গাঁজা (Marijuana বা Cannabis) বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত পরিচিত এবং বিতর্কিত একটি উদ্ভিদের নাম। যুগ যুগ ধরে এটি নেশাজাতীয় দ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এলেও, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা কিছু জাদুকরী ঔষধি উপাদানের সন্ধান পেয়েছে।
গাঁজার পাতায় মূলত শতাধিক রাসায়নিক উপাদান থাকে, যাদের ‘ক্যানাবিনয়েড’ (Cannabinoids) বলা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত দুটি উপাদান হলো THC (যা মানুষের ব্রেনে নেশা বা ঘোর সৃষ্টি করে) এবং CBD (যার কোনো নেশার প্রভাব নেই, বরং চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়)। চলুন, বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের আলোকে গাঁজার আসল উপকারিতা এবং এর ভয়াবহ ক্ষতিকর দিকগুলো বিস্তারিত জেনে নিই।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে গাঁজার (CBD) প্রধান ৪টি উপকারিতা
উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে চিকিৎসকের কড়া নজরদারিতে নির্দিষ্ট কিছু জটিল রোগের চিকিৎসায় ‘মেডিকেল ক্যানাবিস’ বা গাঁজার নির্যাস ব্যবহার করা হয়। এর বৈজ্ঞানিক উপকারিতাগুলো হলো:
১. দীর্ঘমেয়াদী বা ক্রনিক ব্যথা নিরাময়
গাঁজার অন্যতম প্রধান মেডিকেল ব্যবহার হলো দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা কমানো। স্নায়ুর ক্ষতি (Neuropathy) বা মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের মতো জটিল রোগে রোগীদের শরীরে যে তীব্র ব্যথা হয়, গাঁজার নির্যাস (CBD) ব্রেনের পেইন রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে সেই ব্যথা নিমিষেই কমিয়ে দিতে পারে।
২. মৃগীরোগ বা খিঁচুনি (Epilepsy) নিয়ন্ত্রণ
চিকিৎসাবিজ্ঞানে গাঁজার সবচেয়ে সফল ব্যবহার দেখা গেছে মৃগীরোগের চিকিৎসায়। বিশেষ করে শিশুদের ‘ড্রাভেট সিনড্রোম’ (Dravet syndrome) নামক মারাত্মক মৃগীরোগে, যেখানে সাধারণ ওষুধ কাজ করে না, সেখানে ‘এপিডিওলেক্স’ (Epidiolex) নামক গাঁজার নির্যাস খিঁচুনি জাদুর মতো কমিয়ে আনে।
৩. কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দূর করা
ক্যান্সার রোগীদের কেমোথেরাপি দেওয়ার পর মারাত্মক বমি বমি ভাব, অরুচি এবং শারীরিক কষ্ট দেখা দেয়। গাঁজার নির্দিষ্ট উপাদান এই বমি বমি ভাব দূর করতে এবং রোগীকে সাময়িক স্বস্তি দিতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
৪. মারাত্মক অরুচি দূর ও ক্ষুধা বৃদ্ধি করা
এইচআইভি/এইডস (HIV/AIDS) বা ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ের রোগীদের খাবারে চরম অরুচি দেখা দেয় এবং শরীর শুকিয়ে যায়। চিকিৎসা হিসেবে নির্দিষ্ট মাত্রায় গাঁজার নির্যাস ব্যবহার করলে এটি মস্তিষ্কে ক্ষুধার হরমোন উদ্দীপ্ত করে এবং রোগীর খাবার খাওয়ার রুচি ফিরিয়ে আনে।
গাঁজা খাওয়ার ৫টি ভয়াবহ অপকারিতা ও ঝুঁকি
চিকিৎসার বাইরে নেশার উদ্দেশ্যে কাঁচা গাঁজা বা ধোঁয়া টেনে গ্রহণ করলে এটি শরীরের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনে। এর ক্ষতিকর দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত ও স্মৃতিশক্তি হ্রাস
বিশেষ করে কিশোর বা তরুণ বয়সে গাঁজা সেবন করলে তা ব্রেনের স্বাভাবিক বিকাশকে চিরতরে নষ্ট করে দেয়। এটি ব্রেনের ‘হিপোক্যাম্পাস’ অংশে আঘাত করে, যার ফলে মানুষের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়।
২. মানসিক বিকৃতি ও সিজোফ্রেনিয়ার ঝুঁকি
গাঁজায় থাকা অতিরিক্ত মাত্রার THC ব্রেনে হ্যালুসিনেশন (যা বাস্তবে নেই তা দেখা বা শোনা) এবং অহেতুক সন্দেহ বা ভীতি (Paranoia) তৈরি করে। দীর্ঘদিন গাঁজা সেবন করলে মানুষের তীব্র মানসিক বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং অনেক ক্ষেত্রে ‘সিজোফ্রেনিয়া’ (Schizophrenia) নামক মারাত্মক মানসিক রোগ হতে পারে।
৩. ফুসফুস ও শ্বাসনালীর মারাত্মক ক্ষতি
সিগারেটের মতো গাঁজা পুড়িয়ে ধোঁয়া টেনে গ্রহণ করলে তা ফুসফুসের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। গাঁজার ধোঁয়ায় তামাকের মতোই বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড এবং টার থাকে, যা ফুসফুসের কোষ নষ্ট করে দীর্ঘমেয়াদী ব্রংকাইটিস এবং ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করে।
৪. হার্টবিট বৃদ্ধি ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি
গাঁজা সেবনের কয়েক মিনিটের মধ্যেই মানুষের হার্টবিট স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ থেকে ৫০ বিট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে এবং এটি কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। বয়স্ক বা হার্টের রোগীদের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত চাপ হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
৫. গর্ভাবস্থায় শিশুর মারাত্মক ক্ষতি
গর্ভবতী নারীরা গাঁজা সেবন করলে তা রক্তনালীর মাধ্যমে সরাসরি গর্ভস্থ শিশুর ব্রেনে পৌঁছে যায়। এর ফলে শিশুর জন্মগত ত্রুটি, কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া এবং ভবিষ্যতে শিশুর মানসিক ও আচরণগত সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি প্রবল থাকে।
এক নজরে গাঁজার উপাদান ও শরীরের ওপর প্রভাব
সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে গাঁজার প্রধান দুটি উপাদান ও এর প্রভাব তুলে ধরা হলো:
| রাসায়নিক উপাদান | প্রধান বৈশিষ্ট্য | শরীরে এর প্রভাব ও ব্যবহার |
| THC (টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল) | সাইকোঅ্যাক্টিভ বা নেশা সৃষ্টিকারী। | ব্রেনে নেশা বা ঘোর তৈরি করে, যা আসক্তি বাড়ায়। |
| CBD (ক্যানাবিডিওল) | নন-সাইকোঅ্যাক্টিভ (নেশা হয় না)। | খিঁচুনি, ব্যথা এবং উদ্বেগ কমাতে ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. গাঁজা কি ওষুধ হিসেবে খাওয়া নিরাপদ?
উত্তর: বাজার বা রাস্তা থেকে কেনা গাঁজা কখনোই ওষুধ নয়। চিকিৎসায় ব্যবহৃত গাঁজা বা ‘মেডিকেল ক্যানাবিস’ অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ল্যাবে তৈরি করা হয়, যেখানে ক্ষতিকর THC-এর মাত্রা কমিয়ে উপকারী CBD-এর নির্যাস নেওয়া হয়। নিজে নিজে গাঁজা সেবন করা মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
২. বাংলাদেশে কি গাঁজা বৈধ?
উত্তর: না। বাংলাদেশ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী গাঁজা চাষ, বহন, বিক্রি এবং সেবন করা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধ।
৩. গাঁজা খেলে কি ব্রেনের কোষ মরে যায়?
উত্তর: সরাসরি কোষ মেরে না ফেললেও, নিয়মিত নেশার উদ্দেশ্যে গাঁজা সেবন করলে তা ব্রেনের কোষগুলোর মধ্যকার যোগাযোগ বা সিগন্যাল আদান-প্রদান ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। গাঁজা একটি শক্তিশালী এবং অবৈধ মাদকদ্রব্য। রাস্তার গাঁজায় অনেক সময় ক্ষতিকর রাসায়নিক বা অন্যান্য বিষাক্ত মাদক মেশানো থাকে। সুস্থ জীবনের জন্য যেকোনো ধরনের অবৈধ মাদক সেবন থেকে নিজেকে এবং পরিবারকে সম্পূর্ণ দূরে রাখুন।