ব্রেইন টিউমারের ৬টি প্রাথমিক লক্ষণ ও কারণ: বিস্তারিত জানুন

ব্রেইন টিউমার নামটির সাথে একধরনের আতঙ্ক জড়িয়ে থাকলেও, সব ব্রেইন টিউমারই কিন্তু ক্যান্সার নয়। টিউমার মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে—সাধারণ বা বিনাইন (Benign) এবং ক্যান্সারযুক্ত বা ম্যালিগন্যান্ট (Malignant)। তবে টিউমার সাধারণ হোক বা ক্যান্সারযুক্ত, এটি মস্তিষ্কের ভেতর বড় হতে থাকলে মাথার ভেতরের চাপ (Intracranial pressure) মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়, যার ফলে শরীরে নির্দিষ্ট কিছু সংকেত বা লক্ষণ প্রকাশ পায়।
প্রাথমিক অবস্থায় এই লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন হলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করে রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব। চলুন, ব্রেইন টিউমারের প্রধান ৬টি লক্ষণ এবং এর পার্থক্যগুলো বিস্তারিত জেনে নিই।


ব্রেইন টিউমারের ৬টি প্রধান লক্ষণ


টিউমারটি মস্তিষ্কের কোন অংশকে বেশি চাপে ফেলছে, তার ওপর নির্ভর করে লক্ষণগুলো একেক রোগীর ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। তবে সবচেয়ে সাধারণ ৬টি লক্ষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. নতুন ধরনের ও তীব্র মাথাব্যথা
ব্রেইন টিউমারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো মাথাব্যথা। তবে এটি সাধারণ গ্যাস্ট্রিক বা মাইগ্রেনের ব্যথার মতো নয়। এই মাথাব্যথা সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তীব্র হয় এবং সময়ের সাথে সাথে ব্যথার মাত্রা দিন দিন বাড়তে থাকে। সাধারণ কোনো পেইনকিলার বা মাথাব্যথার ওষুধে এই ব্যথা সহজে কমতে চায় না।
২. কারণ ছাড়াই বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
মাথাব্যথার পাশাপাশি কোনো কারণ ছাড়াই বমি বমি ভাব ব্রেইন টিউমারের একটি বড় সংকেত। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর যদি বারবার বমি হয় এবং খাবারে চরম অরুচি দেখা দেয়, তবে এটি মস্তিষ্কে চাপ বাড়ার একটি পরিষ্কার লক্ষণ।
৩. দৃষ্টিশক্তির আকস্মিক পরিবর্তন
টিউমারটি যদি মস্তিষ্কের পেছনের অংশে বা অপটিক স্নায়ুর (Optic nerve) আশপাশে হয়, তবে রোগীর দৃষ্টিশক্তিতে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। রোগী চোখে ঝাপসা দেখেন, একটি জিনিসকে দুটি দেখেন (Double vision) অথবা চোখের একপাশের দৃষ্টিসীমা হারিয়ে ফেলেন। অনেক সময় চোখের মণি অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপতে পারে।
৪. হঠাৎ খিঁচুনি বা সিজার (Seizures)
যাদের আগে কখনো মৃগীরোগ বা খিঁচুনির ইতিহাস ছিল না, কিন্তু হঠাৎ করেই হাত-পায়ে খিঁচুনি শুরু হয়েছে বা রোগী অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন—এটি ব্রেইন টিউমারের অন্যতম শক্তিশালী একটি লক্ষণ। টিউমার মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর স্বাভাবিক বৈদ্যুতিক সংকেতে বাধা দিলে এমন খিঁচুনি দেখা দেয়।
৫. শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় বা হাঁটতে সমস্যা
টিউমারটি যদি মস্তিষ্কের সেরিবেলাম (Cerebellum) অংশে হয়, তবে রোগীর শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। রোগী সোজা হয়ে হাঁটতে পারেন না, টলতে থাকেন এবং বারবার পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এর পাশাপাশি হাত ও পায়ের পেশিতে তীব্র দুর্বলতা বা অবশ ভাব কাজ করতে পারে।
৬. কথা বলায় জড়তা ও আচরণগত পরিবর্তন
মস্তিষ্কের সামনের অংশে (Frontal lobe) টিউমার হলে রোগীর ব্যক্তিত্ব এবং আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। রোগী সাধারণ বিষয়গুলো ভুলে যেতে শুরু করেন, কথা বলতে গিয়ে শব্দ জড়িয়ে যায় (Slurred speech) এবং অকারণে রেগে যান বা বিষণ্ণতায় ভোগেন।


সাধারণ টিউমার বনাম ক্যান্সারযুক্ত টিউমার: পার্থক্য কী?


সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে বিনাইন (সাধারণ) এবং ম্যালিগন্যান্ট (ক্যান্সার) টিউমারের মূল পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হলো:

বৈশিষ্ট্যের ধরনবিনাইন টিউমার (Benign)ম্যালিগন্যান্ট টিউমার (Malignant / Cancer)
বৃদ্ধির হারএটি খুব ধীরগতিতে বড় হয়।এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বড় হয় এবং ছড়িয়ে পড়ে।
ছড়িয়ে পড়ামস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্থানেই সীমাবদ্ধ থাকে।আশপাশের স্বাস্থ্যকর ব্রেন টিস্যুতেও ছড়িয়ে পড়ে।
চিকিৎসার ফলঅপারেশনের পর সাধারণত আর ফিরে আসে না।চিকিৎসার পরও পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি বেশি থাকে।
জীবনের ঝুঁকিতুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ।দ্রুত চিকিৎসা না করালে প্রাণঘাতী হতে পারে।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. সাধারণ মাথাব্যথা আর টিউমারের মাথাব্যথা বুঝব কীভাবে?
উত্তর: সাধারণ মাথাব্যথা সাধারণত ওষুধ খেলে, ঘুমালে বা বিশ্রাম নিলে কমে যায়। কিন্তু টিউমারের মাথাব্যথা একটানা থাকে, সকালে বেশি হয় এবং ব্যথার তীব্রতা দিনের পর দিন বাড়তে থাকে। এর সাথে বমি বা দৃষ্টি ঝাপসা হওয়ার মতো অন্যান্য লক্ষণ যুক্ত থাকে।
২. মোবাইল ফোনের রেডিয়েশন থেকে কি ব্রেইন টিউমার হয়?
উত্তর: এটি নিয়ে মানুষের মনে অনেক ভয় থাকলেও, এখন পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি যে, মোবাইল ফোনের রেডিয়েশন সরাসরি ব্রেইন টিউমার বা ক্যান্সার সৃষ্টি করে। তবে সতর্কতা হিসেবে হেডফোন ব্যবহার করা ভালো।
৩. ব্রেইন টিউমার কি অপারেশন ছাড়া ওষুধে ভালো হয়?
উত্তর: সম্পূর্ণ ওষুধে ব্রেইন টিউমার গলে যাওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। টিউমারের ধরন ও সাইজ অনুযায়ী সার্জারি (অপারেশন), রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপির মাধ্যমেই এর প্রধান চিকিৎসা করা হয়।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। ওপরের লক্ষণগুলোর একাধিক আপনার বা পরিচিত কারও মধ্যে দেখা দিলে এক মুহূর্ত অবহেলা না করে দ্রুত একজন নিউরোলজিস্ট (Neurologist) বা নিউরোসার্জনের পরামর্শ নিন। একটি সাধারণ এমআরআই (MRI) বা সিটি স্ক্যান (CT Scan) এর মাধ্যমেই টিউমারের অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *