গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে প্রতিটি মায়ের মনেই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা থাকে, “আসল প্রসব ব্যথা বা ডেলিভারি পেইন চিনব কীভাবে?” প্রথমবার মা হতে যাওয়া নারীদের ক্ষেত্রে এই সংশয় এবং ভীতি আরও বেশি কাজ করে।
fitnition.com-এর আজকের আয়োজনে আমরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে জানব কীভাবে ডেলিভারি পেইন শনাক্ত করতে হয়। ডেলিভারির সময় বা ডিউ ডেট (Due date) ঘনিয়ে এলে মায়ের শরীর প্রাকৃতিকভাবেই সন্তান জন্মদানের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে এবং কিছু বিশেষ সংকেত দেয়। চলুন, আসল প্রসব ব্যথার প্রধান ৫টি শারীরিক লক্ষণ বিস্তারিত জেনে নিই।
ডেলিভারি পেইনের ৫টি প্রধান লক্ষণ
ডেলিভারি পেইন শুধু পেট ব্যথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সাথে আরও বেশ কিছু শারীরিক পরিবর্তন যুক্ত থাকে। নিচে সবচেয়ে সুস্পষ্ট লক্ষণগুলো দেওয়া হলো:
১. নিয়মিত জরায়ু সংকোচন (Regular Contractions)
ডেলিভারি পেইনের সবচেয়ে বড় এবং নিশ্চিত লক্ষণ হলো নিয়মিত জরায়ু সংকোচন। এই ব্যথা সাধারণত পিঠের নিচের অংশ বা কোমর থেকে শুরু হয়ে তলপেটের দিকে এবং অনেক সময় উরুর দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যথার সময় পুরো পেট পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। সময়ের সাথে সাথে এই ব্যথা আসার বিরতি কমতে থাকে এবং ব্যথার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়তে থাকে।
২. মিউকাস প্লাগ বের হওয়া বা ‘ব্লাডি শো’
গর্ভাবস্থায় জরায়ুর মুখ একটি আঠালো শ্লেষ্মা বা মিউকাস দিয়ে বন্ধ থাকে। ডেলিভারির সময় কাছে এলে জরায়ুর মুখ খুলতে শুরু করে এবং এই ‘মিউকাস প্লাগ’ খসে পড়ে। এর ফলে যোনিপথ দিয়ে আঠালো, জেলির মতো বা সামান্য রক্তমিশ্রিত স্রাব নির্গত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘ব্লাডি শো’ (Bloody show) বলা হয়। এটি দেখা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে ডেলিভারি হতে পারে।
৩. পানি ভাঙা (Water Breaking)
মায়ের পেটে বাচ্চা অ্যামনিওটিক ফ্লুইড নামক এক ধরনের তরল বা পানির থলির মধ্যে সুরক্ষিত থাকে। ডেলিভারি পেইন শুরু হওয়ার আগে বা পরে এই থলিটি ফেটে যেতে পারে, যাকে ‘পানি ভাঙা’ বলা হয়। এর ফলে যোনিপথ দিয়ে অনবরত পরিষ্কার তরল বের হতে থাকে। এটি ডেলিভারি আসন্ন হওয়ার একটি চূড়ান্ত লক্ষণ।
৪. পেলভিস বা তলপেটে প্রচণ্ড চাপ অনুভব
প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে বাচ্চার মাথা মায়ের পেলভিস বা শ্রোণির দিকে নিচে নেমে আসে। এর ফলে মায়ের তলপেটে, যোনিপথে এবং মলদ্বারে প্রচণ্ড চাপ ও ভারবোধ অনুভব হয়। মনে হয় যেন বাচ্চা যেকোনো সময় নিচ দিয়ে বেরিয়ে আসবে। এর কারণে মায়ের ঘন ঘন প্রস্রাব বা মলত্যাগের তীব্র বেগ হতে পারে।
৫. পিঠের নিচে একটানা তীব্র ব্যথা (Back Labor)
অনেকের ক্ষেত্রে ডেলিভারির ব্যথা তলপেটের চেয়ে পিঠের নিচের অংশে (কোমরে) বেশি অনুভূত হয়। বাচ্চা যদি মায়ের মেরুদণ্ডের দিকে মুখ করে থাকে, তবে ডেলিভারির সময় এই একটানা তীব্র কোমর ব্যথা বা ‘ব্যাক লেবার’ হতে পারে, যা হাঁটাচলা করলেও কোনোভাবেই কমে না।
আসল ব্যথা বনাম নকল ব্যথা (Braxton Hicks)
গর্ভাবস্থার শেষ সপ্তাহে অনেক সময় নকল ব্যথা বা ‘ব্র্যাক্সটন হিকস’ দেখা দেয়। সহজে আসল এবং নকল ব্যথার পার্থক্য বোঝার জন্য নিচের টেবিলটি খেয়াল করুন:
| লক্ষণের ধরন | আসল প্রসব ব্যথা (True Labor) | নকল প্রসব ব্যথা (False Labor) |
| ব্যথার তীব্রতা | সময়ের সাথে সাথে ব্যথা আরও তীব্র ও কষ্টদায়ক হয়। | ব্যথার তীব্রতা বাড়ে না, বরং অনেক সময় কমে যায়। |
| ব্যথার সময়কাল | নির্দিষ্ট সময় পরপর (যেমন ৫-১০ মিনিট) নিয়মিত আসে। | ব্যথার কোনো নির্দিষ্ট ছন্দ বা সময় থাকে না। |
| অবস্থান পরিবর্তন | হাঁটাচলা করলে বা শুয়ে বিশ্রাম নিলে ব্যথা কমে না। | হাঁটাচলা করলে বা পাশ ফিরে শুলে ব্যথা কমে যায়। |
| ব্যথার অবস্থান | কোমর থেকে শুরু হয়ে তলপেট ও পায়ের দিকে ছড়ায়। | সাধারণত শুধু পেটের সামনের অংশে বা তলপেটে হয়। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. পানি ভাঙলে কি ব্যথা ছাড়াই ডেলিভারি হতে পারে?
উত্তর: পানি ভাঙার পর সাধারণত স্বাভাবিকভাবেই লেবার পেইন শুরু হয়ে যায়। তবে পানি ভাঙার পরও যদি দীর্ঘক্ষণ ব্যথা শুরু না হয়, তখন ডাক্তাররা কৃত্রিমভাবে ব্যথা ওঠানোর জন্য ওষুধের (Induction) সাহায্য নিয়ে থাকেন।
২. ব্যথা কতক্ষণ পরপর এলে হাসপাতালে যাওয়া উচিত?
উত্তর: চিকিৎসকদের মতে, যখন ব্যথা প্রতি ৫ মিনিট পরপর আসবে, প্রতিটি ব্যথার স্থায়িত্ব অন্তত ১ মিনিট হবে এবং এটি একটানা ১ ঘণ্টা ধরে চলতে থাকবে, তখন কোনো দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। একে ‘৫-১-১ রুল’ (5-1-1 Rule) বলা হয়।
৩. ডেলিভারি পেইন কমানোর কি কোনো প্রাকৃতিক উপায় আছে?
উত্তর: ব্যথার সময় লম্বা করে নাক দিয়ে শ্বাস নিয়ে মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে ছাড়লে (Breathing exercises) শরীর কিছুটা শিথিল হয় এবং ব্যথার তীব্রতা সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ে। এছাড়া হালকা হাঁটাচলা করা বা কোমরে হালকা ম্যাসাজ নিলে কিছুটা আরাম পাওয়া যায়।
বিশেষ মাতৃস্বাস্থ্য সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও মাতৃস্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি গর্ভাবস্থায় হঠাৎ করে যোনিপথ দিয়ে তাজা লাল রক্তপাত শুরু হয়, ভাঙা পানির রং যদি সবুজ বা কালচে হয়, অথবা বাচ্চা যদি পেটে নড়াচড়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়—তবে কোনো লেবার পেইনের জন্য অপেক্ষা করবেন না। এমন অবস্থায় এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত গর্ভবতী মাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।