শরীর সবসময় গরম থাকা কিসের লক্ষণ ও মুক্তির কার্যকরী উপায়

অনেক সময় থার্মোমিটারে মেপে দেখা যায় গায়ের তাপমাত্রা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, কিন্তু হাত দিয়ে ছুঁলে মনে হয় শরীর আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। অথবা চারপাশের পরিবেশ ঠান্ডা থাকার পরও হঠাৎ করেই শরীরের ভেতর থেকে গরম ভাপ বের হতে থাকে।
অনেকেই এই অবস্থাকে ‘ভেতরের জ্বর’ বা অজানা কোনো মারাত্মক রোগ ভেবে ভয় পেয়ে যান। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, জ্বর ছাড়াও বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক কারণে আমাদের শরীর অতিরিক্ত গরম হতে পারে। fitnition.com-এর আজকের আয়োজনে আমরা জানবো থার্মোমিটারে জ্বর না থাকার পরও শরীর সবসময় গরম থাকার পেছনের বিজ্ঞানভিত্তিক কারণগুলো কী কী। চলুন, এই অস্বস্তিকর অবস্থার প্রধান ৫টি লক্ষণ ও মুক্তির উপায় বিস্তারিত জেনে নিই।


শরীর গরম থাকার ৫টি প্রধান কারণ ও লক্ষণ


শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্রটি থাকে আমাদের মস্তিষ্কের ‘হাইপোথ্যালামাস’ (Hypothalamus) অংশে। এর স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটলেই শরীর বিনা কারণে গরম হয়ে ওঠে। এর প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. থাইরয়েড গ্রন্থির অতিসক্রিয়তা (Hyperthyroidism)
জ্বর ছাড়া শরীর গরম থাকার সবচেয়ে বড় এবং সাধারণ কারণ হলো ‘হাইপারথাইরয়ডিজম’। আমাদের গলার কাছে থাকা থাইরয়েড গ্রন্থি যদি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করে, তবে শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাকীয় হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে শরীর প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে এবং রোগী সারাক্ষণ গরম অনুভব করেন। এর সাথে বুক ধড়ফড় করা এবং দ্রুত ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকতে পারে।
২. হরমোনের পরিবর্তন ও মেনোপজ (Menopause)
৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড যখন চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় (মেনোপজ), তখন শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মারাত্মক ওঠানামা শুরু হয়। এর ফলে হঠাৎ করেই বুকে, ঘাড়ে এবং মুখে তীব্র গরম অনুভূত হয় এবং প্রচণ্ড ঘাম হতে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘হট ফ্লাশ’ (Hot flashes) বলা হয়, যা দিনে বা রাতে যেকোনো সময় হতে পারে।
৩. মারাত্মক পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন
আমাদের শরীর ঘামের মাধ্যমে ভেতরের অতিরিক্ত তাপ বাইরে বের করে দিয়ে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। কিন্তু আপনি যদি পর্যাপ্ত পানি পান না করেন, তবে শরীর ঘাম তৈরি করতে পারে না। ফলে শরীরের ভেতরের তাপ বাইরে বের হতে না পেরে ভেতরেই আটকে থাকে এবং ত্বক অতিরিক্ত গরম ও শুষ্ক হয়ে যায়।
৪. অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উদ্বেগ (Stress & Anxiety)
অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা বা ‘প্যানিক অ্যাটাক’ হলে আমাদের স্নায়ুতন্ত্র শরীরে ‘অ্যাড্রেনালিন’ হরমোনের বন্যা বইয়ে দেয়। এটি আমাদের হার্ট রেট বা হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয় এবং পেশিতে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে। যার কারণে ভয়ের সময় বা অতিরিক্ত চিন্তার সময় হঠাৎ করেই শরীর প্রচণ্ড গরম হয়ে যায় এবং ঘাম হতে থাকে।
৫. খাদ্যাভ্যাস ও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
অতিরিক্ত ক্যাফেইন (চা, কফি), মশলাদার খাবার এবং অ্যালকোহল শরীরের রক্তনালীগুলোকে প্রসারিত করে দেয়, ফলে শরীরে গরম অনুভূতি তৈরি হয়। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ, অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট বা অ্যালার্জির কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও শরীর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম থাকতে পারে।


জ্বর বনাম শরীরের ভেতরের গরম


সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে সাধারণ জ্বর এবং ভেতরের গরমের পার্থক্য তুলে ধরা হলো:

বৈশিষ্ট্যের ধরনসাধারণ জ্বর (Fever)ভেতরের গরম (Heat Intolerance)
থার্মোমিটারের রিডিংশরীরের তাপমাত্রা সাধারণত ৯৯°F এর উপরে থাকে।থার্মোমিটারে শরীরের তাপমাত্রা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক (৯৮.৬°F) থাকে।
প্রধান কারণশরীরে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশন।থাইরয়েড, হরমোন, দুশ্চিন্তা বা খাদ্যাভ্যাস।
ঘাম ও শীত লাগাজ্বরের সময় শীত শীত অনুভব হয় এবং কাঁপুনি আসে।শীত লাগে না, বরং হঠাৎ করে প্রচণ্ড ঘাম হয় এবং হাঁসফাঁস লাগে।
ওষুধের প্রভাবপ্যারাসিটামল বা জ্বরের ওষুধ খেলে দ্রুত তাপমাত্রা কমে।জ্বরের ওষুধে কোনো কাজ হয় না বা গরম কমে না।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. শরীর সবসময় গরম থাকলে দ্রুত কমানোর উপায় কী?
উত্তর: তাৎক্ষণিকভাবে শরীর ঠান্ডা করতে এক গ্লাস স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি পান করুন এবং মুখ, ঘাড় ও হাতে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিন। সুতির বা ঢিলেঢালা পোশাক পরুন এবং চা, কফি বা অতিরিক্ত মশলাদার খাবার সাময়িকভাবে এড়িয়ে চলুন।
২. উচ্চ রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসার বাড়লে কি শরীর গরম হয়?
উত্তর: উচ্চ রক্তচাপ সরাসরি শরীর গরম করে না। তবে ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাওয়ার পেছনে যে কারণগুলো থাকে (যেমন- অতিরিক্ত রাগ, দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপ), সেই একই কারণে শরীরও গরম হয়ে উঠতে পারে।
৩. রাতের বেলা হাত ও পায়ের তালু গরম হয়ে যায় কেন?
উত্তর: সারাদিনের ক্লান্তি বা পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি (স্নায়ুর সমস্যা) এর কারণে এমনটি হতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাতে হাত-পায়ের তালুতে জ্বালাপোড়া ও গরম অনুভূতি বেশি হয়।


বিশেষ মারাত্মক সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি শরীর গরম থাকার পাশাপাশি আপনার প্রচণ্ড মাথা ঘোরে, বারবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়, প্রস্রাবের রং গাঢ় হলুদ হয় এবং ত্বক সম্পূর্ণ ঘামহীন ও শুষ্ক হয়ে যায়—তবে এটি ‘হিট স্ট্রোক’ (Heat Stroke) এর লক্ষণ হতে পারে। এমন অবস্থায় এক মুহূর্তও দেরি না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *