আমাদের দেশে পান-সুপারি, জর্দা, তামাক ও ধূমপানের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে মুখের ক্যান্সার (Oral Cancer) অত্যন্ত সাধারণ একটি রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঠোঁট, জিহ্বা, মাড়ি, গালের ভেতরের অংশ বা মুখের তালুতে এই ক্যান্সার হতে পারে।
যেকোনো ক্যান্সারের মতোই মুখের ক্যান্সারও শুরুর দিকে খুব বেশি শারীরিক কষ্ট দেয় না, ফলে অনেকেই সাধারণ ঘা ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু সময় থাকতে প্রাথমিক পর্যায়ে মুখের ক্যান্সারের লক্ষণ চিনে সঠিক চিকিৎসা শুরু করলে এই রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব। চলুন জেনে নিই, মুখের ক্যান্সার দানা বাঁধলে শুরুতে কী কী সংকেত প্রকাশ পায়।
প্রাথমিক পর্যায়ে মুখের ক্যান্সারের ৫টি প্রধান লক্ষণ
মুখের ভেতরে বা ঠোঁটে নিচের যেকোনো লক্ষণ একটানা ২ থেকে ৩ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে তা ক্যান্সারের সংকেত হতে পারে:
মুখের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী ঘা: মুখের ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো এমন কোনো ঘা বা আলসার, যা কোনোভাবেই শুকাচ্ছে না। সাধারণ ঘা সাধারণত ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়, কিন্তু ক্যান্সারের ঘা ওষুধ খাওয়ার পরও থেকে যায় এবং অনেক সময় তা থেকে অস্বাভাবিক রক্তপাত হতে পারে।
সাদা বা লাল রঙের ছোপ (Patches): গালের ভেতরের অংশে, জিহ্বায় বা মাড়িতে অস্বাভাবিক সাদাটে (Leukoplakia) বা গাঢ় লাল রঙের (Erythroplakia) ছোপ দেখা দেওয়া। এই ছোপগুলো অনেক সময় ক্যান্সারের পূর্বলক্ষণ হিসেবে প্রকাশ পায়।
অস্বাভাবিক পিণ্ড বা মাংস ফুলে যাওয়া: মুখের ভেতরে, মাড়িতে, গলায় বা গালের ভেতরের দিকে আঙুল দিলে যদি শক্ত কোনো গোটা, পিণ্ড বা মাংস ফুলে যাওয়ার মতো অনুভব হয়।
খাবার চিবানো বা গিলতে ব্যথা: খাবার খাওয়ার সময় বা গিলতে গেলে যদি একটানা ব্যথা অনুভূত হয়। এছাড়া জিহ্বা নাড়াতে বা চোয়াল খুলতে কষ্ট হওয়াও ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
দাঁত আলগা হয়ে যাওয়া ও অসাড়তা: কোনো ধরনের দাঁতের মাড়ির সমস্যা বা আঘাত ছাড়াই হঠাৎ করে কোনো দাঁত নড়ে যাওয়া বা আলগা হয়ে যাওয়া। এছাড়া মুখের কোনো অংশ, ঠোঁট বা জিহ্বায় হঠাৎ করে অসাড়তা (Numbness) বা অনুভূতি কমে যাওয়া।
সাধারণ মুখের ঘা বনাম ক্যান্সারের ঘা (পার্থক্য বুঝুন)
| লক্ষণের ধরন | সাধারণ মুখের ঘা (আলসার) | ক্যান্সারের ঘা |
| স্থায়িত্বকাল | সাধারণত ৭-১৪ দিনের মধ্যেই নিজে থেকে বা সাধারণ ওষুধে সেরে যায়। | ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পার হলেও কমে না, বরং ঘায়ের আকার বাড়তে থাকে। |
| ব্যথার ধরন | শুরু থেকেই ঘায়ে প্রচণ্ড ব্যথা ও জ্বালাপোড়া থাকে। | প্রাথমিক অবস্থায় ঘায়ে তেমন কোনো ব্যথা থাকে না, তবে পরে ব্যথা বাড়ে। |
| ঘা হওয়ার কারণ | পেট গরম, ভিটামিনের অভাব, মানসিক চাপ বা দাঁতের খোঁচা লাগলে হয়। | সাধারণত তামাক, জর্দা বা ধূমপানের দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাসের কারণে শুরু হয়। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. মুখের ক্যান্সারের প্রধান কারণগুলো কী কী?
উত্তর: পান-সুপারি, জর্দা, খৈনি, গুল ও ধূমপানের মতো তামাকজাত দ্রব্য মুখের ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় কারণ। এছাড়া অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান এবং হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV)-এর সংক্রমণও এই ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়ায়।
২. প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে মুখের ক্যান্সার কি নিরাময়যোগ্য?
উত্তর: হ্যাঁ। ক্যান্সার যদি মুখের বাইরের কোনো অংশে না ছড়ায় বা গলার লিম্ফ নোডে না পৌঁছায়, তবে সার্জারি ও রেডিওথেরাপির মাধ্যমে রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা সম্ভব।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি আপনার মুখের ভেতরে কোনো ঘা বা লাল-সাদা ছোপ দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থাকে, তবে নিজে থেকে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে সময় নষ্ট করবেন না। দ্রুত একজন ডেন্টাল সার্জন বা অনকোলজিস্টের (ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ) শরণাপন্ন হয়ে বায়োপসি করান।