বাতজ্বর বা ‘রিউমেটিক ফিভার’ (Rheumatic Fever) হলো একটি জটিল প্রদাহজনিত রোগ। সাধারণত ‘স্ট্রেপ্টোকক্কাস’ (Streptococcus) নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে গলা ব্যথা বা টনসিলের ইনফেকশন হওয়ার ২ থেকে ৪ সপ্তাহ পর এই রোগটি দেখা দেয়। এটি মূলত ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের বেশি আক্রান্ত করে, তবে যেকোনো বয়সেই এটি হতে পারে।
সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে বাতজ্বর হার্ট বা হৃৎপিণ্ডের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘রিউমেটিক হার্ট ডিজিজ’ (Rheumatic Heart Disease) বলা হয়।
বাতজ্বরের প্রধান লক্ষণসমূহ
বাতজ্বরের লক্ষণগুলো মূলত শরীরের বিভিন্ন জয়েন্ট, হৃৎপিণ্ড, ত্বক এবং স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে। লক্ষণগুলো ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে, তবে প্রধান লক্ষণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. গিরায় গিরায় তীব্র ব্যথা ও ফুলে যাওয়া (Migratory Polyarthritis)
বাতজ্বরের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো অস্থিসন্ধি বা জয়েন্টে প্রচণ্ড ব্যথা। এই ব্যথা সাধারণত হাঁটু, গোড়ালি, কনুই বা কবজিতে বেশি হয়। এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, ব্যথা এক জয়েন্ট থেকে কমে গিয়ে অন্য জয়েন্টে শুরু হয় (অর্থাৎ একটি জয়েন্টের ব্যথা সারতে না সারতেই অন্যটিতে শুরু হয়)। আক্রান্ত স্থান লাল হয়ে যায়, ফুলে ওঠে এবং স্পর্শ করলে গরম অনুভূত হয়।
২. জ্বর ও ক্লান্তি
গলা ব্যথার কয়েক সপ্তাহ পর হঠাৎ করে তীব্র জ্বর আসা এবং সেই সাথে চরম ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করা বাতজ্বরের একটি প্রাথমিক সংকেত।
৩. বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট (Carditis)
বাতজ্বর যদি হৃৎপিণ্ডকে আক্রান্ত করে, তবে রোগীর বুকে ব্যথা হতে পারে। হার্টবিট বা হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক বেড়ে যায় (বুক ধড়ফড় করা) এবং সামান্য পরিশ্রমেই বা বিশ্রামরত অবস্থাতেও শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। এটি হার্টের ভালভের ক্ষতি হওয়ার অন্যতম লক্ষণ।
৪. অস্বাভাবিক বা অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া (Sydenham Chorea)
এই রোগে স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হলে রোগীর হাত, পা বা মুখের পেশিতে অনৈচ্ছিক এবং অনিয়ন্ত্রিত ঝাঁকুনি বা নড়াচড়া দেখা যায়। এটি সাধারণত শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি ঘটে এবং এর কারণে রোগীর কথা বলতে, খেতে বা স্বাভাবিক কাজ করতে কষ্ট হয়। অনেক সময় আচরণের আকস্মিক পরিবর্তন বা অকারণে কান্নাকাটিও দেখা যায়।
৫. ত্বকে লালচে র্যাশ (Erythema Marginatum)
ত্বকে, বিশেষ করে বুক, পিঠ বা পেটে গোলাকার বা রিংয়ের মতো লালচে দাগ দেখা দিতে পারে। এই র্যাশগুলো সাধারণত চুলকায় না এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে সাথে মিলিয়ে যেতে বা পুনরায় ফিরে আসতে পারে।
৬. ত্বকের নিচে ছোট গুটি (Subcutaneous Nodules)
হাড়ের জয়েন্টের কাছে, বিশেষ করে কনুই, হাঁটু বা মেরুদণ্ডের অংশে ত্বকের নিচে ছোট ছোট ব্যথাহীন শক্ত গুটি তৈরি হতে পারে। এটি সাধারণত গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়।
বাতজ্বর নির্ণয়ের জোনস ক্রাইটেরিয়া (Jones Criteria)
চিকিৎসকরা বাতজ্বর নির্ণয়ের জন্য কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ বা ক্রাইটেরিয়া অনুসরণ করেন। সহজে বোঝার জন্য এটি নিচে ছক আকারে দেওয়া হলো:
| প্রধান লক্ষণ (Major Criteria) | সাধারণ লক্ষণ (Minor Criteria) |
|---|---|
| হৃৎপিণ্ডে প্রদাহ বা কার্ডাইটিস | জ্বর |
| একাধিক জয়েন্টে ব্যথা (পলিআর্থ্রাইটিস) | একটি জয়েন্টে ব্যথা বা গিরা ব্যথা |
| অস্বাভাবিক স্নায়বিক নড়াচড়া (কোরিয়া) | ইসিজি (ECG)-তে অস্বাভাবিকতা |
| ত্বকের নিচে শক্ত গুটি | রক্ত পরীক্ষায় প্রদাহের প্রমাণ (ESR বা CRP বৃদ্ধি) |
| ত্বকে রিং আকৃতির লাল র্যাশ | আগে বাতজ্বর হওয়ার ইতিহাস |
চিকিৎসকদের মতে, শরীরে স্ট্রেপ্টোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ার প্রমাণ থাকার পাশাপাশি যদি অন্তত ২টি প্রধান লক্ষণ অথবা ১টি প্রধান ও ২টি সাধারণ লক্ষণ মিলে যায়, তবে তা বাতজ্বর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
- শিশুর যদি হঠাৎ করে তীব্র গলা ব্যথা শুরু হয় এবং খাবার গিলতে প্রচণ্ড কষ্ট হয়।
- গলা ব্যথার কয়েক সপ্তাহ পর যদি হঠাৎ গায়ে জ্বর আসে এবং শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে বা গিরায় ব্যথা শুরু হয়।
- শিশুর চলাফেরা বা আচার-আচরণে অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি বা অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া চোখে পড়লে।
বিশেষ সতর্কতা: বাতজ্বর সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। তবে অবহেলা করলে এটি হার্টের ভালভের মারাত্মক এবং স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। তাই সাধারণ গলা ব্যথা বা টনসিলের ইনফেকশন হলে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পূর্ণ করা উচিত। গলা ব্যথার সঠিক চিকিৎসাই পারে বাতজ্বরের মতো ভয়াবহ রোগ থেকে বাঁচাতে।