নাক দিয়ে রক্ত পড়া রোগের নাম, কারণ ও তাৎক্ষণিক করণীয়

হঠাৎ করে নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখলে শিশু থেকে বয়স্ক—সবাই ঘাবড়ে যান। অনেকেই ভয় পেয়ে ভাবেন এটি হয়তো মস্তিষ্কের বা বড় কোনো ক্যান্সারের লক্ষণ। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কারণ খুব সাধারণ এবং এটি বাড়িতে বসেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
নাক দিয়ে রক্ত পড়া আসলে নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়, বরং এটি শরীরের অন্য কোনো ছোট বা বড় সমস্যার একটি লক্ষণ মাত্র। চলুন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নাক দিয়ে রক্ত পড়াকে কী বলা হয়, এর প্রধান কারণগুলো কী এবং রক্ত পড়া শুরু হলে তাৎক্ষণিক কী করা উচিত, তা বিস্তারিত জেনে নিই।


নাক দিয়ে রক্ত পড়া রোগের মেডিকেল নাম কী?


নাক দিয়ে রক্ত পড়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘এপিস্ট্যাক্সিস’ (Epistaxis)
আমাদের নাকের ভেতরের দিকের চামড়া বা আস্তরণ অত্যন্ত পাতলা এবং সংবেদনশীল হয়। এই পাতলা চামড়ার ঠিক নিচেই জালের মতো অসংখ্য সূক্ষ্ম রক্তনালী (Blood vessels) ছড়িয়ে থাকে। কোনো কারণে এই সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলো সামান্য আঘাত পেলে বা ফেটে গেলে সেখান থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়, যাকে আমরা এপিস্ট্যাক্সিস বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া বলি।


নাক দিয়ে রক্ত পড়ার প্রধান ৫টি কারণ


নাক দিয়ে রক্ত পড়ার পেছনে সাধারণত সাধারণ কিছু কারণ থাকে। নিচে প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো:
১. নখ দিয়ে নাক খোঁটা ও আঘাত পাওয়া
শিশুদের নাক দিয়ে রক্ত পড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো বারবার আঙুল বা নখ দিয়ে নাক খোঁটা। নাকের ভেতরের চামড়া পাতলা হওয়ায় সামান্য নখের আঁচড়ে রক্তনালী ছিঁড়ে যেতে পারে। এছাড়া খেলাধুলা বা দুর্ঘটনার সময় নাকে আঘাত লাগলেও রক্ত পড়তে পারে।
২. শুষ্ক আবহাওয়া ও অ্যালার্জি
শীতকালে বা অতিরিক্ত শুষ্ক আবহাওয়ায় নাকের ভেতরের আর্দ্রতা শুকিয়ে চামড়া ফেটে যায়। তখন সামান্য হাঁচি বা কাশি দিলেও রক্তনালী ফেটে রক্ত আসতে পারে। এছাড়া যাদের মারাত্মক অ্যালার্জি বা সাইনাসের সমস্যা আছে, তাদের বারবার নাক মোছার কারণেও রক্তপাত হতে পারে।
৩. উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেসার
বয়স্কদের নাক দিয়ে রক্ত পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ (High BP)। রক্তচাপ হঠাৎ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেলে নাকের ভেতরের দুর্বল রক্তনালীগুলো সেই চাপ সহ্য করতে না পেরে ফেটে যায় এবং ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে পারে।
৪. রক্ত পাতলা করার ওষুধের প্রভাব
যাদের হার্টের সমস্যা রয়েছে এবং যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ (যেমন- অ্যাসপিরিন বা ওয়ারফারিন) নিয়মিত সেবন করেন, তাদের রক্ত সহজে জমাট বাঁধে না। ফলে সামান্য আঘাতেই তাদের নাক থেকে দীর্ঘক্ষণ রক্ত পড়তে পারে।
৫. নাকের ভেতর টিউমার বা পলিপ
নাকের ভেতর মাংসপেশি ফুলে যাওয়া (Nasal Polyps) বা ছোট কোনো টিউমার থাকলে সেখান থেকেও অনেক সময় হঠাৎ করে রক্তক্ষরণ হতে পারে।


নাক দিয়ে রক্ত পড়লে তাৎক্ষণিক করণীয় (ফার্স্ট এইড)


নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হলে ঘাবড়ে না গিয়ে সাথে সাথে নিচের নিয়মগুলো পালন করুন:
সামনের দিকে ঝুঁকে বসুন: আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো নাক দিয়ে রক্ত পড়লে মাথা পেছনের দিকে হেলিয়ে দেওয়া। এটি মোটেও করা যাবে না! মাথা পেছনে হেলালে রক্ত গলার ভেতর দিয়ে পেটে চলে গিয়ে বমি হতে পারে বা শ্বাসনালীতে গিয়ে মারাত্মক বিপদ হতে পারে। তাই মাথা সবসময় সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকিয়ে বসতে হবে।
নাকের নরম অংশ চেপে ধরুন: বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী দিয়ে নাকের সামনের নরম অংশটি (যেখানে হাড় নেই) একটানা ১০ থেকে ১৫ মিনিট শক্ত করে চেপে ধরে রাখুন। এ সময় নাকের বদলে মুখ দিয়ে শ্বাস নিন।
বরফ ব্যবহার করুন: একটি সুতির কাপড়ে কয়েক টুকরো বরফ পেঁচিয়ে নাকের ওপর বা কপালে লাগালে রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়ে যায় এবং রক্ত পড়া দ্রুত বন্ধ হয়।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. নাক দিয়ে রক্ত পড়া কি ব্রেন স্ট্রোকের লক্ষণ? উত্তর: সরাসরি নাক দিয়ে রক্ত পড়া ব্রেন স্ট্রোকের লক্ষণ নয়। তবে উচ্চ রক্তচাপের কারণে যদি রক্তনালী ছিঁড়ে রক্ত পড়ে, তবে তা ব্রেন স্ট্রোকের একটি বড় সতর্কবার্তা হতে পারে।
২. বারবার নাক দিয়ে রক্ত পড়লে কী করা উচিত? উত্তর: যদি কোনো কারণ ছাড়াই ঘন ঘন নাক দিয়ে রক্ত পড়ে, তবে এটি রক্তের কোনো রোগ (যেমন লিম্ফোমা বা লিউকেমিয়া) অথবা রক্ত জমাট না বাঁধার সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই পরীক্ষা করানো উচিত।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও প্রাথমিক চিকিৎসার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি নাক চেপে ধরার পরও ২০ মিনিটের বেশি সময় ধরে একটানা রক্ত পড়তে থাকে, প্রচুর পরিমাণে রক্ত যায় বা রোগীর শ্বাসকষ্ট হয়, তবে এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে বা নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *