আমাদের পেটের ডান দিকের নিচের অংশে বৃহদান্ত্রের সাথে যুক্ত ছোট একটি আঙুল আকৃতির থলি থাকে, যাকে ‘এপেন্ডিক্স’ (Appendix) বলা হয়। কোনো কারণে এই থলিতে খাবার বা মল আটকে ইনফেকশন তৈরি হলে তা ফুলে ওঠে এবং প্রচণ্ড ব্যথার সৃষ্টি করে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একেই ‘এপেন্ডিসাইটিস’ বলা হয়।
মেয়েদের ক্ষেত্রে এপেন্ডিসাইটিসের লক্ষণগুলো চেনা একটু বেশি জটিল। কারণ, মেয়েদের তলপেটের ওই একই অংশে ওভারি বা ডিম্বাশয় এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব থাকে। তাই তলপেটে ব্যথা হলে সেটি মাসিকের ব্যথা, ওভারিয়ান সিস্ট নাকি এপেন্ডিসাইটিস—তা নিয়ে অনেকেই মারাত্মক দ্বিধায় পড়েন। চলুন, মেয়েদের এপেন্ডিসাইটিসের একদম সুনির্দিষ্ট লক্ষণগুলো এবং গাইনি সমস্যার সাথে এর পার্থক্য বিস্তারিত জেনে নিই।
মেয়েদের এপেন্ডিসাইটিস এর প্রধান ৫টি লক্ষণ
এপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা সাধারণত খুব দ্রুত (কয়েক ঘণ্টার মধ্যে) মারাত্মক আকার ধারণ করে। এর প্রধান সংকেতগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. নাভি থেকে ডান দিকের তলপেটে ব্যথা সরে যাওয়া
এপেন্ডিসাইটিসের সবচেয়ে বড় এবং প্রথম লক্ষণ হলো ব্যথাটা শুরু হয় নাভির চারপাশ থেকে। এরপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্যথাটা ধীরে ধীরে তলপেটের একদম ডান দিকের নিচের অংশে (McBurney’s point) এসে স্থির হয়। এই ব্যথা একটানা হতে থাকে এবং সময়ের সাথে সাথে তীব্রতা প্রচণ্ড বাড়তে থাকে।
২. নড়াচড়া বা কাশিতে প্রচণ্ড ব্যথা হওয়া
এপেন্ডিক্সে ইনফেকশন হলে পেটের ডান দিকের নিচের অংশটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এ সময় রোগী যদি হাঁটাচলা করেন, গভীর শ্বাস নেন, এমনকি সামান্য কাশি বা হাঁচি দেন, তবে তলপেটে ছুরিকাঘাতের মতো মারাত্মক তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভূত হয়।
৩. পেটে চাপ দিয়ে ছাড়লে ব্যথা বেড়ে যাওয়া
একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘রিবাউন্ড টেন্ডারনেস’ (Rebound tenderness) বলা হয়। ডান দিকের তলপেটে ব্যথা থাকা অবস্থায় সেখানে হাত দিয়ে চাপ দিলে যতটা ব্যথা লাগে, হঠাৎ করে হাত সরিয়ে নিলে বা চাপ ছেড়ে দিলে ব্যথার তীব্রতা জাদুকরীভাবে কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
৪. ক্ষুধামন্দা এবং বমি বমি ভাব
তলপেটে ব্যথার পরপরই রোগীর খাবারে চরম অরুচি দেখা দেয়। রোগী কিছুই খেতে পারেন না এবং এর সাথে প্রচণ্ড বমি বমি ভাব (Nausea) অথবা কয়েকবার বমি হতে পারে। এটি এপেন্ডিসাইটিসের একটি অত্যন্ত সাধারণ লক্ষণ।
৫. হালকা জ্বর এবং পেট ফাঁপা
ইনফেকশনের কারণে শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে যায় (সাধারণত ৯৯° থেকে ১০০.৫° ফারেনহাইট)। এর সাথে অনেক রোগীর পেট ফুলে থাকে বা ফাঁপা মনে হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
ওভারিয়ান সিস্ট বা মাসিকের ব্যথা বনাম এপেন্ডিসাইটিস
তলপেটের ডান দিকে ব্যথা মানেই এপেন্ডিসাইটিস নয়। নিচের টেবিল থেকে সাধারণ গাইনি সমস্যা এবং এপেন্ডিসাইটিসের পার্থক্য সহজেই বুঝতে পারবেন:
| বৈশিষ্ট্যের ধরন | এপেন্ডিসাইটিস (Appendicitis) | মাসিকের ব্যথা বা ওভারিয়ান সিস্ট |
| ব্যথা শুরুর স্থান | নাভির চারপাশ থেকে শুরু হয়ে ডান দিকের নিচে এসে স্থির হয়। | ব্যথা সাধারণত তলপেটের মাঝামাঝি বা যেকোনো এক পাশে হঠাৎ শুরু হয়। |
| ব্যথার ধরন | একটানা তীব্র ব্যথা থাকে এবং কাশলে বা নড়লে ব্যথা বাড়ে। | ব্যথা আসে এবং যায় (ক্র্যাম্পিং), অনেক সময় উরুর দিকে ছড়িয়ে পড়ে। |
| জ্বর ও বমি | ব্যথার পরপরই বমি ভাব শুরু হয় এবং হালকা জ্বর থাকে। | বমি ভাব থাকতে পারে, তবে সাধারণত জ্বর থাকে না। |
| মাসিক চক্রের সাথে সম্পর্ক | মাসিকের তারিখের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। | সাধারণত পিরিয়ডের আগে বা মাঝামাঝি (ওভিউলেশন) সময়ে হয়। |
গর্ভাবস্থায় এপেন্ডিসাইটিসের লক্ষণ
গর্ভবতী মেয়েদের ক্ষেত্রে এপেন্ডিসাইটিসের লক্ষণ কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। গর্ভাবস্থা যত এগোতে থাকে, জরায়ু বড় হওয়ার কারণে এপেন্ডিক্স তার স্বাভাবিক জায়গা থেকে একটু ওপরের দিকে সরে যায়। তাই গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা তলপেটের ডান দিকের বদলে পেটের ডান দিকের একটু ওপরের অংশে অনুভূত হতে পারে।
কখন দ্রুত হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে যাবেন?
এপেন্ডিসাইটিস একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। ইনফেকশন হওয়া এপেন্ডিক্স যেকোনো সময় পেটের ভেতর ফেটে যেতে পারে (Ruptured appendix), যা রোগীর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই নিচের পরিস্থিতিগুলো দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে:
ব্যথা এত তীব্র হয় যে রোগী সোজা হয়ে দাঁড়াতে বা হাঁটতে পারে না।
ডান দিকের তলপেট পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়।
ব্যথার সাথে উচ্চমাত্রার জ্বর এবং বারবার বমি হতে থাকে।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। তলপেটে তীব্র ব্যথা হলে ঘরে বসে নিজে নিজে কোনো ব্যথানাশক ওষুধ (Painkillers) খাবেন না। ব্যথানাশক ওষুধ আসল লক্ষণগুলো লুকিয়ে ফেলে, যা পরে চিকিৎসকের জন্য রোগ নির্ণয় করা কঠিন করে তোলে। ব্যথা হলে দ্রুত সার্জন বা নিকটস্থ হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে যোগাযোগ করুন।