টনসিল ইনফেকশনের ৫টি প্রধান লক্ষণ ও করণীয়

আমাদের গলার ভেতরের একেবারে পেছনের দিকে দুই পাশে থাকা ছোট ডিম্বাকৃতির গ্রন্থি দুটিকে ‘টনসিল’ (Tonsils) বলা হয়। টনসিল মূলত আমাদের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রথম সারির পাহারাদার হিসেবে কাজ করে। মুখ বা নাক দিয়ে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে চাইলে টনসিল তা আটকে দেয়।
কিন্তু জীবাণুর আক্রমণ যদি খুব শক্তিশালী হয়, তবে টনসিল নিজেই আক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং ফুলে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘টনসিলাইটিস’ (Tonsillitis) বা টনসিলের ইনফেকশন বলা হয়। চলুন, টনসিল ইনফেকশনের প্রধান ৫টি লক্ষণ এবং এর ধরন বিস্তারিত জেনে নিই।


টনসিল ইনফেকশনের ৫টি প্রধান লক্ষণ


টনসিল আক্রান্ত হলে শরীরের ইমিউন সিস্টেম জীবাণুর সাথে লড়াই শুরু করে, যার ফলে মূলত নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:
১. তীব্র গলা ব্যথা ও ঢোক গিলতে মারাত্মক কষ্ট
টনসিলাইটিসের সবচেয়ে প্রধান এবং যন্ত্রণাদায়ক লক্ষণ হলো গলার দুই পাশে একটানা তীব্র ব্যথা। এই ব্যথা এতটাই বেশি থাকে যে, শক্ত খাবার তো দূরের কথা, সাধারণ পানি পান করতে বা নিজের থুতু বা ঢোক গিলতেও রোগীর মারাত্মক কষ্ট হয়।
২. টনসিল ফুলে লাল হওয়া ও সাদা পুঁজ জমা
রোগীকে মুখ হাঁ করতে বললে গলার ভেতরের দুই পাশের টনসিল অস্বাভাবিকভাবে ফুলে বড় ও টকটকে লাল হয়ে থাকতে দেখা যায়। ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের ক্ষেত্রে অনেক সময় টনসিলের ওপর সাদা বা হলদেটে রঙের ছোপ ছোপ দাগ বা পুঁজ (Pus) জমে থাকতে দেখা যায়।
৩. উচ্চমাত্রার জ্বর, মাথা ও শরীর ব্যথা
ইনফেকশনের কারণে শরীরে হালকা থেকে শুরু করে তীব্র মাত্রার জ্বর (১০১° থেকে ১০৪° ফারেনহাইট পর্যন্ত) আসতে পারে। জ্বরের পাশাপাশি রোগীর প্রচণ্ড মাথাব্যথা, কাঁপুনি বা শীত শীত ভাব এবং চরম শারীরিক দুর্বলতা কাজ করে।
৪. গলার বাইরের দিকের লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া
টনসিলের ভেতরের ইনফেকশনের প্রভাব বাইরের দিকেও পড়ে। চোয়ালের ঠিক নিচে বা গলার দুই পাশের লিম্ফ নোড (Lymph nodes) বা গ্রন্থিগুলো ফুলে শক্ত হয়ে যায়। বাইরে থেকে সেখানে হাত দিলে বা চাপ দিলে ব্যথা অনুভূত হয়।
৫. মুখের মারাত্মক দুর্গন্ধ ও গলা বসে যাওয়া
টনসিলে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ এবং পুঁজ জমার কারণে রোগীর মুখ থেকে মারাত্মক দুর্গন্ধ (Halitosis) বের হতে পারে। পাশাপাশি টনসিল ফুলে শ্বাসনালীতে চাপ পড়ার কারণে গলার স্বর বা আওয়াজ ভারী ও ফিসফিসে হয়ে যায়। অনেক সময় ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে পেটে ব্যথা বা বমি বমি ভাবও দেখা দিতে পারে।


ভাইরাল টনসিলাইটিস বনাম ব্যাকটেরিয়াল টনসিলাইটিস


টনসিল ইনফেকশন মূলত দুই ধরনের জীবাণুর মাধ্যমে হয়। সহজে পার্থক্য বোঝার জন্য নিচের টেবিলটি খেয়াল করুন:

লক্ষণের ধরনভাইরাল টনসিলাইটিস (ভাইরাসজনিত)ব্যাকটেরিয়াল টনসিলাইটিস (স্ট্রেপ থ্রোট)
অন্যান্য লক্ষণসাধারণত সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হতে পারে।সর্দি-কাশি থাকে না, হঠাৎ তীব্র জ্বর আসে।
টনসিলের অবস্থাটনসিল ফুলে লাল হয়, তবে পুঁজ থাকে না।টনসিল মারাত্মক ফুলে যায় এবং সাদা পুঁজ জমে।
বয়সসীমাযেকোনো বয়সেই বেশি দেখা যায়।সাধারণত ৫ থেকে ১৫ বছরের শিশুদের বেশি হয়।
চিকিৎসা পদ্ধতিঅ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না, গার্গল ও বিশ্রামে ভালো হয়।চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হয়।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. টনসিল ইনফেকশন কি ছোঁয়াচে রোগ?
উত্তর: হ্যাঁ, টনসিলের জন্য দায়ী ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া দুটোই অত্যন্ত ছোঁয়াচে। হাঁচি, কাশি বা আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত গ্লাস ও চামচ ব্যবহার করলে এই ইনফেকশন খুব দ্রুত একজন থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
২. টনসিলের ব্যথা কমাতে সবচেয়ে ভালো ঘরোয়া উপায় কী?
উত্তর: টনসিলের ব্যথা কমানোর সবচেয়ে জাদুকরী উপায় হলো লবণ-গরম পানির গার্গল (Gargle)। দিনে ৩-৪ বার হালকা গরম পানিতে সামান্য লবণ দিয়ে গার্গল করলে গলার ভেতরের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয় এবং ফোলা ভাব ও ব্যথা দ্রুত কমে যায়।
৩. টনসিল হলে কি অপারেশন করতেই হয়?
উত্তর: মোটেই না। বেশিরভাগ টনসিল ইনফেকশনই সঠিক ওষুধ এবং গার্গল করলে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়। তবে যদি বছরে ৫-৭ বারের বেশি তীব্র ইনফেকশন হয় এবং তা শ্বাসকষ্ট বা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়, কেবল তখনই চিকিৎসকরা অপারেশনের (Tonsillectomy) পরামর্শ দিয়ে থাকেন।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি গলা ব্যথার কারণে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, মুখ খুলতে মারাত্মক সমস্যা হয় বা জ্বর তিন দিনের বেশি সময় ধরে না কমে, তবে ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক না কিনে দ্রুত একজন নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *