অনেকেরই ধারণা, কৃমি বা ওয়ার্ম (Intestinal Worms) শুধু ছোট বাচ্চাদেরই হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং অসতর্কতার কারণে যেকোনো বয়সের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পেটেও কৃমির মারাত্মক সংক্রমণ হতে পারে।
fitnition.com-এর আজকের আয়োজনে আমরা জানবো বড়দের পেটে কৃমি হলে শরীর কী ধরনের সংকেত দেয়। বড়দের শরীরে কৃমি বাসা বাঁধলে তা নীরবে রক্ত এবং পুষ্টি শুষে নিয়ে মানুষকে ভেতর থেকে চরম দুর্বল করে ফেলে। চলুন, বড়দের কৃমি হওয়ার প্রধান ৫টি লক্ষণ এবং এটি থেকে মুক্তির কার্যকরী উপায় বিস্তারিত জেনে নিই।
বড়দের কৃমি হওয়ার ৫টি প্রধান লক্ষণ
কৃমির প্রকারভেদের ওপর নির্ভর করে লক্ষণগুলো ভিন্ন হতে পারে। তবে বড়দের শরীরে কৃমির সংক্রমণ হলে সাধারণত নিচের লক্ষণগুলো সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়:
১. কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া ও পেটে ব্যথা
বড়দের কৃমি হওয়ার সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো স্বাভাবিকভাবে খাওয়ার পরও হঠাৎ করে শরীরের ওজন কমতে শুরু করা। পেটে থাকা কৃমি (বিশেষ করে ফিতা কৃমি) মানুষের খাওয়া খাবারের বেশিরভাগ পুষ্টি নিজে শুষে নেয়। এর পাশাপাশি নাভির চারপাশে বা তলপেটে প্রায়ই মোচড় দিয়ে ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
২. মলদ্বারে তীব্র চুলকানি ও অস্বস্তি
গুঁড়া কৃমি বা পিনওয়ার্মের (Pinworm) কারণে এই সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি হয়। রাতের বেলা এই কৃমিগুলো মলদ্বারের চারপাশে ডিম পাড়তে আসে। যার ফলে রাতে ঘুমানোর সময় মলদ্বারে তীব্র চুলকানি বা সুড়সুড়ি অনুভূত হয় এবং ঘুমের মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে।
৩. অন্ত্রের সমস্যা বা হজমে গোলযোগ
পেটে অতিরিক্ত কৃমি জমা হলে পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে ঘন ঘন ডায়রিয়া, বদহজম, পেটে অতিরিক্ত গ্যাস বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দেখা দেয়। কিছু কৃমি এমন এক ধরনের বর্জ্য নিঃসরণ করে, যা অন্ত্রের ভেতর প্রদাহ বা ইনফেকশন তৈরি করে।
৪. চরম ক্লান্তি ও রক্তশূন্যতা (অ্যানিমিয়া)
বক্র কৃমি বা হুকওয়ার্ম (Hookworm) মানুষের অন্ত্রের দেয়াল কামড়ে ধরে সরাসরি রক্ত পান করে। দীর্ঘকাল ধরে এই অবস্থা চলতে থাকলে শরীরে আয়রনের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দেয় এবং রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া তৈরি হয়। এর ফলে সামান্য কাজ করলেই শরীর হাঁপিয়ে ওঠে এবং চরম ক্লান্তি কাজ করে।
৫. মলে বা বমিতে কৃমির উপস্থিতি
অনেক সময় পেটে কৃমির পরিমাণ অত্যাধিক বেড়ে গেলে মলত্যাগের সময় মলের সাথে জীবন্ত বা মৃত কৃমি চোখে পড়তে পারে। এছাড়া কৃমির কারণে বমি বমি ভাব হতে পারে এবং খুব বিরল ক্ষেত্রে বমির সাথেও কৃমি বেরিয়ে আসতে পারে।
বড়দের কৃমির প্রকারভেদ ও ছড়ানোর মাধ্যম
সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে আক্রমণকারী প্রধান ৩টি কৃমি ও ছড়ানোর মাধ্যম তুলে ধরা হলো:
| কৃমির ধরন | প্রধান ছড়ানোর মাধ্যম | শরীরে যে ক্ষতি করে |
| গুঁড়া কৃমি (Pinworm) | দূষিত হাত, খাবার ও বিছানার চাদরের মাধ্যমে। | মলদ্বারে চুলকানি ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। |
| বক্র কৃমি (Hookworm) | খালি পায়ে দূষিত মাটি বা ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটলে। | অন্ত্র থেকে রক্ত শুষে রক্তশূন্যতা তৈরি করে। |
| ফিতা কৃমি (Tapeworm) | কাঁচা বা আধা-সেদ্ধ মাংস এবং দূষিত পানির মাধ্যমে। | পুষ্টি শুষে নিয়ে চরম দুর্বলতা ও ওজন কমায়। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. বড়দের কত দিন পরপর কৃমির ওষুধ খাওয়া উচিত?
উত্তর: চিকিৎসকদের মতে, আমাদের দেশের আবহাওয়া এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি ৬ মাস পরপর কৃমির ওষুধ (যেমন- অ্যালবেনডাজল বা মেবেনডাজল) খাওয়া উচিত। পরিবারের একজনের কৃমি হলে সবাইকে একসাথে ওষুধ খেতে হয়।
২. মিষ্টি বেশি খেলে কি কৃমি হয়?
উত্তর: এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। মিষ্টি খেলে কৃমি জন্ম নেয় না। তবে পেটে আগে থেকেই কৃমি থাকলে অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার সেই কৃমিগুলোকে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।
৩. প্রাকৃতিক উপায়ে কৃমি দূর করার উপায় কী?
উত্তর: কাঁচা রসুন, কুমড়ার বীজ এবং মিষ্টি কুমড়া প্রাকৃতিকভাবে কৃমিনাশক হিসেবে কাজ করে। সকালে খালি পেটে এক কোয়া কাঁচা রসুন চিবিয়ে খেলে অন্ত্রের কৃমি ধ্বংস হতে সাহায্য করে।
বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি মলের সাথে রক্ত যায়, চরম রক্তশূন্যতার কারণে শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যায় বা পেটে তীব্র ব্যথার কারণে বমি হতে থাকে, তবে এটি অন্ত্রে ব্লকেজ (Intestinal Blockage) বা মারাত্মক ইনফেকশনের লক্ষণ। এমন অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। এছাড়া গর্ভবতী নারী এবং লিভারের রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে কৃমির ওষুধ কিনে খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ।