নখ দেখে রোগ চেনার উপায়: নখের রং ও আকৃতির ৬টি সংকেত

হাতের নখ সুন্দর রাখতে আমরা কত কিছুই না করি! কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনার হাতের এই নখ শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মারাত্মক সব রোগের আগাম সংকেত দিতে পারে? চিকিৎসকরা অনেক সময় রোগীর চোখ এবং জিভের পাশাপাশি হাতের নখ পরীক্ষা করে ভেতরের রোগের ধারণা পেয়ে যান।
সুস্থ মানুষের নখ সাধারণত মসৃণ, হালকা গোলাপি রঙের এবং দাগমুক্ত হয়। কিন্তু নখের রং ফ্যাকাশে হয়ে গেলে বা আকৃতিতে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন এলে তা লিভার, ফুসফুস বা হার্টের রোগের লক্ষণ হতে পারে। চলুন, নখের রং এবং আকৃতি দেখে শরীরের ভেতরের রোগ চেনার উপায়গুলো বিস্তারিত জেনে নিই।


নখ দেখে রোগ চেনার প্রধান ৬টি উপায়


নখের বিভিন্ন অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং এর পেছনের সম্ভাব্য রোগগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ফ্যাকাশে বা সাদা নখ (Pale or White Nails)
সুস্থ নখের রং গোলাপি হয়। কিন্তু নখ যদি পুরোপুরি ফ্যাকাশে বা সাদাটে হয়ে যায়, তবে এটি মারাত্মক রক্তশূন্যতা (Anemia) বা অপুষ্টির লক্ষণ। এছাড়া নখের বেশিরভাগ অংশ সাদা এবং কেবল সামনের দিকে হালকা গোলাপি বর্ডার থাকলে, তা লিভারের বড় কোনো সমস্যা, যেমন- জন্ডিস বা হেপাটাইটিসের সংকেত হতে পারে।
২. চামচের মতো দেবে যাওয়া নখ (Spoon Nails)
নখ যদি মাঝখানের দিকে গর্ত হয়ে চামচের মতো দেবে যায়, তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘কয়লোনাইকিয়া’ (Koilonychia) বলা হয়। এটি শরীরে আয়রনের মারাত্মক ঘাটতির একটি প্রধান লক্ষণ। রক্তশূন্যতা ছাড়াও হার্টের সমস্যা বা লিভারের অতিরিক্ত আয়রন জমার কারণেও নখ এমন হতে পারে।
৩. নীলচে নখ (Bluish Nails)
নখের রং হঠাৎ করে নীল বা বেগুনি হয়ে যাওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘সায়ানোসিস’ (Cyanosis) বলে। এটি শরীরে অক্সিজেনের চরম অভাবের সংকেত দেয়। ফুসফুসের মারাত্মক কোনো ইনফেকশন, অ্যাজমা বা হার্টের সমস্যার কারণে রক্তে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না থাকলে নখের রং এমন নীলচে হয়ে যায়।
৪. নখে হলদেটে ভাব (Yellow Nails)
নখ হলুদ এবং মোটা হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো ‘ফাঙ্গাল ইনফেকশন’ বা ছত্রাকের আক্রমণ। তবে ইনফেকশন ছাড়াও দীর্ঘমেয়াদী থাইরয়েডের সমস্যা, ফুসফুসের রোগ বা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণেও অনেক সময় নখের রং হলদেটে হয়ে যেতে পারে।
৫. নখে কালো বা বাদামি রেখা (Dark Lines)
নখের নিচে যদি লম্বালম্বি কোনো কালো বা গাঢ় বাদামি রঙের দাগ দেখা যায়, তবে তা অবহেলা করা মারাত্মক বোকামি হতে পারে। এটি অনেক সময় ‘মেলানোমা’ (Melanoma) নামক একধরনের ভয়ংকর স্কিন ক্যান্সারের লক্ষণ। অবশ্য নখে ভারী কিছুর আঘাত লাগলেও রক্ত জমাট বেঁধে এমন দাগ হতে পারে।
৬. ছোট ছোট গর্তযুক্ত নখ (Pitted Nails)
নখের ওপরে যদি সুচ বা পিন ফোটানোর মতো ছোট ছোট গর্ত দেখা যায়, তবে এটি ত্বকের রোগ ‘সোরিয়াসিস’ (Psoriasis) এর প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। এছাড়া হাড়ের জয়েন্টের প্রদাহ বা আর্থ্রাইটিস রোগীদের ক্ষেত্রেও নখে এমন ছোট ছোট গর্ত দেখা যায়।


এক নজরে নখের ধরন ও সম্ভাব্য রোগ


সহজে মনে রাখার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে নখের ধরন এবং এর পেছনের সম্ভাব্য রোগগুলো তুলে ধরা হলো:

নখের অবস্থা ও রংশরীরের ভেতরের সম্ভাব্য রোগ বা সমস্যা
ফ্যাকাশে সাদা নখরক্তশূন্যতা (অ্যানিমিয়া), লিভারের রোগ বা জন্ডিস।
চামচের মতো দেবে যাওয়াশরীরে আয়রনের তীব্র ঘাটতি বা পুষ্টিহীনতা।
নীলচে নখরক্তে অক্সিজেনের অভাব, ফুসফুস বা হার্টের রোগ।
হলুদ ও মোটা নখফাঙ্গাল ইনফেকশন, থাইরয়েড বা ফুসফুসের সমস্যা।
নখে কালো দাগনখে আঘাত বা স্কিন ক্যান্সার (মেলানোমা)।
ভঙ্গুর বা সহজে ভেঙে যাওয়াক্যালসিয়াম বা বায়োটিনের (ভিটামিন বি৭) অভাব।


কীভাবে নখ সুস্থ রাখবেন?


সুষম খাদ্য গ্রহণ: নখ মূলত ‘কেরাটিন’ নামক প্রোটিন দিয়ে তৈরি। তাই খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং জিংক যুক্ত খাবার (যেমন- ডিম, দুধ, মাংস, সবুজ শাকসবজি) রাখতে হবে।
আর্দ্রতা ধরে রাখা: নখ অতিরিক্ত শুষ্ক হলে তা দ্রুত ভেঙে যায়। তাই নিয়মিত নখে এবং নখের চারপাশের চামড়ায় ময়েশ্চারাইজার বা নারিকেল তেল ম্যাসাজ করুন।
কেমিক্যাল থেকে দূরে থাকা: অতিরিক্ত নেইলপলিশ, রিমুভার বা কাপড় কাচার ডিটারজেন্ট নখের মারাত্মক ক্ষতি করে। এসব কেমিক্যাল ব্যবহারের পর হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। নখের রং বা আকৃতিতে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলেই তা বড় কোনো রোগ বলে আতঙ্কিত হবেন না। যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার আগে অবশ্যই একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ (Dermatologist) বা মেডিসিন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *