ক্যান্সার’ শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে। আর তা যদি হয় ব্লাড ক্যান্সার বা রক্তের ক্যান্সার, তবে ভয়টা যেন আরও বেড়ে যায়। ব্লাড ক্যান্সার মূলত আমাদের শরীরের রক্তকণিকা এবং অস্থিমজ্জাকে (Bone Marrow) আক্রমণ করে, যার ফলে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
অন্যান্য ক্যান্সারের মতো ব্লাড ক্যান্সারে কোনো নির্দিষ্ট টিউমার বা চাকা দেখা যায় না বলে প্রাথমিক পর্যায়ে এটি শনাক্ত করা বেশ কঠিন। অনেক সময় সাধারণ জ্বর বা ক্লান্তিকে আমরা অবহেলা করি, যা হয়তো ভেতরে ভেতরে ক্যান্সারের রূপ নিচ্ছে। সঠিক সময়ে ব্লাড ক্যান্সারের লক্ষণ গুলো চিনতে পারলে এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে এই রোগ থেকে পুরোপুরি সুস্থ হওয়া সম্ভব। চলুন জেনে নিই, ব্লাড ক্যান্সারের প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলো কী কী।
ব্লাড ক্যান্সারের প্রাথমিক ও প্রধান লক্ষণসমূহ
রক্তে সাধারণত তিন ধরনের কণিকা থাকে—লোহিত রক্তকণিকা (Red Blood Cells), শ্বেত রক্তকণিকা (White Blood Cells) এবং অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেট (Platelets)। ক্যান্সারের কারণে এই কণিকাগুলোর স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হলে শরীরে নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:
দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও দুর্বলতা: পর্যাপ্ত ঘুম বা বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি সারাক্ষণ শরীর ক্লান্ত লাগে এবং ছোটখাটো কাজ করলেই হাঁপিয়ে ওঠেন, তবে এটি রক্তশূন্যতা বা ব্লাড ক্যান্সারের একটি বড় লক্ষণ হতে পারে। লোহিত রক্তকণিকা কমে যাওয়ার কারণে এমনটি হয়।
অকারণে রক্তপাত ও কালশিটে দাগ: শরীরে প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা কমে গেলে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না। এর ফলে কোনো আঘাত ছাড়াই শরীরের বিভিন্ন স্থানে লাল বা বেগুনি রঙের কালশিটে দাগ (Petechiae) দেখা দেয়। এছাড়া দাঁতের মাড়ি বা নাক দিয়ে অকারণে রক্ত পড়া ব্লাড ক্যান্সারের একটি অন্যতম সংকেত।
ঘন ঘন জ্বর ও ইনফেকশন: শ্বেত রক্তকণিকা আমাদের শরীরকে রোগের হাত থেকে বাঁচায়। ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে এই কণিকাগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। ফলে রোগী ঘন ঘন জ্বরে ভোগেন এবং বারবার বিভিন্ন ইনফেকশনে আক্রান্ত হন।
লিম্ফ নোড বা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া: ঘাড়, বগল বা কুঁচকির দিকের লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থিগুলো যদি ফুলে যায় এবং সেখানে কোনো ব্যথা না থাকে, তবে তা বিপদের লক্ষণ।
হাড় ও জয়েন্টে তীব্র ব্যথা: অস্থিমজ্জায় (যেখানে রক্ত তৈরি হয়) ক্যান্সারের কোষগুলো অতিরিক্ত বেড়ে গেলে হাড় বা জয়েন্টে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। (নোট: অতিরিক্ত পরিশ্রম বা সাধারণ হাড় ও পেশির ব্যথায় ভালো মানের বডি ম্যাসাজার বা থেরাপি ডিভাইস ব্যবহার করলে ব্যথা দ্রুত কমে যায়। কিন্তু ব্লাড ক্যান্সারের কারণে হওয়া হাড়ের ব্যথা সাধারণ ম্যাসাজে বা ব্যথার ওষুধে কমে না, বরং দিন দিন আরও বাড়তে থাকে)।
রাতের বেলা অতিরিক্ত ঘাম হওয়া: আবহাওয়া ঠান্ডা থাকার পরও রাতে ঘুমের মধ্যে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া এবং শরীর ভিজে যাওয়া এই রোগের একটি বিশেষ লক্ষণ।
অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস: কোনো ধরনের ডায়েট বা ব্যায়াম ছাড়াই যদি হঠাৎ করে শরীরের ওজন খুব দ্রুত কমতে থাকে, তবে তা মোটেও সাধারণ কোনো বিষয় নয়।
ব্লাড ক্যান্সারের প্রকারভেদ ও লক্ষণের ভিন্নতা
ব্লাড ক্যান্সার প্রধানত তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রকারভেদ অনুযায়ী লক্ষণে কিছু পার্থক্য দেখা যায়, যা নিচের ছক থেকে সহজে বোঝা যাবে:
| ক্যান্সারের ধরন | আক্রান্ত স্থান | প্রধান ও বিশেষ লক্ষণ |
| লিউকেমিয়া (Leukemia) | রক্ত এবং অস্থিমজ্জা (Bone Marrow) | ঘন ঘন জ্বর, ফ্যাকাশে ত্বক, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত এবং হাড়ে ব্যথা। শিশু ও বয়স্ক উভয়েরই হতে পারে। |
| লিম্ফোমা (Lymphoma) | লসিকা গ্রন্থি বা লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম | ঘাড়, বগল বা কুঁচকিতে ব্যথাহীন গোটা বা গ্ল্যান্ড ফুলে ওঠা এবং রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া। |
| মাল্টিপল মাইলোমা (Multiple Myeloma) | প্লাজমা সেল বা শ্বেত রক্তকণিকার একটি অংশ | পিঠের নিচের অংশে বা মেরুদণ্ডে তীব্র ব্যথা, হাড় ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া এবং কিডনির সমস্যা। |
কখন জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তারের কাছে যাবেন?
উপরে উল্লিখিত লক্ষণগুলোর এক বা একাধিক যদি আপনার শরীরে দীর্ঘসময় ধরে (২ সপ্তাহের বেশি) বিরাজ করে, তবে অবহেলা করবেন না। ব্লাড ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক সাধারণত সাধারণ রক্ত পরীক্ষা বা সিবিসি (CBC – Complete Blood Count) এবং প্রয়োজনে বোন ম্যারো টেস্ট (Bone Marrow Test) করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. ব্লাড ক্যান্সার কি পুরোপুরি ভালো হয়?
উত্তর: হ্যাঁ, ব্লাড ক্যান্সার এখন আর মরণব্যাধি নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি বা বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশনের (BMT) মাধ্যমে রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা সম্ভব।
২. শরীরে কালশিটে দাগ বা র্যাশগুলো দেখতে কেমন হয়?
উত্তর: প্লাটিলেট কমে যাওয়ার কারণে ত্বকের নিচে ছোট ছোট লাল বা বেগুনি রঙের বিন্দুর মতো র্যাশ (যাকে Petechiae বলে) দেখা যায়। এগুলো চাপ দিলে সাধারণ র্যাশের মতো সাদা হয়ে যায় না।
৩. ব্লাড ক্যান্সার কি ছোঁয়াচে রোগ?
উত্তর: একেবারেই না। ব্লাড ক্যান্সার কোনো জীবাণু বা ভাইরাসের কারণে হয় না, এটি শরীরের ভেতরের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে হয়। তাই রোগীর সংস্পর্শে এলে এই রোগ ছড়ানোর কোনো আশঙ্কা নেই।
৪. শিশুদের কি ব্লাড ক্যান্সার হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, শিশুদের ব্লাড ক্যান্সার হতে পারে, বিশেষ করে ‘অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া’ (ALL) শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। তবে সঠিক চিকিৎসায় শিশুদের সুস্থ হওয়ার হার বয়স্কদের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যেকোনো অস্বাভাবিক শারীরিক লক্ষণে অযথা ভয় না পেয়ে বা নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে অবশ্যই একজন হেমাটোলজিস্ট বা রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন।