দিলে মেটাবলিজম ধীর হয়ে যায় এবং নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:
১. হঠাৎ এবং অকারণে ওজন বেড়ে যাওয়া
হাইপোথাইরয়েডিজমের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে ওজন বেড়ে যাওয়া। রোগী পরিমিত খাবার খাওয়া এবং ডায়েট করার পরও তার ওজন কমতে চায় না, বরং শরীর ফুলে যায়।
২. অতিরিক্ত ক্লান্তি ও সারাক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব
পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও শরীর সারাক্ষণ ম্যাজ ম্যাজ করে এবং চরম ক্লান্তি কাজ করে। সামান্য ঘরের কাজ বা হাঁটাচলা করলেই রোগী হাঁপিয়ে ওঠেন এবং সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করে।
৩. অনিয়মিত পিরিয়ড বা মাসিক
থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি মেয়েদের প্রজননতন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এর ফলে পিরিয়ড বা মাসিক অনিয়মিত হয়ে যায়, অতিরিক্ত রক্তপাত হয় অথবা পিরিয়ডের সময় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ব্যথা অনুভূত হয়। এটি পরবর্তীতে গর্ভধারণেও সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
৪. অতিরিক্ত চুল পড়া ও ত্বক রুক্ষ হওয়া
হঠাৎ করে মাথার চুল অস্বাভাবিক হারে পড়তে শুরু করে এবং চুল পাতলা হয়ে যায়। পাশাপাশি ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা হারিয়ে ত্বক মারাত্মক রুক্ষ ও খসখসে হয়ে পড়ে।
৫. তীব্র শীত শীত ভাব ও বিষণ্ণতা
হরমোন কমে গেলে শরীর পর্যাপ্ত তাপ উৎপাদন করতে পারে না। ফলে সাধারণ তাপমাত্রাতেও রোগীর প্রচণ্ড শীত লাগে। এর সাথে তীব্র মানসিক অবসাদ, বিষণ্ণতা (Depression) এবং অকারণে কান্নাকাটি করার প্রবণতা দেখা দেয়।


হাইপারথাইরয়েডিজম (হরমোন বেড়ে যাওয়া) এর লক্ষণ


শরীরে থাইরয়েড হরমোনের পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে শরীরের ভেতরের ইঞ্জিন অত্যন্ত দ্রুত চলতে শুরু করে, যার ফলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়:
১. অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস
রোগী আগের চেয়ে বেশি খাবার খেলেও এবং খাদ্যাভ্যাস স্বাভাবিক থাকলেও খুব দ্রুত তার শরীরের ওজন কমতে শুরু করে এবং শরীর শুকিয়ে যায়।
২. বুক ধড়ফড় করা ও অস্থিরতা
কোনো ভারী কাজ বা পরিশ্রম না করলেও রোগীর হার্টবিট অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় বা বুক ধড়ফড় করে (Palpitations)। রোগী সারাক্ষণ একধরনের মানসিক অস্থিরতা, উদ্বেগ বা নার্ভাসনেসে ভোগেন এবং সামান্য কথায় রেগে যান।
৩. অতিরিক্ত ঘাম ও গরম লাগা
মেটাবলিজম বেড়ে যাওয়ার কারণে রোগীর শরীর সারাক্ষণ অতিরিক্ত তাপ উৎপাদন করে। ফলে ফ্যানের নিচে বা এসির ভেতরে বসে থাকলেও রোগীর প্রচুর ঘাম হয় এবং স্বাভাবিক আবহাওয়াতেও প্রচণ্ড গরম লাগে।
৪. পিরিয়ড বা মাসিক কমে যাওয়া
এই ক্ষেত্রে মেয়েদের পিরিয়ডের সাইকেল এলোমেলো হয়ে যায়। পিরিয়ডের সময় রক্তপাত অত্যন্ত কম হয় এবং অনেক সময় দুই-তিন মাস পর পর পিরিয়ড হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
৫. ইনসোমনিয়া বা ঘুম না হওয়া
অতিরিক্ত হরমোনের কারণে মস্তিষ্ক সারাক্ষণ সজাগ থাকে, যার ফলে রাতে রোগীর ঠিকমতো ঘুম হয় না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করলেও সহজে ঘুম আসতে চায় না।


এক নজরে থাইরয়েডের দুই ধরনের পার্থক্য


সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে হাইপো এবং হাইপার থাইরয়েডিজমের মূল পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হলো:

লক্ষণের ধরনহাইপোথাইরয়েডিজম (হরমোন কম)হাইপারথাইরয়েডিজম (হরমোন বেশি)
ওজনের পরিবর্তনদ্রুত ওজন বৃদ্ধি পায় ও শরীর ফোলে।দ্রুত ওজন কমে যায় ও শরীর শুকায়।
তাপমাত্রার প্রভাবসবসময় অতিরিক্ত শীত লাগে।সবসময় অতিরিক্ত গরম লাগে ও ঘাম হয়।
মানসিক অবস্থাবিষণ্ণতা, ভুলে যাওয়া ও অলসতা কাজ করে।অতিরিক্ত অস্থিরতা, উদ্বেগ ও রাগ হয়।
মাসিকের সমস্যাঅতিরিক্ত রক্তপাত বা দীর্ঘস্থায়ী মাসিক হয়।রক্তপাত খুব কম হয় বা অনেক দিন বন্ধ থাকে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)

১. থাইরয়েড থাকলে কি গর্ভধারণ বা বাচ্চা নিতে সমস্যা হয়? উত্তর: হ্যাঁ, থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা মেয়েদের ডিম্বাণু তৈরিতে বাধা দেয় এবং পিরিয়ড অনিয়মিত করে, যার ফলে গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক মাত্রার ওষুধ খেয়ে হরমোন নিয়ন্ত্রণে রাখলে একজন থাইরয়েড রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক বাচ্চার জন্ম দিতে পারেন।

২. থাইরয়েড রোগ কি পুরোপুরি ভালো হয়? উত্তর: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে থাইরয়েড (বিশেষ করে হাইপোথাইরয়েডিজম) চিরতরে নির্মূল হওয়ার মতো রোগ নয়। তবে এটি ১০০% নিয়ন্ত্রণযোগ্য। নিয়মিত সঠিক মাত্রার হরমোন ওষুধ (যেমন- থাইরক্সিন) সেবন করলে রোগী একদম সুস্থ মানুষের মতোই জীবনযাপন করতে পারেন।

৩. থাইরয়েডের রোগীরা কি ফুলকপি বা বাঁধাকপি খেতে পারবেন? উত্তর: কাঁচা বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি বা সয়াবিনে ‘গয়ট্রোজেন’ (Goitrogen) নামক উপাদান থাকে, যা থাইরয়েড গ্রন্থির কাজে বাধা দিতে পারে। তাই থাইরয়েড রোগীদের এগুলো কাঁচা বা সালাদ হিসেবে খাওয়া নিষেধ। তবে ভালোভাবে সেদ্ধ করে বা উচ্চতাপে রান্না করে খেলে এগুলো থাইরয়েডের আর কোনো ক্ষতি করে না।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। ওপরের লক্ষণগুলোর একাধিক আপনার মধ্যে দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত একজন এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট (Endocrinologist) বা হরমোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষার (TSH, Free T3, Free T4) মাধ্যমেই থাইরয়েডের সমস্যা নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *