ডিম্বাণু বের হওয়ার ৫টি প্রধান লক্ষণ ও সঠিক সময়

নারীদের মাসিক চক্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো ‘ওভিউলেশন’ (Ovulation) বা ডিম্বস্ফোটন। প্রতি মাসে নারীর যেকোনো একটি ডিম্বাশয় (Ovary) থেকে একটি পরিণত ডিম্বাণু বের হয়ে ফ্যালোপিয়ান টিউবে আসে এবং পুরুষের শুক্রাণুর জন্য অপেক্ষা করে। গর্ভধারণের জন্য এই সময়টিই হলো সবচেয়ে উপযুক্ত।
সাধারণত যাদের মাসিক চক্র ২৮ দিনের, তাদের ক্ষেত্রে মাসিকের ১৪তম দিনের দিকে ডিম্বাণু রিলিজ হয়। ডিম্বাণু বের হওয়ার ঠিক আগে ও পরে হরমোনের ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে শরীরে কিছু স্পষ্ট সংকেত বা লক্ষণ প্রকাশ পায়। এই লক্ষণগুলো জানা থাকলে একজন নারী খুব সহজেই নিজের ‘ফার্টাইল উইন্ডো’ বা গর্ভধারণের সবচেয়ে উর্বর সময়টি বুঝতে পারেন। চলুন, ডিম্বাণু বের হওয়ার প্রধান লক্ষণগুলো বিস্তারিত জেনে নিই।


ডিম্বাণু বের হওয়ার প্রধান ৫টি লক্ষণ


ওভিউলেশন বা ডিম্বাণু বের হওয়ার কয়েক দিন আগে থেকে শরীর মূলত নিচের লক্ষণগুলোর মাধ্যমে সংকেত দিতে শুরু করে:
১. সার্ভিকাল মিউকাস বা সাদা স্রাবের পরিবর্তন
ডিম্বাণু রিলিজ হওয়ার সবচেয়ে বড় এবং স্পষ্ট লক্ষণ হলো যোনিপথের স্রাবের পরিবর্তন। ওভিউলেশনের ঠিক আগে আগে শরীরের ইস্ট্রোজেন হরমোন বেড়ে যায়, যার ফলে সাদা স্রাব (Cervical mucus) একদম কাঁচা ডিমের সাদা অংশের মতো স্বচ্ছ, আঠালো এবং পিচ্ছিল হয়ে যায়। এই পিচ্ছিল স্রাব শুক্রাণুকে দ্রুত জরায়ুর ভেতরে সাঁতার কাটতে সাহায্য করে।
২. তলপেটের একপাশে হালকা বা চিনচিনে ব্যথা
ডিম্বাণু যখন ডিম্বাশয় বা ওভারি থেকে ফেটে বেরিয়ে আসে, তখন অনেক নারী তলপেটের ডান বা বাম পাশে (যেপাশের ওভারি থেকে ডিম্বাণু আসে) হালকা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘মিটেলসমারজ’ (Mittelschmerz) বা ওভিউলেশন পেইন বলা হয়। এই ব্যথা কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
৩. শরীরের বেসাল তাপমাত্রা (BBT) বৃদ্ধি পাওয়া
বিশ্রামরত অবস্থায় শরীরের যে স্বাভাবিক তাপমাত্রা থাকে, তাকে বেসাল বডি টেম্পারেচার (BBT) বলে। ডিম্বাণু রিলিজ হওয়ার পরপরই শরীরে ‘প্রোজেস্টেরন’ হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে শরীরের বেসাল তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ০.৫ থেকে ১ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত বেড়ে যায় এবং পরবর্তী মাসিক না হওয়া পর্যন্ত এই তাপমাত্রা বেশিই থাকে।
৪. স্তনে হালকা ব্যথা বা সংবেদনশীলতা
হরমোনের এই আকস্মিক ওঠানামার কারণে ওভিউলেশনের সময় বা তার ঠিক পরপরই অনেক নারীর স্তনে হালকা ব্যথা, ভারী ভাব বা চরম সংবেদনশীলতা (Breast tenderness) অনুভূত হয়। এটি অনেকটা মাসিক শুরুর আগের ব্যথার মতোই মনে হতে পারে।
৫. যৌন আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি ও ঘ্রাণশক্তি প্রখর হওয়া
প্রকৃতিগতভাবেই ডিম্বাণু বের হওয়ার সময় অর্থাৎ গর্ভধারণের সবচেয়ে অনুকূল সময়ে নারীদের যৌন আকাঙ্ক্ষা বা লিবিডো (Libido) প্রাকৃতিকভাবেই বেড়ে যায়। এছাড়া হরমোনের প্রভাবে এই কয়েকদিন ঘ্রাণশক্তি এবং স্বাদ নেওয়ার ক্ষমতা অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রখর হয়।


এক নজরে মাসিক চক্র ও ডিম্বস্ফোটনের সময়


সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে ২৮ দিনের একটি আদর্শ মাসিক চক্রের বিভিন্ন ধাপ তুলে ধরা হলো:

মাসিক চক্রের সময়কালশারীরিক অবস্থা ও ডিম্বাণুর অবস্থানগর্ভধারণের সম্ভাবনা
১ম থেকে ৫ম দিনপিরিয়ড বা মাসিক চলাকালীন সময়।সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
৬ষ্ঠ থেকে ১০ম দিনডিম্বাশয়ে নতুন ডিম্বাণু পরিণত হতে শুরু করে।সম্ভাবনা খুবই কম।
১১তম থেকে ১৫তম দিনওভিউলেশন ফেজ বা ডিম্বাণু বের হওয়ার সময়।গর্ভধারণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি (ফার্টাইল উইন্ডো)।
১৬তম থেকে ২৮তম দিনডিম্বাণু নিষিক্ত না হলে তা নষ্ট হয়ে যায়।সম্ভাবনা নেই।

ওভিউলেশন বা ডিম্বাণু বের হওয়া ট্র্যাক করার সহজ উপায়


লক্ষণ ছাড়াও কিছু আধুনিক উপায়ে ডিম্বাণু বের হওয়ার সময় নির্ভুলভাবে জানা যায়:
ওভিউলেশন প্রেডিক্টর কিট (OPK): এটি প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিটের মতোই প্রস্রাব দিয়ে পরীক্ষা করতে হয়। ওভিউলেশনের ১২-৩৬ ঘণ্টা আগে প্রস্রাবে ‘লুটিনাইজিং হরমোন’ (LH) বেড়ে যায়, যা এই কিটের মাধ্যমে সহজে ধরা পড়ে।
পিরিয়ড ট্র্যাকার অ্যাপ: স্মার্টফোনে বিভিন্ন পিরিয়ড ট্র্যাকিং অ্যাপ ব্যবহার করে মাসিকের তারিখ ইনপুট দিলে, অ্যাপটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওভিউলেশনের সম্ভাব্য দিনগুলো জানিয়ে দেয়।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. রিলিজ হওয়ার পর ডিম্বাণু কতক্ষণ বেঁচে থাকে?
উত্তর: ডিম্বাশয় থেকে বের হওয়ার পর একটি ডিম্বাণু ফ্যালোপিয়ান টিউবে মাত্র ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকে। তবে পুরুষের শুক্রাণু নারীর শরীরে ৩ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
২. ডিম্বাণু বের হওয়ার সময় কি রক্তপাত হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ। কিছু কিছু নারীর ক্ষেত্রে ডিম্বাণু রিলিজ হওয়ার সময় স্রাবের সাথে হালকা গোলাপি বা বাদামি রঙের রক্তের ছিটেফোঁটা দেখা যেতে পারে, যাকে ‘ওভিউলেশন স্পটিং’ (Ovulation spotting) বলা হয়। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
৩. মাসিক অনিয়মিত হলে ডিম্বাণু বের হওয়ার সময় কীভাবে বুঝব?
উত্তর: যাদের মাসিক অনিয়মিত, তাদের ক্ষেত্রে দিন গুনে ওভিউলেশন বের করা কঠিন। তাদের জন্য স্রাবের পরিবর্তন খেয়াল রাখা এবং ‘ওভিউলেশন প্রেডিক্টর কিট’ ব্যবহার করা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। আপনি যদি একটানা এক বছর (বয়স ৩৫ এর বেশি হলে ৬ মাস) চেষ্টা করার পরও গর্ভধারণ করতে না পারেন, তবে অবশ্যই একজন গাইনোকোলজিস্ট বা ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *