ব্রেন স্ট্রোকের ৫টি প্রধান লক্ষণ ও জরুরি প্রাথমিক করণীয়

ব্রেন স্ট্রোক (Brain Stroke) বিশ্বব্যাপী মৃত্যু এবং পঙ্গুত্বের অন্যতম প্রধান একটি কারণ। অনেকেই স্ট্রোককে হার্টের সমস্যা বা ‘হার্ট অ্যাটাক’ ভেবে ভুল করেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, স্ট্রোক সম্পূর্ণ মস্তিষ্কের বা ব্রেনের একটি রোগ।
মস্তিষ্কের রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধলে বা কোনো রক্তনালী ছিঁড়ে রক্তক্ষরণ হলে ব্রেনের কোষে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। তখন ব্রেনের ওই অংশের কোষগুলো কয়েক মিনিটের মধ্যেই মারা যেতে শুরু করে, একেই ব্রেন স্ট্রোক বলা হয়। স্ট্রোক হলে রোগীর জীবন বাঁচাতে এবং পঙ্গুত্ব রোধ করতে প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলুন, ব্রেন স্ট্রোক চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় এবং প্রাথমিক লক্ষণগুলো বিস্তারিত জেনে নিই।


ব্রেন স্ট্রোক চেনার জাদুকরী উপায়: ‘FAST’ পদ্ধতি


বিশ্বের যেকোনো চিকিৎসকের কাছে ব্রেন স্ট্রোক শনাক্ত করার সবচেয়ে সহজ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি হলো ‘FAST’ (ফাস্ট)। পরিবারের কারও স্ট্রোকের সন্দেহ হলে তাৎক্ষণিক এই ৪টি বিষয় মিলিয়ে দেখুন:
F (Face – মুখমণ্ডল): রোগীকে হাসতে বলুন। খেয়াল করুন হাসার সময় রোগীর মুখের একপাশ বেঁকে যাচ্ছে কি না বা একপাশ অসাড় মনে হচ্ছে কি না।
A (Arm – হাত): রোগীকে দুই হাত এক সাথে ওপরের দিকে তুলতে বলুন। যদি এক হাত নিজে থেকেই নিচে নেমে যায় বা এক হাত তুলতেই না পারে, তবে তা স্ট্রোকের লক্ষণ।
S (Speech – কথা): রোগীকে সহজ কোনো একটি বাক্য বলতে বলুন (যেমন: ‘আজকের আবহাওয়া সুন্দর’)। যদি তার কথা জড়িয়ে যায়, অস্পষ্ট শোনায় বা কথা বলতে প্রচণ্ড কষ্ট হয়, তবে সতর্ক হোন।
T (Time – সময়): ওপরের ৩টি লক্ষণের যেকোনো একটিও যদি মিলে যায়, তবে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। স্ট্রোকের প্রথম ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়।


ব্রেন স্ট্রোকের অন্যান্য মারাত্মক লক্ষণ


FAST পদ্ধতি ছাড়াও ব্রেন স্ট্রোক হলে শরীরে আরও কিছু আকস্মিক পরিবর্তন দেখা দেয়:
১. শরীরের যেকোনো একপাশ অবশ হয়ে যাওয়া
হঠাৎ করে শরীরের ডান বা বাম পাশ পুরোপুরি অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া ব্রেন স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় সংকেত। ব্রেনের যে অংশে স্ট্রোক হয়, ঠিক তার উল্টো দিকের শরীর কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
২. হঠাৎ প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও বমি
বিনা কারণে হঠাৎ করে যদি মাথার ভেতর বজ্রপাতের মতো প্রচণ্ড ও তীব্র ব্যথা শুরু হয় এবং এর সাথে বমি বমি ভাব বা বমি হয়, তবে তা ব্রেনে রক্তক্ষরণ বা ‘হেমোরেজিক স্ট্রোক’ (Hemorrhagic Stroke) এর লক্ষণ হতে পারে।
৩. চোখের দৃষ্টি ঘোলা হয়ে যাওয়া
স্ট্রোক হলে রোগী হঠাৎ করেই এক চোখে বা উভয় চোখে দেখতে সমস্যা অনুভব করতে পারেন। চোখের সামনে সবকিছু ঘোলা বা ডাবল (Diplopia) দেখা যেতে পারে অথবা দৃষ্টি পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যেতে পারে।
৪. শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা
রোগী হাঁটতে গেলে হঠাৎ করে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারেন। শরীরের ব্যালেন্স বা ভারসাম্য রাখতে না পারা এবং কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ব্রেন স্ট্রোকের পূর্বলক্ষণ হতে পারে।


এক নজরে স্ট্রোকের ধরন ও কারণ


সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে ব্রেন স্ট্রোকের প্রধান দুটি ধরন তুলে ধরা হলো:

স্ট্রোকের ধরনকীভাবে ঘটে?শতকরা হার
ইসকেমিক স্ট্রোক (Ischemic Stroke)মস্তিষ্কের রক্তনালীতে চর্বি বা রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে এই স্ট্রোক হয়।প্রায় ৮৭% রোগী এই স্ট্রোকে আক্রান্ত হন।
হেমোরেজিক স্ট্রোক (Hemorrhagic Stroke)উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনো কারণে মস্তিষ্কের ভেতরের রক্তনালী ছিঁড়ে রক্তক্ষরণ হলে এই স্ট্রোক হয়।এটি তুলনামূলক কম হয় (১৩%), তবে বেশি মারাত্মক।


ব্রেন স্ট্রোক হলে তাৎক্ষণিক করণীয় (যা করবেন এবং যা করবেন না)


স্ট্রোকের লক্ষণ দেখলে চারপাশের মানুষের ঘাবড়ে না গিয়ে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত:
দ্রুত সিটি স্ক্যান (CT Scan) সুবিধা যুক্ত হাসপাতালে নিন: স্ট্রোকের রোগীকে সাধারণ ক্লিনিকে না নিয়ে সরাসরি এমন হাসপাতালে নিতে হবে যেখানে নিউরোলজি বিভাগ এবং সিটি স্ক্যান করার সুবিধা আছে।
পানি বা ওষুধ খাওয়াবেন না: স্ট্রোকের রোগীর গলার পেশি অনেক সময় কাজ করে না। তাই জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত রোগীর মুখে এক ফোঁটা পানি, খাবার বা প্রেসারের ওষুধ দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। এটি শ্বাসনালীতে গিয়ে রোগীর মৃত্যু ঘটাতে পারে।
রোগীকে একপাশে কাত করে শোয়ান: রোগীর বমি হলে বা মুখ দিয়ে লালা বের হলে তাকে যেকোনো একপাশে কাত করে শুইয়ে দিন, যাতে শ্বাসনালী পরিষ্কার থাকে।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. অল্প বয়সে কি ব্রেন স্ট্রোক হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ। বর্তমানে অনিয়মিত জীবনযাপন, ফাস্ট ফুড, ধূমপান এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের (Stress) কারণে ৩০-৪০ বছর বয়সীদের মধ্যেও ব্রেন স্ট্রোকের হার মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে।
২. মিনি স্ট্রোক (TIA) আসলে কী?
উত্তর: অনেক সময় মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল কয়েক মিনিটের জন্য বন্ধ হয়ে আবার নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। একে ‘মিনি স্ট্রোক’ বা TIA বলা হয়। এর লক্ষণগুলো ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চলে যায়, কিন্তু এটি ভবিষ্যতে বড় স্ট্রোক হওয়ার সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।
৩. ব্রেন স্ট্রোক প্রতিরোধের উপায় কী?
উত্তর: ব্লাড প্রেসার ও ডায়াবেটিস কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়া এবং প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করাই হলো স্ট্রোক প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। স্ট্রোক একটি জীবনঘাতী সমস্যা। তাই কারও স্ট্রোক হয়েছে সন্দেহ হলে ঘরে বসে ব্লাড প্রেসার মাপা বা টোটকা চিকিৎসার নামে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করবেন না, রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *