আমাদের শরীরের নিজস্ব ‘প্রতিরক্ষা বাহিনী’ বা ডিফেন্স মেকানিজম হলো শ্বেত রক্তকণিকা (White Blood Cells বা WBC)। যখনই বাইরে থেকে কোনো ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস শরীরে আক্রমণ করে, তখন এদের ধ্বংস করতে শ্বেত রক্তকণিকা ঢালের মতো কাজ করে। রক্ত পরীক্ষায় শ্বেত রক্তকণিকার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি আসাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘লিউকোসাইটোসিস’ (Leukocytosis) বলা হয়।
fitnition.com-এর আজকের আয়োজনে আমরা জানবো রক্তে শ্বেত রক্তকণিকা বেড়ে যাওয়া মানেই ভয়ের কিছু কি না এবং এটি শরীরে কোন কোন রোগের সংকেত বহন করে। চলুন, বিস্তারিত জেনে নিই।
শ্বেত রক্তকণিকা বেড়ে যাওয়ার ৫টি প্রধান কারণ ও রোগ
শ্বেত রক্তকণিকা বেড়ে যাওয়া নিজে কোনো রোগ নয়, বরং এটি শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্য কোনো রোগের লক্ষণ। সাধারণত নিচের ৫টি কারণে এটি অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যায়:
১. শরীরের কোথাও সংক্রমণ বা ইনফেকশন
এটি শ্বেত রক্তকণিকা বৃদ্ধির সবচেয়ে সাধারণ ও প্রধান কারণ। শরীরে যখন কোনো ব্যাকটেরিয়াল (যেমন- টাইফয়েড, যক্ষ্মা), ভাইরাল বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন হয়, তখন শরীর তার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে প্রচুর পরিমাণে শ্বেত রক্তকণিকা উৎপাদন শুরু করে। ইনফেকশন ভালো হয়ে গেলে এটি আবার স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে আসে।
২. ব্লাড ক্যান্সার বা লিউকেমিয়া (Leukemia)
শ্বেত রক্তকণিকা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার সবচেয়ে মারাত্মক কারণটি হলো ব্লাড ক্যান্সার বা লিউকেমিয়া। এই রোগে অস্থিমজ্জা (Bone marrow) থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে এবং অসম্পূর্ণ শ্বেত রক্তকণিকা তৈরি হতে থাকে, যা শরীরের কোনো উপকারে তো আসেই না, উল্টো সুস্থ রক্তকণিকাগুলোকে ধ্বংস করে দেয়।
৩. প্রদাহ ও অটোইমিউন রোগ
শরীরের ভেতরে কোনো কারণে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ (Inflammation) থাকলে শ্বেত রক্তকণিকা বেড়ে যায়। এছাড়া ‘অটোইমিউন ডিজিজ’ (যেমন- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা বাতের সমস্যা, ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ), যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাই ভুল করে নিজের সুস্থ কোষকে আক্রমণ করে, সেখানেও WBC কাউন্ট বেশি আসে।
৪. টিস্যুর ক্ষতি বা শারীরিক আঘাত
বড় কোনো সার্জারি, মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা, হাড় ভেঙে যাওয়া বা শরীরের অনেকটা অংশ আগুনে পুড়ে গেলে সেই ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু মেরামত করার জন্য শরীর প্রচুর পরিমাণে শ্বেত রক্তকণিকা তৈরি করে। এমনকি হার্ট অ্যাটাকের পরও রক্তে এর মাত্রা বেড়ে যায়।
৫. অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও ওষুধের প্রভাব
চরম মানসিক চাপ (Stress) বা প্যানিক অ্যাটাকের কারণে শরীরে এপিনেফ্রিন হরমোন ক্ষরিত হয়, যা সাময়িকভাবে শ্বেত রক্তকণিকা বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া হাঁপানি বা অ্যালার্জির জন্য ব্যবহৃত ‘কর্টিকোস্টেরয়েড’ (Corticosteroids) জাতীয় ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও এটি বাড়তে পারে।
এক নজরে শ্বেত রক্তকণিকার মাত্রা
রক্তের সিবিসি (CBC) রিপোর্ট দেখে অবস্থা বোঝার জন্য নিচের আন্তর্জাতিক চার্টটি খেয়াল করুন:
| অবস্থার ধরন | শ্বেত রক্তকণিকার পরিমাণ (প্রতি মাইক্রোলিটারে) | সম্ভাব্য কারণ |
| স্বাভাবিক মাত্রা | ৪,০০০ থেকে ১১,০০০ | শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ। |
| সামান্য বেশি | ১১,০০০ থেকে ২৫,০০০ | সাধারণ ইনফেকশন, মানসিক চাপ বা অ্যালার্জি। |
| অতিরিক্ত বেশি | ৫০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ বা তার বেশি | ব্লাড ক্যান্সার বা অস্থিমজ্জার গুরুতর সমস্যা। |
কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?
শ্বেত রক্তকণিকা বাড়ার সাথে যদি নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়, তবে এক মুহূর্তও অবহেলা করা উচিত নয়:
অকারণে দীর্ঘমেয়াদী জ্বর ও রাতে প্রচণ্ড ঘাম হওয়া।
শরীর সবসময় ক্লান্ত লাগা এবং অস্বাভাবিক হারে ওজন কমে যাওয়া।
শরীরের যেকোনো জায়গা (নাক বা দাঁতের মাড়ি) থেকে সহজে রক্তপাত হওয়া।
ত্বকে বিনা কারণে কালশিটে বা নীলচে দাগ পড়া।
ঘাড়, বগল বা কুঁচকির লসিকা গ্রন্থি (লিম্ফ নোড) ফুলে যাওয়া।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. শ্বেত রক্তকণিকা বেড়ে গেলে কি নির্দিষ্ট কোনো খাবার খাওয়া নিষেধ?
উত্তর: শ্বেত রক্তকণিকা বাড়ার নির্দিষ্ট কোনো ডায়েট নেই, কারণ এটি নির্ভর করে মূল রোগের ওপর। ইনফেকশনের কারণে বাড়লে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে, আর অ্যালার্জির কারণে বাড়লে অ্যালার্জিযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে।
২. মানসিক চাপের কারণে শ্বেত রক্তকণিকা বাড়লে তা কি ক্ষতিকর?
উত্তর: মানসিক চাপ বা ব্যায়ামের কারণে শ্বেত রক্তকণিকা বাড়া সাধারণত ক্ষণস্থায়ী। শরীর শান্ত হয়ে গেলে এটি প্রাকৃতিকভাবেই আবার স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে আসে, তাই এটি নিয়ে ভয়ের কিছু নেই।
৩. সিবিসি (CBC) রিপোর্টে WBC বেশি এলে করণীয় কী?
উত্তর: রিপোর্টে WBC বেশি দেখলে নিজে নিজে গুগল করে আতঙ্কিত হবেন না। রিপোর্টটি অবশ্যই একজন মেডিসিন বা হেমাটোলজিস্ট (রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ) ডাক্তারকে দেখান। তিনি রোগীর শারীরিক লক্ষণ দেখে মূল কারণটি নির্ণয় করবেন।
বিশেষ স্বাস্থ্য সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি। রক্তে শ্বেত রক্তকণিকার পরিমাণ খুব বেশি হওয়া লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। তাই রক্ত পরীক্ষায় অস্বাভাবিকতা দেখলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে বোন ম্যারো টেস্ট বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি।