আমাদের শরীরের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ হলো লিভার বা যকৃৎ। খাবার হজম করা থেকে শুরু করে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেওয়া—সবই করে এই লিভার। কিন্তু যখন লিভারের কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে এবং অনিয়ন্ত্রিত হারে বাড়তে শুরু করে, তখন তাকে ‘লিভার ক্যান্সার’ (Hepatocellular Carcinoma) বলা হয়।
লিভার ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় ভয়ংকর দিক হলো, একদম প্রাথমিক পর্যায়ে এর কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ থাকে না। তবে রোগটি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে শরীর কিছু মারাত্মক সংকেতের মাধ্যমে তা প্রকাশ করে। চলুন, লিভার ক্যান্সারের প্রধান ৫টি লক্ষণ এবং এর ঝুঁকির কারণগুলো বিস্তারিত জেনে নিই।
লিভার ক্যান্সারের ৫টি মারাত্মক লক্ষণ
লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে শুরু করলে রোগীর শরীরে প্রধানত নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:
১. কোনো কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস
লিভার ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো হঠাৎ করে এবং কোনো কারণ ছাড়াই শরীরের ওজন দ্রুত কমতে থাকা। রোগী কোনো ডায়েট বা ব্যায়াম না করলেও কয়েক মাসের মধ্যে তার ওজন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। এটি ক্যান্সারের কারণে শরীরের মেটাবলিজম নষ্ট হয়ে যাওয়ার একটি বড় সংকেত।
২. পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে ব্যথা
লিভার আমাদের পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে (বুকের পাঁজরের ঠিক নিচে) অবস্থিত। লিভারে টিউমার বা ক্যান্সার বড় হতে শুরু করলে সেই অংশে একটানা ব্যথা বা ভারী ভাব অনুভূত হয়। অনেক সময় এই ব্যথা পেটের ডান দিক থেকে শুরু হয়ে ডান কাঁধ বা পিঠের দিকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৩. জন্ডিস (ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া)
লিভার ক্যান্সার হলে লিভার শরীর থেকে ‘বিলিরুবিন’ নামক পদার্থ ঠিকমতো ফিল্টার করতে পারে না। এর ফলে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা মারাত্মকভাবে বেড়ে গিয়ে জন্ডিস দেখা দেয়। রোগীর চোখ এবং সারা শরীর হলুদ হয়ে যায়। এর পাশাপাশি প্রস্রাবের রং অতিরিক্ত গাঢ় (চা পাতার মতো) এবং মলের রং সাদা বা ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে।
৪. খাবারে চরম অরুচি ও বমি বমি ভাব
লিভারের সমস্যার কারণে রোগীর খাবারে চরম অরুচি দেখা দেয়। সামান্য কয়েক লোকমা খাবার খেলেই মনে হয় পেট অতিরিক্ত ভরে গেছে। এর পাশাপাশি রোগীর সারাক্ষণ বমি বমি ভাব থাকে এবং প্রায়ই বমি হতে পারে।
৫. পেটে পানি জমা ও ফুলে যাওয়া (Ascites)
ক্যান্সার যখন বেশ ছড়িয়ে পড়ে, তখন লিভার এবং এর আশপাশের রক্তনালীগুলোতে মারাত্মক চাপ পড়ে। এর ফলে রোগীর পেটের ভেতরে অতিরিক্ত তরল বা পানি জমতে শুরু করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যাসাইটিস’ (Ascites) বলা হয়। এ সময় পেট অস্বাভাবিকভাবে বেলুনের মতো ফুলে যায় এবং পেটের ডান দিকে হাত দিলে শক্ত চাকা বা টিউমারের মতো অনুভূত হতে পারে।
সাধারণ জন্ডিস বনাম লিভার ক্যান্সার: পার্থক্য কী?
অনেকেই সাধারণ জন্ডিসের সাথে লিভার ক্যান্সারের লক্ষণ গুলিয়ে ফেলেন। সহজে বোঝার জন্য নিচে এদের মূল পার্থক্য তুলে ধরা হলো:
| লক্ষণের ধরন | সাধারণ জন্ডিস বা হেপাটাইটিস | লিভার ক্যান্সারের লক্ষণ |
| ওজনের পরিবর্তন | ওজন সাধারণত স্বাভাবিক থাকে বা সামান্য কমে। | খুব দ্রুত এবং অস্বাভাবিকভাবে ওজন কমে যায়। |
| পেটের অবস্থা | পেটে সামান্য অস্বস্তি হতে পারে, কিন্তু ফুলে যায় না। | পেটে পানি জমে ফুলে যায় এবং ডান দিকে শক্ত চাকা লাগে। |
| ক্লান্তি ও দুর্বলতা | পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিলে ক্লান্তি কিছুটা কমে। | সারাক্ষণ চরম ক্লান্তি কাজ করে এবং শরীর শুকিয়ে যায়। |
| স্থায়িত্ব | সঠিক চিকিৎসায় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। | দিন দিন রোগীর অবস্থার মারাত্মক অবনতি হতে থাকে। |
লিভার ক্যান্সারের প্রধান ঝুঁকি ও কারণ
লিভার ক্যান্সার সাধারণত একদিনে হয় না। দীর্ঘদিন ধরে লিভারের ক্ষতি হতে হতে এটি ক্যান্সারে রূপ নেয়। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস: লিভার ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B) এবং সি ভাইরাসের সংক্রমণ।
লিভার সিরোসিস (Cirrhosis): অতিরিক্ত অ্যালকোহল বা মদ পানের কারণে লিভারের কোষগুলো শক্ত হয়ে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়, যাকে সিরোসিস বলা হয়। এটি পরবর্তীতে ক্যান্সারে রূপ নেয়।
ফ্যাটি লিভার (Fatty Liver): অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা অতিরিক্ত ওজনের কারণে লিভারে চর্বি জমে। সঠিক চিকিৎসা না করালে ফ্যাটি লিভার থেকেও ক্যান্সার হতে পারে।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি আপনার পেটের ডান দিকে একটানা ব্যথা থাকে, দ্রুত ওজন কমে যায় এবং বারবার জন্ডিস হয়, তবে এক মুহূর্ত অবহেলা না করে দ্রুত একজন লিভার বিশেষজ্ঞ বা হেপাটোলজিস্টের (Hepatologist) পরামর্শ নিন। আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং রক্ত পরীক্ষার (AFP Test) মাধ্যমেই এই রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।