ছোট বাচ্চাদের যেকোনো অসুস্থতাই বাবা-মায়ের জন্য চিন্তার কারণ। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ের এবং আতঙ্কের বিষয় হলো বাচ্চার হঠাৎ করে ‘খিঁচুনি’ (Seizures) শুরু হওয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গে হঠাৎ করে অস্বাভাবিকতা বা শর্টসার্কিট হলে শরীরে খিঁচুনি দেখা দেয়।
fitnition.com-এর আজকের আয়োজনে আমরা জানবো বাচ্চাদের খিঁচুনি রোগের প্রধান লক্ষণগুলো কী কী। অনেক সময় জ্বর ছাড়া সাধারণ অবস্থাতেও বাচ্চার খিঁচুনি হতে পারে, যা মারাত্মক কোনো স্নায়বিক রোগের (যেমন- মৃগীরোগ বা এপিলেপসি) সংকেত বহন করে। চলুন, বাচ্চাদের খিঁচুনি রোগের প্রধান ৫টি লক্ষণ এবং এটি প্রতিরোধে জরুরি করণীয়গুলো বিস্তারিত জেনে নিই।
বাচ্চাদের খিঁচুনি রোগের ৫টি প্রধান লক্ষণ
খিঁচুনির ধরন অনুযায়ী লক্ষণগুলো বিভিন্ন রকম হতে পারে। তবে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে নিচে উল্লিখিত শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা যায়:
১. হাত-পা শক্ত হয়ে তীব্র ঝাঁকুনি দেওয়া (Tonic-Clonic)
খিঁচুনির সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো বাচ্চার পুরো শরীর হঠাৎ করে ধনুকের মতো শক্ত হয়ে যাওয়া এবং হাত-পায়ে তীব্রভাবে ঝাঁকুনি দেওয়া। এ সময় বাচ্চা তার মাংসপেশির ওপর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং অনেক সময় নিজের জিহ্বা নিজেই কামড়ে ফেলতে পারে। এটি কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
২. একদৃষ্টে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা (Absence Seizures)
সব খিঁচুনিতেই যে শরীর কাঁপবে, এমনটি নয়। অনেক সময় দেখা যায়, বাচ্চা খেলাধুলা বা কথা বলার মাঝখানে হঠাৎ করেই একদম স্থির হয়ে যায় এবং কয়েক সেকেন্ডের জন্য শূন্য দৃষ্টিতে একদিকে তাকিয়ে থাকে। এসময় ডাকলে বা গায়ে হাত দিলে বাচ্চা কোনো সাড়া দেয় না। এটিকে ‘অ্যাবসেন্স সিজার’ বলা হয়, যা সাধারণ মানুষ অনেক সময় ধরতে পারে না।
৩. চোখ উপরের দিকে উল্টে যাওয়া ও ফেনা ওঠা
খিঁচুনির সময় মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব হতে পারে। এর ফলে বাচ্চার চোখ উপরের দিকে উল্টে যায় বা বড় বড় হয়ে স্থির হয়ে থাকে। একই সাথে গলার পেশিগুলো সংকুচিত হওয়ার কারণে মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা বা সাদা ফেনা বের হতে পারে।
৪. অতিরিক্ত জ্বরের কারণে জ্ঞান হারানো (Febrile Seizure)
এটি সাধারণত ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী বাচ্চাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। বাচ্চার শরীরে হঠাৎ করে অতিরিক্ত জ্বর (সাধারণত ১০২° ফারেনহাইটের বেশি) চলে এলে মস্তিষ্ক সেই তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে না। এর ফলে বাচ্চা হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে যায় এবং শরীর কাঁপতে শুরু করে।
৫. খিঁচুনির পর নিস্তেজ হয়ে অতিরিক্ত ঘুমানো (Postictal State)
খিঁচুনির পর বাচ্চার মস্তিষ্ক চরম ক্লান্ত হয়ে পড়ে। খিঁচুনি থেমে যাওয়ার পর বাচ্চা সাধারণত খুব বিভ্রান্ত থাকে, কাউকে চিনতে পারে না এবং গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘পোস্টিকটাল স্টেট’ (Postictal state) বলা হয়, যা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
জ্বরজনিত খিঁচুনি বনাম মৃগীরোগ
সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে জ্বরের খিঁচুনি এবং মৃগীরোগের (এপিলেপসি) পার্থক্য তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্যের ধরন | জ্বরজনিত খিঁচুনি (Febrile Seizure) | মৃগীরোগ বা এপিলেপসি (Epilepsy) |
| প্রধান কারণ | হঠাৎ করে শরীরে তীব্র জ্বর আসা। | মস্তিষ্কের স্নায়বিক বা জন্মগত ত্রুটি। |
| বয়সসীমা | সাধারণত ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সে হয়। | যেকোনো বয়সেই হতে পারে। |
| জ্বরের উপস্থিতি | খিঁচুনির আগে বা পরে তীব্র জ্বর থাকে। | জ্বর ছাড়াই হঠাৎ করে খিঁচুনি শুরু হয়। |
| ভবিষ্যৎ ঝুঁকি | বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। | দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও ওষুধ সেবন করতে হয়। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. খিঁচুনির সময় বাচ্চার মুখের ভেতর কি চামচ বা আঙুল দেওয়া যাবে?
উত্তর: একদমই না। এটি আমাদের দেশের একটি মারাত্মক ভুল প্রচলন। খিঁচুনির সময় বাচ্চার মুখের ভেতর চামচ, আঙুল বা লোহার কোনো জিনিস দিলে বাচ্চার দাঁত ভেঙে যেতে পারে এবং শ্বাসরোধ হয়ে মারাত্মক বিপদ হতে পারে।
২. খিঁচুনি শুরু হলে বাবা-মায়ের তাৎক্ষণিক করণীয় কী?
উত্তর: প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে বাচ্চাকে নিরাপদ ও সমান জায়গায় শুইয়ে দিন। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখার জন্য বাচ্চাকে যেকোনো একপাশে কাত করে (Recovery position) শুইয়ে দিন, যাতে মুখের লালা বা ফেনা সহজেই বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে।
৩. বাচ্চার খিঁচুনি কতক্ষণ স্থায়ী হলে হাসপাতালে নিতে হবে?
উত্তর: সাধারণত একটি সাধারণ খিঁচুনি ১ থেকে ২ মিনিটের মধ্যেই থেমে যায়। তবে খিঁচুনি যদি একটানা ৫ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় (যাকে Status epilepticus বলা হয়), তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। খিঁচুনির সময় বাচ্চার গায়ে জুতা বা চামড়ার জিনিস শুকানো সম্পূর্ণ একটি কুসংস্কার এবং এতে বাচ্চার কোনো উপকার হয় না। যদি খিঁচুনির পর বাচ্চার ঠোঁট ও মুখ নীলচে হয়ে যায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয় বা বারবার বমি করতে থাকে, তবে ঘরোয়া চিকিৎসার চেষ্টা না করে দ্রুত একজন শিশু নিউরোলজিস্টের (Pediatric Neurologist) শরণাপন্ন হোন।